বাগেরহাটের মোরেলগঞ্জে টানা তিন দিনের ভারী ও থেমে থেমে মাঝারি বৃষ্টিপাতে জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। বুধবার (৮ জুলাই) সারাদিন আকাশ ছিল মেঘাচ্ছন্ন, দফায় দফায় বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকায় পৌর শহরসহ উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নের নিম্নাঞ্চলে জলাবদ্ধতা আরও তীব্র আকার ধারণ করেছে। রাস্তাঘাট, বসতবাড়ি, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে পানি ঢুকে পড়ায় চরম দুর্ভোগে পড়েছেন হাজারো মানুষ।
টানা বৃষ্টিতে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন দিনমজুর, ভ্যানচালক, কৃষি ও খেটে খাওয়া মানুষ। কাজ না থাকায় অনেক পরিবারে আয়-রোজগার বন্ধ হয়ে গেছে। একই সঙ্গে বাজারে ক্রেতা কমে যাওয়ায় ব্যবসায়ীরাও লোকসানের মুখে পড়েছেন।
ভ্যানচালক মো. জব্বার হাওলাদার বলেন, "বৃষ্টির কারণে কোনো কাজ নেই। সারাদিন বসে থাকতে হচ্ছে। কাজ না করলে সংসার চলবে কীভাবে?"
ফল ব্যবসায়ী লাল মিয়া বলেন, "সামান্য বৃষ্টিতেই বাজারে পানি জমে যায়। কয়েক ঘণ্টা ব্যবসা বন্ধ থাকে। বিক্রি না হওয়ায় মহাজনের টাকা পরিশোধ করাও কঠিন হয়ে পড়েছে।"
বারইখালী এলাকার বাসিন্দা সৈয়দ মোস্তাফিজুর রহমান নান্নু বলেন, "রাস্তাঘাট ও বাড়িতে হাঁটুর নিচ পর্যন্ত পানি জমে আছে। রান্নাঘরে পানি ওঠায় তিন দিন ধরে অন্যের বাড়িতে রান্না করে খাবার আনতে হচ্ছে।"
একই এলাকার মোর্শেদা বেগম বলেন, "জোয়ার-ভাটার সঙ্গে মিলিয়ে রান্না করতে হচ্ছে। ছোট ছোট সন্তানদের নিয়ে পানিবন্দি অবস্থায় খুব কষ্টে দিন কাটছে।"
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, জলাবদ্ধতার কারণে উপজেলার প্রায় ৩০টি গ্রামের মানুষ দুর্ভোগে পড়েছেন। অনেক এলাকায় ঘরবাড়ি, উঠান ও গ্রামীণ সড়ক পানিতে তলিয়ে গেছে। ফলে শিক্ষা, চিকিৎসা ও দৈনন্দিন যাতায়াতও ব্যাহত হচ্ছে।
এদিকে বদনীভাঙ্গা, সানকিভাঙ্গা, পাঠামারা, খাউলিয়া বাজার ব্রিজ এলাকা, এসিলাহা পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়, বদনীভাঙ্গা আদর্শ মাধ্যমিক বিদ্যালয়, ৮০ নম্বর বি পাঠামারা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, বহরবুনিয়া এসবি আদর্শ মাধ্যমিক বিদ্যালয়সহ পানগুছি নদীর তীরবর্তী বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও গ্রাম নদীভাঙনের ঝুঁকিতে রয়েছে। দীর্ঘদিনের নদীভাঙনে ফসলি জমি, বসতভিটা ও গাছপালা নদীগর্ভে বিলীন হয়ে শত শত পরিবার সর্বস্বান্ত হয়েছে।
পৌর শহরের কাপুড়িয়া পট্টি, কাঁচাবাজার, কলেজ রোড, কেজি স্কুল সড়ক ও উপজেলা প্রশাসনিক চত্বরসহ বিভিন্ন এলাকায় পানি জমে থাকায় প্রতিদিন কয়েক ঘণ্টা ব্যবসা-বাণিজ্য কার্যত বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। রাতের জোয়ারের সময় পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে।
ফল ব্যবসায়ী মিজান শেখ, কসমেটিকস ব্যবসায়ী হারুন মোল্লা ও গার্মেন্টস ব্যবসায়ী পলাশ শিকদার জানান, দুপুরের পর থেকেই বাজারে পানি বাড়তে শুরু করে এবং দোকানের ভেতরে পানি ঢুকে পড়ে। এতে ৪ থেকে ৫ ঘণ্টা দোকান বন্ধ রাখতে হয়। গ্রাম থেকে আসা ক্রেতারাও ফিরে যেতে বাধ্য হন।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, প্রতি বর্ষা মৌসুমেই একই চিত্রের পুনরাবৃত্তি ঘটে। কার্যকর ড্রেনেজ ব্যবস্থা, টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণ এবং নদীভাঙন রোধে দ্রুত স্থায়ী উদ্যোগ গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন তারা।
এ বিষয়ে বাগেরহাট পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী জানান, মোরেলগঞ্জ শহর সংলগ্ন রামপাল-মোংলা হয়ে ঘষিয়াখালী পর্যন্ত প্রায় ৯৫ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ নির্মাণের সম্ভাব্যতা সমীক্ষা মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। পাশাপাশি পানগুছি নদীর ভাঙন রোধ ও বিষখালী নদী পুনঃখনন প্রকল্পের কাজও চলমান রয়েছে। এসব প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে জলাবদ্ধতা ও নদীভাঙন সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রতিবছর বর্ষা এলেই একই দুর্ভোগের মুখোমুখি হতে হয়। দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়া হলে টানা বৃষ্টি ও জোয়ারের প্রভাবে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন তারা।
প্রতিনিধি/আরএইচ