কর্মক্ষেত্র ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ সর্বত্র যৌন হয়রানি ও নিপীড়ন প্রতিরোধে দ্রুত একটি পৃথক আইন প্রণয়নের জোর দাবি জানিয়েছে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ। সংগঠনের নেত্রীরা বলেছেন, ২০০৯ সালে হাইকোর্টের দেওয়া নির্দেশনার পর দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও এখনো আইনটি পাস না হওয়া অত্যন্ত উদ্বেগজনক। রাষ্ট্রের দায়বদ্ধতা ও নারীর সুরক্ষার স্বার্থে এ বিষয়ে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।
বুধবার জাতীয় প্রেস ক্লাবের জহুর হোসেন চৌধুরী মিলনায়তনে ‘উত্ত্যক্তকরণ, যৌন নিপীড়ন কে না বলুন, ঐক্যবদ্ধভাবে প্রতিরোধ গড়ে তুলুন’ শীর্ষক এক সংবাদ সম্মেলনে বক্তারা এসব কথা বলেন।
সংবাদ সম্মেলনে মডারেটর হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সভাপতি ডা. ফওজিয়া মোসলেম। সংগঠনের পক্ষে বক্তব্য দেন সাধারণ সম্পাদক মালেকা বানু। লিখিত বক্তব্য উপস্থাপন করেন কেন্দ্রীয় কমিটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক অ্যাড. মাসুদা রেহানা বেগম। সঞ্চালনা করেন লিগ্যাল এইড সম্পাদক রেখা সাহা।
অনুষ্ঠানে অতিথি বক্তা হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ জাতীয় মহিলা আইনজীবী সমিতির উপদেষ্টা অ্যাড. সালমা আলী, বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্রাস্টের (ব্লাস্ট) অ্যাডভোকেসি অ্যান্ড কমিউনিকেশন বিভাগের পরিচালক মাহাবুবা আক্তার, ব্র্যাকের সামাজিক ক্ষমতায়ন ও আইনি সুরক্ষা কর্মসূচি (সেলপ) এবং জেন্ডার জাস্টিস অ্যান্ড ডাইভার্সিটি কর্মসূচির সহযোগী পরিচালক শাশ্বতী বিপ্লব, জাতীয় কন্যাশিশু অ্যাডভোকেসি ফোরামের ন্যাশনাল কো-অর্ডিনেটর সৈয়দা আহসানা জামান এ্যানি এবং আইন ও সালিশ কেন্দ্রের সিনিয়র স্টাফ ল’ইয়ার (লিগ্যাল এইড সার্ভিস) অ্যাড. সেলিনা আক্তার।
মালেকা বানু বলেন, যৌন হয়রানি প্রতিরোধে আইন প্রণয়নের দাবি বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ বা নারী আন্দোলনের সাম্প্রতিক কোনো উদ্যোগ নয়। দীর্ঘদিনের আন্দোলন ও অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে এই দাবি, আন্দোলন গড়ে উঠেছে।
তিনি বলেন, ২০০১ সালের দিকে চারুকলার ছাত্রী সিমি, গাইবান্ধার কিশোরী তৃষাসহ বিভিন্ন ঘটনার মধ্য দিয়ে যৌন হয়রানি ও নিপীড়ন কীভাবে নারীর জীবনকে বিপন্ন করে তুলছে, তা পরিলক্ষিত হয়েছে। পরবর্তী সময়ে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও কর্মক্ষেত্রে শিক্ষার্থী ও পেশাজীবীরা যৌন হয়রানি ও নিপীড়নের শিকার হয়েছেন।
