দখল, বর্জ্য ও দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনায় ময়লার ভাগাড়ে পরিণত হওয়া রাজধানীর আদি বুড়িগঙ্গা চ্যানেলকে আবারও প্রাণবন্ত জলধারায় ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নির্দেশনার পর চ্যানেল ও সংলগ্ন এলাকায় পরিচ্ছন্নতা অভিযান শুরু করেছে ঢাকা জেলা প্রশাসন ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন বিডি ক্লিন। প্রাথমিকভাবে জমে থাকা বর্জ্য অপসারণের পাশাপাশি চ্যানেলটির নাব্যতা ফিরিয়ে আনা, দুই পাশে সৌন্দর্যবর্ধন এবং জনসাধারণের জন্য হাঁটার পথ নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
শুক্রবার রাজধানীর সেকশন ব্রিজসংলগ্ন আদি বুড়িগঙ্গা চ্যানেলের অংশে আনুষ্ঠানিকভাবে এ পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রমের উদ্বোধন করা হয়।
এর আগে বিডি ক্লিনের সদস্যসহ উপস্থিত অংশীজনদের শপথবাক্য পাঠ করান স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম। এ সময় ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মো. আব্দুস সালাম, ঢাকা-৭ আসনের সংসদ সদস্য হামিদুর রহমান এবং ঢাকা জেলা প্রশাসক ফরিদা খানমসহ সংশ্লিষ্টরা উপস্থিত ছিলেন।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, আদি বুড়িগঙ্গা চ্যানেল থেকে ময়লার ভাগাড় অপসারণ করে এর আগের রূপ ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নিতে স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমকে নির্দেশনা দেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এরই ধারাবাহিকতায় চ্যানেলটি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করা, হারানো নাব্যতা ফিরিয়ে আনা এবং দুই পাশে সৌন্দর্যবর্ধনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
ঢাকার প্রাচীন জলধারাগুলোর অন্যতম আদি বুড়িগঙ্গা চ্যানেলটির দৈর্ঘ্য প্রায় ৩ দশমিক ২ কিলোমিটার। এর প্রায় ১ হাজার ফুট অংশ দূরানী ব্রিজসংলগ্ন এলাকায় অবস্থিত। দীর্ঘদিন দখল ও বর্জ্য ফেলার কারণে চ্যানেলটির বিভিন্ন অংশ ময়লার ভাগাড়ে পরিণত হয়। এতে পানির স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি দুর্গন্ধ, মশার উপদ্রব ও জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়। ফলে চ্যানেলসংলগ্ন এলাকার বাসিন্দাদের ভোগান্তি বাড়তে থাকে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের জন্য একসময় গুরুত্বপূর্ণ জলধারা হিসেবে ব্যবহৃত হলেও সময়ের সঙ্গে আদি বুড়িগঙ্গা চ্যানেলের স্বাভাবিক প্রবাহ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ১৯৯০ সালে ঢাকা শহরকে বন্যার হাত থেকে রক্ষার লক্ষ্যে ঢাকা বেড়িবাঁধ নির্মাণের পরবর্তী সময়ে চ্যানেলটির পানিপ্রবাহ ব্যাহত হতে থাকে। এর সঙ্গে বিভিন্ন অংশে দখল ও বর্জ্য জমে যাওয়ায় পরিস্থিতি আরও নাজুক হয়ে পড়ে।
তবে চ্যানেলটি পুনরুদ্ধারে এর আগেও উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। সংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, ২০২২-২৩ অর্থবছরে চ্যানেলটির সংশ্লিষ্ট অংশ দখলমুক্ত করা হয়। এবার নতুন করে পরিচ্ছন্নতা, নাব্যতা পুনরুদ্ধার ও সৌন্দর্যবর্ধনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে শুধু ময়লা অপসারণ নয়, জলাধারটির স্বাভাবিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে।
বর্তমানে ঢাকা জেলা প্রশাসন ও বিডি ক্লিনের যৌথ উদ্যোগে চ্যানেল ও সংলগ্ন এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা বর্জ্য অপসারণ করা হচ্ছে। পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রমের পাশাপাশি স্থানীয় জনগণকে চ্যানেল ও খালে বর্জ্য না ফেলার বিষয়ে সচেতন করা হচ্ছে। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, নিয়মিত পরিচ্ছন্নতা ও জনসচেতনতা ছাড়া জলাধারটিকে দীর্ঘমেয়াদে দূষণমুক্ত রাখা কঠিন হবে।
পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রমের উদ্বোধন করে স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম বলেন, ‘পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্য রক্ষায় খাল ও নদীগুলোকে ময়লা-আবর্জনামুক্ত রাখা অপরিহার্য। ঢাকা জেলা প্রশাসন ও বিডি ক্লিনের এই যৌথ উদ্যোগ প্রশংসনীয়। আমরা আশা করি, এ কার্যক্রম সফলভাবে সম্পন্ন হবে এবং স্থানীয় বাসিন্দারা এর সুফল ভোগ করবেন।’
পরবর্তী ধাপে চ্যানেলটির নাব্যতা ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নেওয়া হবে বলে জানিয়েছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন। পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম শেষ হওয়ার পর পানির স্বাভাবিক প্রবাহ ফিরিয়ে আনতে কাজ করা হবে। একই সঙ্গে চ্যানেলের দুই পাশে সৌন্দর্যবর্ধনের পরিকল্পনা রয়েছে। জনসাধারণের চলাচল ও অবসর সময় কাটানোর সুযোগ তৈরি করতে ওয়াকওয়ে নির্মাণের উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, পরিকল্পনাগুলো বাস্তবায়িত হলে আদি বুড়িগঙ্গা চ্যানেলটি শুধু বর্জ্যমুক্ত জলাধার হিসেবে নয়, পরিবেশবান্ধব ও জনবান্ধব স্থান হিসেবেও গড়ে উঠতে পারে। এতে একদিকে জলধারাটির পরিবেশগত ভারসাম্য ফিরিয়ে আনার সুযোগ তৈরি হবে, অন্যদিকে স্থানীয় মানুষের চলাচল ও অবসর কাটানোর জন্য নতুন পরিবেশ তৈরি হবে।
তবে চ্যানেলটি পুনরায় দখল ও দূষণের শিকার না হওয়াই এখন বড় বিষয়। এ জন্য পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রমের পাশাপাশি ভবিষ্যতে নজরদারি জোরদারের কথা জানিয়েছে ঢাকা জেলা প্রশাসন। স্থানীয় বাসিন্দাদেরও চ্যানেল ও খালে বর্জ্য না ফেলে উদ্যোগটি সফল করতে সহযোগিতা করার আহ্বান জানানো হয়েছে।
দীর্ঘদিনের বর্জ্য, দুর্গন্ধ, মশার উপদ্রব ও জলাবদ্ধতার কারণে যে আদি বুড়িগঙ্গা চ্যানেল মানুষের দুর্ভোগের কারণ হয়ে উঠেছিল, সেটিকে আবারও স্বাভাবিক পরিবেশে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। পরিচ্ছন্নতার পর নাব্যতা পুনরুদ্ধার, সৌন্দর্যবর্ধন ও ওয়াকওয়ে নির্মাণের পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে ঢাকার প্রাচীন এই জলধারা নতুন রূপ পেতে পারে। স্থানীয় বাসিন্দারাও তখন দীর্ঘদিনের পরিবেশগত সংকট থেকে স্বস্তি পাওয়ার সুযোগ পাবেন।
দেশবার্তা/একে