ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রাক্কালে বিগত কয়েক সপ্তাহে একের পর এক পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ডসহ ধারাবাহিক সহিংসতা—বিশেষত সংখ্যালঘু হত্যা, বাড়ি-ঘরে হামলা ও অগ্নিসংযোগের ঘটনায় গভীর নিন্দা ও উদ্বেগ জানিয়ে দায়ী ব্যক্তিদের আইনের আওতায় এনে কঠোর শাস্তির দাবি জানিয়েছেন দেশের ৩২ জন বিশিষ্ট নাগরিক।
এক যৌথ বিবৃতিতে তারা বলেন, বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী নির্বাচনের আগে দেশকে অস্থিতিশীল করার উদ্দেশ্যে পরিকল্পিতভাবে এসব সহিংস ঘটনা ঘটানো হচ্ছে বলে জনমনে ধারণা তৈরি হয়েছে। ময়মনসিংহের ভালুকায় দীপু দাস, যশোরে রানা প্রতাপ বৈরাগী, নরসিংদীর শরৎ চক্রবর্তী মণিসহ বেশ কয়েকজন হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন। এছাড়া চট্টগ্রামের রাউজানে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের বাড়িতে দরজা বন্ধ করে অগ্নিসংযোগের ঘটনাও ঘটেছে। এসব ঘটনায় তারা তীব্র ভাষায় নিন্দা ও ধিক্কার জানান।
বিবৃতিতে বলা হয়, বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ ও বিভিন্ন ধর্মাবলম্বী নাগরিকদের মধ্যে সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক এ দেশের ঐতিহ্য। সাধারণ নাগরিকদের মধ্যে কোনো বিশেষ ধর্ম, সম্প্রদায় বা জাতিগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে বিদ্বেষ বিরল। বরং যারা এসব সাম্প্রদায়িক হামলা ও হত্যাকাণ্ড ঘটাচ্ছে, তারা সমাজের একটি ক্ষুদ্র উগ্রবাদী গোষ্ঠী, যারা রাজনৈতিক অসৎ উদ্দেশ্যে নাশকতা সৃষ্টিতে তৎপর।
আসন্ন নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ করতেই এসব ঘটনা ঘটানো হচ্ছে এবং দেশি-বিদেশি উসকানিদাতা ও পৃষ্ঠপোষকগোষ্ঠী তাদের মদদ দিচ্ছে বলেও তারা মনে করেন।
বিবৃতিতে আরও উল্লেখ করা হয়, ঘটনার দ্রুত তদন্ত এবং দায়ীদের বিচারের আওতায় আনতে সরকার বারবার ব্যর্থ হচ্ছে—যা গভীর উদ্বেগজনক।
তাই সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত অপরাধীদের গ্রেপ্তার ও বিচার নিশ্চিত করার পাশাপাশি এসব ঘটনার পেছনে কারা জড়িত, তা জনসমক্ষে প্রকাশের দাবি জানান তারা।
১. সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষ হত্যা, বাড়ি-ঘরে হামলা ও অগ্নিসংযোগের সঙ্গে জড়িতদের অবিলম্বে গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে এসব ঘটনার উসকানি ও ইন্ধনদাতাদের চিহ্নিত করে তাদের বিরুদ্ধেও কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
২. সংখ্যালঘুদের বাড়িঘর, দোকানপাটসহ সব ধরনের স্থাপনা এবং মন্দির, গির্জাসহ সকল উপাসনালয়ের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে অন্তর্বর্তী সরকারকে বিশেষ উদ্যোগ নিতে হবে। পাশাপাশি সকল রাজনৈতিক দল ও সামাজিক শক্তিকে ঐক্যবদ্ধ করে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে কার্যকর সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে।
৩. হিন্দুসহ দেশের সকল ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘুর ধর্মীয় স্বাধীনতা, সামগ্রিক জীবনের নিরাপত্তা এবং সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষায় প্রশাসনকে অবিলম্বে বিশেষ নির্দেশনা দিতে হবে। এ ক্ষেত্রে নিয়মিত ও কঠোর নজরদারি জোরদার করার দাবি জানানো হচ্ছে।
৪. মূলধারার সকল রাজনৈতিক দলকে এসব সহিংসতা সমন্বিতভাবে প্রতিরোধে উদ্যোগী হতে হবে। দেশবাসীকে, বিশেষ করে নিজ নিজ দলের কর্মী-সমর্থকদের সম্পৃক্ত করে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলার জন্য কার্যকর ও দৃঢ় পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানানো হচ্ছে।
বিবৃতিতে স্বাক্ষরকারীরা হলেন সুলতানা কামাল, খুশী কবির, রাশেদা কে চৌধূরী, জেড আই খান পান্না, ইফতেখারুজ্জামান, আনু মুহাম্মদ, শাহীন আনাম, ফিরদৌস আজিম, শামসুল হুদা, নুর খান, সামিনা লুৎফা, সুমাইয়া খায়ের, সুব্রত চৌধুরী, তবারক হোসেন, স্বপন আদনান, তাসনিম সিরাজ মাহবুব, রোবায়েত ফেরদৌস, জোবাইদা নাসরীন, মনিন্দ্র কুমার নাথ, পাভেল পার্থ, সালেহ আহমেদ, পারভেজ হাসেম, রেজাউল করিম চৌধুরী, শাহ ই মবিন জিননাহ, জাকির হোসেন, সাইদুর রহমান, সাঈদ আহমেদ, দীপায়ন খীসা, জবা তালুকদার, ঈশিতা দস্তগীর, মেইনথিন প্রমীলা ও হানা শামস আহমেদ।