তিনি বলেন, অনেক ক্ষেত্রে ক্ষমতা ও প্রভাবশালী অবস্থানের অপব্যবহারের কারণে ভুক্তভোগীরা মানসিক ও সামাজিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন এবং শিক্ষা বা কর্মজীবন থেকে সরে যেতে বাধ্য হয়েছেন। যৌন হয়রানি শুধু একজন নারীকে শারীরিক ও মানসিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে না, এটি তার মর্যাদা ও মানবাধিকারেরও লঙ্ঘন। এই প্রেক্ষাপটে ২০০৯ সাল থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ, নারী আন্দোলন ও বিভিন্ন সংগঠন ধারাবাহিকভাবে আইন প্রণয়নের দাবি জানিয়ে এসেছে। যৌথ উদ্যোগে আইনের খসড়া প্রণয়ন করে তা নীতিনির্ধারকদের কাছেও উপস্থাপন করা হয়েছে। এরপরও দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও আইনটি প্রণীত না হওয়াকে তিনি উদ্বেগজনক বলে উল্লেখ করেন।
লিখিত বক্তব্যে অ্যাড. মাসুদা রেহানা বেগম বলেন, ২০০৯ সালের হাইকোর্টের নির্দেশনার পর থেকেই বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ যৌন হয়রানি প্রতিরোধ আইন প্রণয়ন এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও কর্মক্ষেত্রে অভিযোগ কমিটি গঠনের দাবিতে ধারাবাহিকভাবে আন্দোলন ও অ্যাডভোকেসি করে আসছে। ২০২৪ সালে সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে খসড়া আইন চূড়ান্ত করা হলেও ২০২৬ সালের ২৯ জানুয়ারি ‘যৌন হয়রানি প্রতিরোধ অধ্যাদেশ, ২০২৬’ এর খসড়া নীতিগত অনুমোদন পাওয়ার পরও তা এখনো আইন হিসেবে প্রণীত হয়নি।
সংবাদ সম্মেলনে দ্রুত আইন প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের পাশাপাশি যৌন হয়রানিকে শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে ব্যাপক প্রচারণা, পাঠ্যসূচিতে প্রতিরোধমূলক বিষয় অন্তর্ভুক্তি এবং প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও জনপ্রতিনিধিদের আরও সক্রিয় ভূমিকা পালনের আহ্বান জানানো হয়।
মাসুদা রেহানা বেগম বলেন, বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ মনে করে, জাতীয় সংসদে আইনটি দ্রুত পাস ও বাস্তবায়নের মাধ্যমে নারী ও শিশুদের যৌন হয়রানি ও নিপীড়ন থেকে সুরক্ষা নিশ্চিত করা এবং সহিংসতামুক্ত, সমতাভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠার পথ সুগম হবে।
অ্যাড. সালমা আলী বলেন, ২০০৯ সালে হাইকোর্ট বিভাগ যৌন হয়রানি ও নিপীড়ন নিরোধে গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা দেন এবং এ বিষয়ে আইন প্রণয়নের কথা বলা হয়। প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, কলকারখানাসহ সব কর্মক্ষেত্রে অভিযোগ কমিটি গঠনের কথা বলা হলেও বেশিরভাগ প্রতিষ্ঠানে এর প্রয়োগ দেখা যায়নি এবং এ জন্য কোনো জবাবদিহিতাও নেই।
তিনি আরও বলেন, রাস্তাঘাট, কর্মক্ষেত্রসহ যেকোনো পাবলিক প্লেসে নারীর প্রতি নানা ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত আচরণের কারণে একজন নারী মানসিকভাবে অপমানিত হন। এর ফলে অনেক নারী ও শিশু শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, কর্মক্ষেত্রসহ পাবলিক প্লেস থেকে নিজেদের গুটিয়ে নিচ্ছেন বা জীবন পর্যন্ত দিয়ে দিচ্ছেন। এ জন্য একটি প্রতিরোধমূলক আইন অতি আবশ্যক।
