পার্বত্য চট্টগ্রামের দীর্ঘদিনের সংঘাতপূর্ণ পরিস্থিতির অবসান, স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা, নিরাপত্তা জোরদার, সাম্প্রতিক বন্যা পরিস্থিতি মোকাবিলা এবং প্রাকৃতিক সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবহার ও ভূমি ব্যবস্থাপনা বিষয়ে জনসচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে বুধবার (২২ জুলাই) সকালে বান্দরবান শহরের হিল ভিউ কনভেনশন হলে এক আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়।
সভায় সভাপতিত্ব করেন দৈনিক দেশ বর্তমান-এর হেড অব নিউজ শাহরিয়ার হাসান। অনুষ্ঠানের শুরুতে পার্বত্য চট্টগ্রামের শান্তি, নিরাপত্তা, জলবায়ু পরিবর্তন, বন্যা পরিস্থিতি, প্রাকৃতিক সম্পদ ব্যবস্থাপনা ও নাগরিক অংশগ্রহণ নিয়ে একটি গবেষণাধর্মী প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বিশিষ্ট সাংবাদিক পারভেজ কামাল।
আলোচনা সভায় বক্তব্য দেন জাগো জনতার চেয়ারম্যান ও পার্বত্য চট্টগ্রাম নাগরিক পরিষদের (পিসিএনপি) কেন্দ্রীয় কমিটির চেয়ারম্যান মো. কাজী মুজিবুর রহমান, বান্দরবান জেলা জামায়াতে ইসলামীর আমির মৌলভী আবদুস সালাম, লেখক, গবেষক ও সাংবাদিক এ এইচ এম ফারুক, বান্দরবান জেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক মুজিবুর রশিদ, অধ্যাপক ওসমান গনি, জসিম উদ্দিন তুষার, সিএইচটি সম্প্রীতি জোটের সভাপতি থোয়াইচিং চাক, বান্দরবান জেলা আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট আবু জাফর, চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবের সাংবাদিক ফারুক আবদুল্লাহ, বান্দরবান প্রেস ক্লাবের সাবেক সাধারণ সম্পাদক মিনারুল হক, পার্বত্য চট্টগ্রাম ছাত্র পরিষদ, বান্দরবানের সভাপতি আসিফ ইকবাল, পার্বত্য চট্টগ্রাম নাগরিক পরিষদ (পিসিএনপি) ও ইসলামী আন্দোলনের সভাপতি মৌলানা আবুল কালাম আজাদ, লামা প্রেস ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক কামরুজ্জামান এবং পার্বত্য যুব পরিষদ খাগড়াছড়ি জেলার সভাপতি জালাল মিয়াসহ অন্যরা।
বক্তারা বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রাম বাংলাদেশের মোট ভূখণ্ডের প্রায় এক-দশমাংশ হলেও এর ভূ-রাজনৈতিক, পরিবেশগত, অর্থনৈতিক ও জাতীয় নিরাপত্তাগত গুরুত্ব অত্যন্ত বেশি। কিন্তু দীর্ঘদিনের সংঘাত, ভূমি-সংক্রান্ত বিরোধ, উন্নয়ন বৈষম্য, সশস্ত্র তৎপরতা, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগ এ অঞ্চলের টেকসই উন্নয়নের পথে বড় বাধা হয়ে রয়েছে।
তারা পার্বত্য চট্টগ্রামের সংকট মোকাবিলায় দেশের সংবিধানকে সর্বোচ্চ প্রাধান্য দেওয়ার দাবি জানান। একই সঙ্গে শান্তি প্রতিষ্ঠায় পারস্পরিক আস্থা, আইনের শাসন, ন্যায়ভিত্তিক উন্নয়ন এবং জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
বক্তারা আরও বলেন, নিরাপত্তা জোরদার, অবৈধ অস্ত্র ও চাঁদাবাজি দমন, সীমান্ত নজরদারি বৃদ্ধি, কমিউনিটি পুলিশিং সম্প্রসারণ এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মধ্যে সমন্বয় আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন।
সাম্প্রতিক বন্যা, পাহাড়ি ঢল ও ভূমিধসের ক্ষয়ক্ষতির প্রসঙ্গ তুলে বক্তারা আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা উন্নত করা, আশ্রয়কেন্দ্র বৃদ্ধি, নদী পুনঃখনন, পাহাড় কাটা বন্ধ, জলাধার সংরক্ষণ এবং জলবায়ু-সহনশীল অবকাঠামো নির্মাণের আহ্বান জানান।
প্রাকৃতিক সম্পদের টেকসই ব্যবস্থাপনার ওপর গুরুত্ব দিয়ে তারা বন উজাড়, অবৈধ পাহাড় কাটা, বালু ও পাথর উত্তোলন এবং নদী দূষণ বন্ধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের পাশাপাশি সামাজিক বনায়ন, বন সংরক্ষণ আইন বাস্তবায়ন, পরিবেশ আদালতের কার্যকারিতা বৃদ্ধি এবং পরিবেশবান্ধব পর্যটনের প্রসারের সুপারিশ করেন।
নাগরিক সমাজের ভূমিকা তুলে ধরে বক্তারা বলেন, শান্তি সংলাপ, মানবাধিকার সুরক্ষা, দুর্যোগে স্বেচ্ছাসেবী কার্যক্রম, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধিতে নাগরিক সমাজকে আরও সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে হবে।
আলোচনা সভা থেকে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠায় অন্তর্ভুক্তিমূলক সংলাপ, আইনের শাসন সুদৃঢ় করা, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী করা, যুবসমাজের কর্মসংস্থান সৃষ্টি, পরিবেশবান্ধব উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণ এবং গবেষণা ও তথ্যভিত্তিক নীতি প্রণয়নের আহ্বান জানানো হয়।
বক্তাদের মতে, রাষ্ট্র, স্থানীয় জনগণ, জনপ্রতিনিধি, গবেষক, নাগরিক সমাজ এবং উন্নয়ন সহযোগীদের সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমেই একটি সংঘাতমুক্ত, নিরাপদ, পরিবেশসম্মত ও টেকসই পার্বত্য চট্টগ্রাম গড়ে তোলা সম্ভব।
দৈনিক দেশ বর্তমান, জাগো জনতা, হ্যালো বাংলা ও দৈনিক বান্দরবান বার্তা যৌথভাবে এ আলোচনা সভার আয়োজন করে। অনুষ্ঠানের মিডিয়া পার্টনার ছিল সকালের সময়, পার্বত্য বাণী, বার্তা টুডে, চ্যানেল সিএইচটি, চট্টগ্রাম সারাদিন, সময়ের নিউজ ও নোঙর।
দেশবার্তা/আরএইচ