বাংলাদেশে আদিবাসী নারীরা রাষ্ট্রীয় অবহেলা ও পুরুষতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থার কারণে এখনো চরমভাবে পিছিয়ে আছেন। বিশেষ করে পার্বত্য চট্টগ্রাম ও সমতলে আদিবাসী নারীদের ভূমি কেন্দ্রিক বিরোধে টার্গেট করে সহিংসতা চালানো হচ্ছে। কিন্তু রাষ্ট্র আজও এসব অপরাধের বিচার নিশ্চিত করতে পারেনি।
সোমবার (৯ মার্চ) আন্তর্জাতিক নারী দিবস উপলক্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বোপার্জিত স্বাধীনতা চত্বরে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় বক্তারা এসব কথা বলেন। বাংলাদেশ আদিবাসী যুব ফোরাম, পার্বত্য চট্টগ্রাম পাহাড়ী ছাত্র পরিষদ, বাংলাদেশ আদিবাসী ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ ও হিল উইমেন্স ফেডারেশন যৌথভাবে এই সভার আয়োজন করে।
সভায় পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির কেন্দ্রীয় সদস্য দীপায়ন খীসা বলেন, ‘বাংলাদেশে আদিবাসী নারীরা এখনো নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। এই রাষ্ট্র আজও তাঁদের জন্য নিরাপদ হতে পারেনি।’ তিনি আক্ষেপ করে বলেন, বর্তমান সংসদে নারীদের প্রতিনিধিত্ব যেমন কম, তেমনি প্রধান বিরোধী দলেও কোনো নারী প্রতিনিধি নেই। অথচ আদিবাসীদের অধিকার আদায়ের সংগ্রামে নারীরা সব সময় বীরত্বের সঙ্গে লড়াই করেছেন।
কমিউনিস্ট পার্টির কেন্দ্রীয় সদস্য লুনা নূর বলেন, রাষ্ট্র মুখে বৈষম্য বিলোপ ও অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের কথা বললেও আদিবাসী নারীদের অবস্থা এখনো নাজুক। তাঁরা বারবার রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের শিকার হচ্ছেন। সমতার বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার জন্য এই প্রতিবাদ জারি রাখার আহ্বান জানান তিনি।
সভায় আদিবাসী নারী নেটওয়ার্কের সাধারণ সম্পাদক ফাল্গুনী ত্রিপুরা বলেন, ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে সমতল—সবখানেই আদিবাসী নারীদের সহিংসতার শিকার হওয়ার মূল কারণ হলো ভূমি। তাঁদের ধর্ষণ, হত্যা ও শ্লীলতাহানি করা হলেও রাষ্ট্র একটিরও বিচার করতে পারেনি।’
সভায় ড. রাশেদা রওনক খান বলেন, ২০২৬ সালের গত দুই মাসেই সারা দেশে ৭৪ জন নারী সহিংসতার শিকার হয়েছেন। অথচ রাজনৈতিক দল বা রাষ্ট্র এই সহিংসতা রোধে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। বিশেষ করে পার্বত্য চট্টগ্রামে রাষ্ট্রীয় মদদপুষ্ট গোষ্ঠীর দ্বারা আদিবাসী নারীরা বারবার নিগৃহীত হচ্ছেন।
পার্বত্য চট্টগ্রাম পাহাড়ী ছাত্র পরিষদ ঢাকা মহানগরের সভাপতি কনেজ চাকমা বলেন, চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানে বৈষম্যমুক্ত সমাজের কথা বলা হলেও আদিবাসীদের ক্ষেত্রে তার প্রতিফলন দেখা যায়নি। ২০০১ সাল থেকে পার্বত্য চট্টগ্রামে ‘অপারেশন উত্তরণ’-এর নামে সেনাশাসন জারি রেখে আদিবাসী নারী ও শিশুদের সহিংসতার মুখে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে বলে তিনি অভিযোগ করেন।
স্বাগত বক্তব্যে মনিরা ত্রিপুরা ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে আদিবাসী নারীদের বীরত্বের কথা স্মরণ করেন। সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্টের সভাপতি মুক্তা বারৈ বম জনগোষ্ঠীর ওপর চলমান রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন ও বম নারীদের কারাবন্দী থাকার বিষয়টি তুলে ধরেন। এ ছাড়া বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের অর্থ সম্পাদক মেইনথিন প্রমীলা অপোষহীন নেত্রী কল্পনা চাকমার অন্তর্ধানের বিচার দাবি করেন।
হিল উইমেন্স ফেডারেশন ঢাকা মহানগর কমিটির সভাপতি চন্দ্রিকা চাকমার সভাপতিত্বে সভাটি সঞ্চালনা করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী কুর্নিকোভা চাকমা। সভা থেকে আদিবাসী নারী ও কন্যাশিশুর অধিকার রক্ষায় ঐক্যবদ্ধ লড়াইয়ের আহ্বান জানানো হয়।
দেশবার্তা/একে