ব্র্যাকের সহযোগী পরিচালক শাশ্বতী বিপ্লব বলেন, ১৭ বছরে একটি শিশু প্রাপ্ত বয়স্ক হওয়ার পর্যায়ে পৌঁছে যায়। তরুণ বয়স থেকে এই আন্দোলন করে এখন মধ্য বয়সে পৌঁছেও রাষ্ট্রের কাছ থেকে কোন আইন পাওয়া গেল না। আজও এই আইনের দাবীতে আন্দোলন করে যেতে হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, সঠিক আইনি কাঠামোর অভাবে হয়রানির শিকার নারীর সুরক্ষা দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। আইনের খসড়া আইন মন্ত্রণালয়ে দেওয়ার পর তা নারী ও শিশু মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে।
চূড়ান্ত আইন হওয়ার আগে নাগরিক সমাজের দেওয়া সুপারিশগুলো যুক্ত হয়েছে কি না, তা পর্যবেক্ষণের জন্য নাগরিক সমাজের সঙ্গে আলোচনার প্রয়োজন বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
ব্লাস্টের পরিচালক মাহাবুবা আক্তার বলেন, হাইকোর্টের নির্দেশনার প্রতিফলন যেন চূড়ান্ত আইনে থাকে এবং প্রতিটি প্রতিষ্ঠান যেন নির্দেশনা অনুযায়ী কমিটি গঠন করতে বাধ্য হয়। তিনি কমিটির বার্ষিক প্রতিবেদন দাখিল এবং এর ভিত্তিতে তদারকির ব্যবস্থা নিশ্চিত করার দাবি জানান।
জাতীয় কন্যাশিশু অ্যাডভোকেসি ফোরামের ন্যাশনাল কো-অর্ডিনেটর সৈয়দা আহসানা জামান এ্যানি নারীর বিরুদ্ধে যেকোনো ধরনের নিপীড়ন ও সহিংসতার বিরুদ্ধে সুরক্ষা নিশ্চিত করতে ‘যৌন হয়রানি ও নিপীড়ন নিরোধ আইন’ প্রণয়নের জোর দাবি জানান।
আইন ও সালিশ কেন্দ্রের লিগ্যাল এইড সার্ভিসের সিনিয়র স্টাফ ল’ইয়ার অ্যাড. সেলিনা আক্তার বলেন, অনেক প্রতিষ্ঠানের নারী কর্মীরা কর্মক্ষেত্রে এ ধরনের হয়রানির শিকার হয়ে অভিযোগ জানাতে আসেন। প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে যৌন হয়রানি প্রতিরোধ কমিটি গঠনের বাধ্যবাধকতা থাকলেও বাস্তবে তা কার্যকর নয়। কিছু প্রতিষ্ঠানে অভিযোগের পর সাক্ষ্য গ্রহণ করা হলেও এরপর আর কোনো পদক্ষেপ নিতে দেখা যায় না। আবার অভিযোগ করার পর ওই নারীর জীবন আরও দুর্বিষহ হয়ে পড়ে।
সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সভাপতি ডা. ফওজিয়া মোসলেম বলেন, যেকোনো নিপীড়ন, হয়রানি বা সহিংসতা সমাজের অপরাধপ্রবণতার একটি লক্ষণমাত্র। এগুলোর বিরুদ্ধে সরকারের সুস্পষ্ট অবস্থান জনগণের প্রতি সঠিক বার্তা পৌঁছে দিতে পারে।
তিনি সামাজিক প্রতিরোধ কমিটিসহ সব সংগঠনের পক্ষ থেকে সরকারের প্রতি দ্রুত যৌন হয়রানি ও নিপীড়ন নিরোধে আইন প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানান।
একই সঙ্গে যারা আইনের খসড়া প্রস্তুতে সহযোগিতা করেছেন, তাদের সঙ্গে পূর্ণাঙ্গ আইনটি নিয়ে আলোচনা করার আহ্বান জানান।
ফওজিয়া মোসলেম বলেন, যাতে এক আইনেই এ সংক্রান্ত সকল বিষয়ের সমাধান সম্ভব হয়। নারীর প্রতি সংবেদনশীল সমাজ তৈরি, নারীর মানবাধিকার প্রতিষ্ঠা ও নারীর ক্ষমতায়নে এ আইন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
দেশবার্তা/একে