টানা ভারী বর্ষণে সৃষ্ট বন্যা ও পাহাড়ধসে কক্সবাজারে গত সাত দিনে ২৬ জনের মৃত্যু হয়েছে। গত রোববার থেকে শুক্রবার পর্যন্ত জেলায় পানিতে ডুবে ও পাহাড়ের মাটি চাপা পড়ে এসব প্রাণহানির ঘটনা ঘটে। বন্যায় জেলার ১০টি উপজেলার অন্তত ১৫০টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। এতে পানিবন্দি হয়ে দুর্বিষহ জীবন কাটাচ্ছেন প্রায় তিন লাখ মানুষ।
জানা গেছে, সর্বশেষ শুক্রবার দুপুরে চকরিয়ার বরইতলী ইউনিয়নে নৌকাডুবিতে হাসনাতুল জান্নাত ঝর্ণা (১২) নামের এক কিশোরীর মৃত্যু হয়। বন্যা পরিস্থিতির কারণে বাড়িঘর তলিয়ে যাওয়ায় পরিবারের সাথে নিরাপদ আশ্রয়ে যাওয়ার পথে এই দুর্ঘটনা ঘটে। নিহত ঝর্ণা বরইতলীর রসুলাবাদ এলাকার আবদুল মালেকের মেয়ে। এ ঘটনায় ঝর্ণার অপর দুই বোনকে জীবিত উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
এর আগে বৃহস্পতিবার বিকেলে চকরিয়ার কাকারা ইউনিয়নে পানিতে ডুবে মোহাম্মদ ওয়াকিম নামের দুই বছরের এক শিশুর মৃত্যু হয়। একই দিন সকালে মাতামুহুরী উপজেলার কোনাখালী ইউনিয়নে বন্যার পানিতে ভেসে গিয়ে প্রাণ হারায় পুষ্প (৩) নামের আরেক শিশু। তাছাড়া বৃহস্পতিবার ভোরে চকরিয়ার মছনিয়া কাটা এলাকায় পাহাড়ধসে বসতঘরের ওপর মাটি চাপা পড়ে একই পরিবারের দুই শিশুর মৃত্যু হয়। এর বাইরে কক্সবাজার সদর, পেকুয়া এবং উখিয়ার রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ১৫ জন রোহিঙ্গাসহ আরও ২১ জনের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেছে প্রশাসন।
জেলা প্রশাসনের তথ্যমতে, এবারের বন্যায় জেলার ১০টি উপজেলার ৩৫টি ইউনিয়নের অন্তত ১৫০টি গ্রাম তলিয়ে গেছে। এর মধ্যে চকরিয়া, পেকুয়া ও নবগঠিত মাতামুহুরী উপজেলা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এছাড়া কক্সবাজার সদর, রামু, উখিয়া, টেকনাফ, মহেশখালী, কুতুবদিয়া ও ঈদগাঁও উপজেলার বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়েছে।
কক্সবাজার পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. নূরুল ইসলাম জানান, উজান থেকে অর্থাৎ বান্দরবান শহর থেকে পানি নামতে শুরু করায় মাতামুহুরি নদীর পানি বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে চকরিয়া ও পেকুয়ার নিম্নাঞ্চলগুলো নতুন করে প্লাবিত হচ্ছে।
চকরিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শাহীন দেলোয়ার (মাতামুহুরীর অতিরিক্ত দায়িত্বপ্রাপ্ত) বলেন, চকরিয়া ও মাতামুহুরীতে এক লাখের বেশি মানুষ পানিবন্দি রয়েছেন। এখানকার ৯৬টি আশ্রয়কেন্দ্রে দুর্গতদের শুকনো খাবারসহ জরুরি সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। ক্ষতিগ্রস্ত বাঁধ মেরামত এবং পানি দ্রুত নামিয়ে দেওয়ার জন্য স্লুইস গেটগুলো সচল রাখতে প্রশাসন কাজ করে যাচ্ছে।
জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা মোহাম্মদ আজাদ রহমান জানান, সরকারি হিসাব মতে শুক্রবার সন্ধ্যা পর্যন্ত কক্সবাজারে বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সংখ্যা ১ লাখ ৫০ হাজার ৬৬২। জেলার ৬৪৮টি আশ্রয়কেন্দ্রে ১৪ হাজার ৬১ জন মানুষ আশ্রয় নিয়েছেন। পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকারিভাবে ২০০ টন চাল, ৪৫০ প্যাকেট শুকনো খাবার এবং নগদ ১২ লাখ ৪৫ হাজার টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। ত্রাণ ও জরুরি সহায়তা কার্যক্রম সমন্বয়ের জন্য জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে একটি নিয়ন্ত্রণ কক্ষ (কন্ট্রোল রুম) খোলা হয়েছে।
এদিকে বৃষ্টির তীব্রতা এখনই কমছে না বলে জানিয়েছে আবহাওয়া অফিস। কক্সবাজার আবহাওয়া অধিদপ্তরের সহকারী আবহাওয়াবিদ মোহাম্মদ আবদুল হান্নান বলেন, শুক্রবার রাত পর্যন্ত গত ৬ দিনে কক্সবাজারে ৭০০ মিলিমিটারের বেশি বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। আগামী দুই দিন মাঝারি থেকে ভারী বর্ষণ অব্যাহত থাকতে পারে। এতে বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতি এবং নতুন করে পাহাড়ধসের আশঙ্কা রয়েছে।
ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতির কারণে সমুদ্রবন্দর ও উপকূলীয় এলাকার জন্য ৩ নম্বর স্থানীয় সতর্ক সংকেত বহাল রাখা হয়েছে বলে জানান এই আবহাওয়াবিদ।
দেশবার্তা/একে