নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধিতে চাপে পড়েছেন দেশের সাধারণ মানুষ। চাল, ডাল, আটা, ভোজ্যতেল, ডিম, সবজি ও অন্যান্য খাদ্যপণ্য কিনতে আগের তুলনায় বেশি টাকা খরচ করতে হচ্ছে। আয় বাড়ার তুলনায় সংসারের ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়ছেন নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্ত পরিবারের সদস্যরা। বাজারে পণ্যের দাম বাড়ার পাশাপাশি পরিবহন ও অন্যান্য দৈনন্দিন খরচও তাঁদের জীবনযাত্রাকে কঠিন করে তুলছে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে দেশে সাধারণ মূল্যস্ফীতি বেড়ে ৮ দশমিক ৩৪ শতাংশে দাঁড়িয়েছে, যা আগস্টে ছিল ৮ দশমিক ২৬ শতাংশ। একই সময়ে খাদ্য মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ২ শতাংশ থেকে বেড়ে ৭ দশমিক ২২ শতাংশ হয়েছে। অর্থাৎ, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম সাধারণ মানুষের ব্যয়ের ওপর চাপ সৃষ্টি করে চলেছে।
সম্প্রতি রাজধানীর বিভিন্ন বাজারে চালের দামও বেড়েছে। ১৩ অক্টোবর প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে দেখা যায়, ঢাকার বাজারে সরু চালের দাম এক সপ্তাহের ব্যবধানে কেজিপ্রতি ৭২ টাকা থেকে বেড়ে ৭৪ থেকে ৭৫ টাকায় পৌঁছেছে। মাঝারি চালের দামও বেড়েছে। এসব পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি সাধারণ পরিবারের মাসিক বাজার খরচ আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।
দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির পেছনে একাধিক কারণ রয়েছে। পণ্য উৎপাদনের খরচ, পরিবহন ব্যয়, জ্বালানি তেলের দাম, আমদানি ব্যয় এবং সরবরাহব্যবস্থার সমস্যার প্রভাব বাজারে পড়তে পারে। গত ২১ সেপ্টেম্বর থেকে দেশে ডিজেলসহ বিভিন্ন জ্বালানি তেলের দাম লিটারপ্রতি ২০ টাকা বাড়ানো হয়। জ্বালানির দাম বাড়লে কৃষিপণ্য পরিবহন, পাইকারি বাজারে পণ্য পৌঁছানো এবং খুচরা পর্যায়ে সরবরাহের খরচও বাড়তে পারে।
এ ছাড়া বন্যা, অতিবৃষ্টি কিংবা অনাবৃষ্টির মতো প্রতিকূল আবহাওয়ায় কৃষিপণ্যের উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যাহত হলে কিছু পণ্যের দাম বেড়ে যেতে পারে। আমদানিনির্ভর পণ্যের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক বাজারের মূল্য, ডলারের বিনিময় হার এবং আমদানি-পরিবহন খরচও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তবে সব পণ্যের দাম বৃদ্ধির কারণ এক নয়; পণ্যভেদে উৎপাদন, মজুত, চাহিদা ও সরবরাহের পরিস্থিতি আলাদাভাবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
বাজারে মধ্যস্বত্বভোগীর সংখ্যা বেশি থাকা, অস্বচ্ছ সরবরাহব্যবস্থা এবং কোথাও কোথাও অতিরিক্ত মুনাফার প্রবণতাও মূল্যবৃদ্ধির চাপ বাড়াতে পারে। তাই বাজারে প্রকৃত সরবরাহ পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ, মজুত ও বিক্রির তথ্য যাচাই এবং অনিয়মের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। একই সঙ্গে পাইকারি ও খুচরা বাজারের দামের মধ্যে অস্বাভাবিক পার্থক্য রয়েছে কি না, তা নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা প্রয়োজন।
দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ছে সীমিত আয়ের পরিবারগুলোর ওপর। আগে যে পরিমাণ টাকা দিয়ে একটি পরিবার মাসের প্রয়োজনীয় বাজার করতে পারত, এখন একই পরিমাণ পণ্য কিনতে আরও বেশি অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে। ফলে অনেক পরিবারকে মাছ, মাংস, ফল ও অন্যান্য পুষ্টিকর খাবার কেনার পরিমাণ কমাতে হচ্ছে। বাড়িভাড়া, বিদ্যুৎ বিল, যাতায়াত ও শিক্ষা ব্যয়ের সঙ্গে বাজার খরচ যোগ হওয়ায় সংসারের বাজেট সামলানো কঠিন হয়ে পড়ছে।
