যশোরের ওপর দিয়ে বয়ে যাচ্ছে মাঝারি থেকে তীব্র তাপপ্রবাহ। চৈত্র শেষ ও বৈশাখের শুরুতেই সূর্যের প্রখর উত্তাপ আর ভ্যাপসা গরমে নাভিশ্বাস উঠছে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের এই জনপদের মানুষের। সকাল গড়াতেই আগুনের হল্কা যেন চারপাশ থেকে ঘিরে ধরছে। বিশেষ করে দুপুরের দিকে রাস্তার পিচগলা গরমে সাধারণ মানুষের চলাচল দায় হয়ে পড়েছে।
আজ শনিবার সরেজমিনে শহরের দড়াটানা মোড়, মণিহার এলাকা এবং পালবাড়ি মোড়ে দেখা গেছে স্বাভাবিকের তুলনায় মানুষের উপস্থিতি অনেক কম। জরুরি কাজ ছাড়া কেউ বাইরে বের হচ্ছেন না। যারা বেরিয়েছেন, তাদের ছাতা মাথায় বা মুখে গামছা পেঁচিয়ে চলাচল করতে দেখা গেছে। অতিরিক্ত গরমে রিকশাচালক ও ভ্যানচালকরা পড়েছেন চরম বিপাকে।
পথচারী ইউনুচ আলী বলেন, শীতের শেষ অর্থাৎ মার্চ মাঝামাঝি থেকে চৈত্র মাসের শেষ ও বৈশাখের শুরুর দিকে দেশে তীব্র তাপ্রদাহ শুরু হয়। কিন্তু এ বছর তাপমাত্রা অনেক বেশি হওয়ায় জনজীবনে নাভিশ্বাস উঠেছে। এখন একটু সৃষ্টিকর্তার রহমতের বৃষ্টির প্রয়োজন; বৈশাখের কালবৈশাখী হলে জনমনে একটু শান্তি আসবে।
দড়াটানা মোড়ে অপেক্ষমাণ রিকশাচালক আমিনুর রহমান বলেন, মনে হচ্ছে আকাশ থেকে আগুন ঝরছে। রাস্তার তাপ মুখে এসে লাগছে। বেশিক্ষণ গাড়ি চালানো যাচ্ছে না, শরীর ছেড়ে দিচ্ছে। আগের মতো ভাড়া হচ্ছে না, রাস্তায় তেমন যাত্রী নেই। আধা ঘণ্টা ধরে দাঁড়িয়ে আছি।
৬৮ বছর বয়সী রিকশাচালক মুকবুল হোসেন বলেন, সকালে আসছি, তেমন কোনো যাত্রী নেই। যে গরম পড়েছে, একটু করে গাড়ি চালাচ্ছি আর একটু বিশ্রাম নিচ্ছি।
তীব্র গরমে যশোর ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালে গরমজনিত রোগীর ভিড় উপচে পড়ছে। ডায়রিয়া, নিউমোনিয়া এবং হিটস্ট্রোকের লক্ষণ নিয়ে কয়েক শত রোগী ভর্তি হচ্ছেন। বিশেষ করে শিশু ওয়ার্ডে তিল ধারণের জায়গা নেই। শয্যা না পেয়ে অনেক রোগীকে বারান্দা ও মেঝেতে চিকিৎসা নিতে দেখা গেছে।
যশোর জেনারেল হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের অনারারি মেডিকেল অফিসার নাজমুল হুদা বলেন, গরমে ডায়রিয়া, ডিহাইড্রেশন এবং হিটস্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়ছে। বিশেষ করে শিশু ও বয়স্কদের ঘরের বাইরে না বের হওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। হাসপাতালের বহির্বিভাগে গরমজনিত রোগে আক্রান্ত রোগীর ভিড় আগের চেয়ে বেড়েছে। কর্মজীবী মানুষেরা বাইরে বের হলে ছাতা ব্যবহার করবেন। এছাড়া পানি, স্যালাইন, ডাবের পানি, তরমুজ ও তরল খাবার বেশি বেশি খাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
মাঠের ফসলের ওপর এই খরার প্রভাব আরও ভয়াবহ। দীর্ঘদিন বৃষ্টির দেখা নেই, ফলে শুকিয়ে যাচ্ছে ফসলের খেত। ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ায় অনেক গভীর ও অগভীর নলকূপে পানি উঠছে না। এতে সেচ খরচ কয়েক গুণ বেড়ে গেছে। অনেক এলাকায় সুপেয় পানির তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে।
যশোর সদর ও চৌগাছা উপজেলার কৃষকরা আশঙ্কা করছেন, এই পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে বোরো ধানের ফলন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হতে পারে।
চৌগাছা উপজেলার পাশাপোল ইউনিয়নের বাড়ীয়ালী গ্রামের কৃষক জুবায়ের হোসেন বলেন, গ্রামের কোনো টিউবওয়েলে পানি উঠছে না। মোটর দিয়ে একটি পাঁচশ লিটারের ট্যাংক ভরতে আগে সময় লাগত সাত থেকে আট মিনিট, এখন সময় লাগে আধা ঘণ্টা থেকে পঁয়তাল্লিশ মিনিট। আর বিদ্যুতের চরম লোডশেডিংয়ে শিশুদের নিয়ে বেশি কষ্ট হচ্ছে।
চৈত্রের শেষ আর বৈশাখের এই রুদ্রমূর্তিতে পশুপাখিও দিশেহারা। পুকুর ও খাল-বিল শুকিয়ে যাওয়ায় গৃহপালিত পশু ও মাছের খামারে মড়ক দেখা দেওয়ার ভয় পাচ্ছেন খামারিরা। মুরগির খামারে তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখতে হিমশিম খাচ্ছেন মালিকরা।
যশোর বীরশ্রেষ্ঠ মতিউর রহমান বিমানঘাঁটির আবহাওয়া অফিস সূত্র জানিয়েছে, জেলায় তাপমাত্রা ৩৮ থেকে ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের ঘরে ওঠানামা করছে। আর্দ্রতা বেশি হওয়ায় অনুভূত তাপমাত্রা আরও কয়েক ডিগ্রি বেশি মনে হচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে সাধারণ মানুষকে সতর্ক থাকতে পরামর্শ দিচ্ছে জেলা প্রশাসন ও স্বাস্থ্য বিভাগ।
সংশ্লিষ্টরা আরও জানান, বঙ্গোপসাগরে লঘুচাপের অভাব এবং পশ্চিমা লঘুচাপের প্রভাবে এই তাপপ্রবাহ আরও কয়েক দিন স্থায়ী হতে পারে। বৃষ্টির কোনো আশু সম্ভাবনা নেই বলে জানিয়েছেন আবহাওয়াবিদগণ। যশোরসহ পার্শ্ববর্তী জেলাগুলোতে ‘হিট অ্যালার্ট’ জারি রাখা হয়েছে।
তীব্র গরমে সুস্থ থাকতে প্রচুর পরিমাণ নিরাপদ পানি, ডাবের পানি ও খাবার স্যালাইন পান করার পরামর্শ দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা। এছাড়া সরাসরি রোদ এড়িয়ে চলা এবং ঢিলেঢালা সুতির পোশাক পরার ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে মাইকিং করে অপ্রয়োজনে বাড়ির বাইরে না বের হওয়ার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
স্কুল-কলেজ পড়ুয়া শিক্ষার্থীদের বিশেষ সতর্কতায় রাখা এবং শ্রমজীবী মানুষদের পর্যাপ্ত বিরতি নিয়ে কাজ করার আহ্বান জানানো হয়েছে।