প্রকৃতির সবুজ অরণ্য ও পাহাড়ি সৌন্দর্যে ঘেরা পার্বত্য জেলা রাঙামাটি দীর্ঘদিন ধরে দেশের ভ্রমণপিপাসু পর্যটকদের অন্যতম গন্তব্য। এবার সেই আকর্ষণ আরও বাড়াতে জেলা শহরের সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগব্যবস্থা তৈরি করা ফিসারী সংযোগ বাঁধকে নতুন রূপে সাজাচ্ছে সড়ক ও জনপদ (সওজ) বিভাগ। বহু বছর অবহেলিত এই সড়কটি কোটি টাকা ব্যয়ে হয়ে উঠছে মনোরম ওয়াকওয়ে ও আধুনিক সড়ক অবকাঠামো।
সওজ জানিয়েছে, প্রায় ১০ কোটি টাকা ব্যয়ে বাঁধটির পূর্ণাঙ্গ সংস্কার ও সম্প্রসারণের কাজ চলছে। পাশাপাশি পর্যটকদের বিনোদনের জন্য ৯০ লাখ টাকা ব্যয়ে ওয়াকওয়ে ও সৌন্দর্যবর্ধনের কাজও প্রায় শেষ পর্যায়ে। ইতোমধ্যে প্রকল্পের ৯৭ শতাংশ কাজ সম্পন্ন হয়েছে।
সংস্কারের অংশ হিসেবে সড়ক উন্নয়ন, দু’পাশে ধারক দেয়াল নির্মাণ, ফুলের বাগান, বসার স্থান ও দৃষ্টিনন্দন ল্যান্ডস্কেপিং করা হয়েছে। পর্যটকরা এখন সড়কের পাশেই বসে কাপ্তাই হ্রদের নীলাভ জলরাশি আর পাহাড়ি দৃশ্য উপভোগ করতে পারবেন।
লেকভিউ গার্ডেনে বেড়াতে আসা শারমিন আক্তার বলেন, এত সুন্দর হবে ভাবিনি। শহরের ভেতরেই এমন আকর্ষণীয় স্পট হওয়ায় মন চাইলে চলে আসতে পারি।
স্থানীয় লতিফ সিদ্দিকী বলেন, গাছে–গাছে, ফুলে–ফুলে সেজেছে পুরো সড়ক। অবসর কাটানোর এখন আমার প্রিয় জায়গা লেকভিউ গার্ডেন।
১৯৬৪ সালে তৎকালীন সরকার রিজার্ভবাজার, তবলছড়ি ও বনরূপা—এই তিন গুরুত্বপূর্ণ এলাকার যোগাযোগ সহজ করতে কাপ্তাই হ্রদের মাঝ বরাবর বাঁধ নির্মাণ করে ফিসারী সংযোগ সড়ক স্থাপন করে। এই সড়কের ওপর দাঁড়িয়ে আছে রাঙামাটি শহরের পুরো যোগাযোগব্যবস্থা। কিন্তু নির্মাণের পর দীর্ঘ সময় ধরে কোনো উল্লেখযোগ্য সংস্কার হয়নি।
২০১৭ সালের বিধ্বংসী পাহাড়ধসে গুরুত্বপূর্ণ এই সড়কটির বড় অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। হ্রদের ঢেউ ও পাহাড়ি ঢলের আঘাতে দিন দিন ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে বাঁধটি। স্থানীয় জনসাধারণ এবং বিভিন্ন সামাজিক সংগঠন বারবার মানববন্ধন ও আন্দোলন করেও তাৎক্ষণিক সমাধান পায়নি।
পরে সওজ আপৎকালীনভাবে খুঁটি পুঁতে যান চলাচল সচল রাখলেও সড়কটি ক্রমেই ভঙ্গুর হয়ে পড়ছিল। পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ড, পৌরসভা, জেলা পরিষদ ও পানি উন্নয়ন বোর্ড—কেউই এ বাঁধকে স্থায়ীভাবে রক্ষায় কার্যকর উদ্যোগ নিতে পারেনি। অবশেষে পাহাড়ধসের ক্ষতির পর সওজ দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা হাতে নেয়।
রাঙামাটি সড়ক বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী সবুজ চাকমা জানান, ফিসারী সংযোগ বাঁধের সংস্কার ও সৌন্দর্যবর্ধনের কাজ প্রায় শেষ। পুরো সড়ক প্রস্তুত হলে পর্যটকদের আকর্ষণ বাড়বে, পাশাপাশি স্থানীয় বাসিন্দারা ওয়াকিং ও জগিং করার সুযোগ পাবেন। রাঙামাটির পর্যটনে আমূল পরিবর্তন আসবে।
তিনি আরও বলেন, বাঁধের অপর পাশেও প্রতিরক্ষা দেয়াল নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। বিশেষজ্ঞ ও পরামর্শকদের মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা অনুযায়ী কাজ চলছে।
কাপ্তাই হ্রদের বিস্তৃত জলরাশি আর পাহাড়ি দৃশ্যপটের কারণে ফিসারী সংযোগ বাঁধ আগে থেকেই দর্শনার্থীদের কাছে জনপ্রিয় ছিল। কিন্তু দীর্ঘ অবহেলায় এর অস্তিত্বই হুমকির মুখে পড়েছিল। বর্তমান প্রকল্প শেষ হলে বাঁধটি নতুন রূপে রাঙামাটির অন্যতম আকর্ষণীয় পর্যটন স্পটে পরিণত হবে—এমনটাই আশা সংশ্লিষ্টদের।
প্রতিনিধি/একে