একজন নিম্ন আয়ের চাকরিজীবীর মতে, সংসারের আয় সীমিত থাকায় নিত্যপণ্যের দাম বাড়লে অন্য খরচ কমিয়ে পরিস্থিতি সামাল দিতে হয়। বিশেষ করে চাল, ডাল, তেল ও সবজির মতো প্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়লে মাসের শেষ দিকে অর্থের সংকট দেখা দেয়। এতে পরিবারের অন্যান্য প্রয়োজন মেটানোও কঠিন হয়ে পড়ে।
অন্যদিকে, বাজারের একজন ক্রেতার মতে, একই পণ্যের দাম দোকানভেদে আলাদা হওয়ায় ক্রেতাদের সমস্যায় পড়তে হয়। বাজারে গিয়ে পণ্যের দাম যাচাই করা এবং কম দামে প্রয়োজনীয় জিনিস কেনার চেষ্টা করতে হয়। তবে সব সময় কম দামে ভালো মানের পণ্য পাওয়া যায় না। এ কারণে বাজারে পণ্যের মূল্যতালিকা প্রদর্শন এবং নিয়মিত তদারকি নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন অনেক ক্রেতা।
বাজারসংশ্লিষ্ট একজন বিক্রেতার মতে, পাইকারি বাজার থেকে পণ্য কেনার খরচ, পরিবহন ব্যয় এবং সরবরাহের ওঠানামা খুচরা দামের ওপর প্রভাব ফেলে। পাইকারি পর্যায়ে দাম বাড়লে খুচরা বাজারেও তার প্রভাব পড়ে। তবে পণ্যের প্রকৃত ক্রয়মূল্য ও বিক্রয়মূল্যের মধ্যে স্বচ্ছতা থাকা প্রয়োজন, যাতে ক্রেতারা ন্যায্য দামে পণ্য কিনতে পারেন।
অর্থনীতি সংশ্লিষ্ট একজন বিশেষজ্ঞের মতে, দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে শুধু বাজারে অভিযান পরিচালনা যথেষ্ট নয়। উৎপাদন ও সরবরাহব্যবস্থা উন্নত করা, কৃষকের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করা, আমদানি ও মজুত পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ এবং প্রতিযোগিতামূলক বাজারব্যবস্থা গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। একই সঙ্গে নিম্ন আয়ের মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বিবেচনায় রেখে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি ও ন্যায্যমূল্যে পণ্য বিক্রির কার্যক্রম আরও কার্যকর করা প্রয়োজন।
দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে সরকারের পাশাপাশি ব্যবসায়ী, উৎপাদক, আমদানিকারক ও ভোক্তাদেরও দায়িত্ব রয়েছে। বাজারে পর্যাপ্ত পণ্যের সরবরাহ নিশ্চিত করা, কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি রোধ করা, মজুতদারির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া এবং নিয়মিত বাজার তদারকি জোরদার করা জরুরি। পাশাপাশি কৃষকদের উৎপাদন খরচ কমানো ও সরাসরি বাজারে পণ্য সরবরাহের সুযোগ বাড়ানো গেলে মধ্যস্বত্বভোগীদের ওপর নির্ভরতা কমতে পারে।
সব মিলিয়ে, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি এখন সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ। মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমলেও বাজারে পণ্যের দাম আগের অবস্থায় ফিরে আসবে—এমন নয়। তাই বাজারদর স্থিতিশীল রাখা, পণ্যের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা এবং সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা রক্ষায় কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিয়মিত তদারকি, বাজারে স্বচ্ছতা এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার মাধ্যমে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে রাখার উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।
প্রতিনিধি/আরএইচ