দেশে ডেঙ্গু পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে। সরকারি হাসপাতালগুলোতে রোগীর চাপ বাড়ছে। এতে দেশের চিকিৎসাব্যবস্থা ও স্বাস্থ্য খাতের প্রস্তুতি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের গত শনিবার পর্যন্ত দেশে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে ৩৪২ জনের মৃত্যু হয়েছে। মোট আক্রান্তের সংখ্যা ছাড়িয়েছে ১ লাখ ১০ হাজার ৩১২।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, ডেঙ্গু এখন আর শুধু মৌসুমি রোগ নয়, এটি জাতীয় জনস্বাস্থ্য সংকটে পরিণত হয়েছে।
রাজধানীর প্রধান সরকারি হাসপাতালগুলোর মধ্যে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে শয্যাসংকট দেখা দিয়েছে। সাধারণ ওয়ার্ডের পাশাপাশি হাসপাতালের মেঝে ও বারান্দাতেও ডেঙ্গু রোগীদের থাকতে হচ্ছে। সবচেয়ে তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রের (আইসিইউ) শয্যা নিয়ে।
শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মেডিসিন ওয়ার্ডের চিকিৎসকেরা জানান, গুরুতর অবস্থায় আসা প্রায় ৪০ থেকে ৫০ জন মুমূর্ষু রোগী প্রতি রাতে একটি আইসিইউ শয্যার জন্য অপেক্ষা করছেন। ঢাকার বাইরের জেলা ও উপজেলা হাসপাতালগুলোতে প্লাটিলেট সেপারেটর এবং পর্যাপ্ত আইসিইউ-সুবিধা না থাকায় মুমূর্ষু রোগীদের ঢাকায় পাঠানো হচ্ছে। ফলে রাজধানীর চিকিৎসাব্যবস্থার ওপর চাপ বাড়ছে।
ডেঙ্গু পরিস্থিতির প্রকৃত চিত্র ও সরকারের দেওয়া তথ্যের স্বচ্ছতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। কীটতত্ত্ববিদ ও স্বাস্থ্য গবেষকদের অভিযোগ, দেশে ডেঙ্গু আক্রান্তের প্রকৃত চিত্র আড়ালে থেকে যাচ্ছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের (ডিজিএইচএস) তথ্য অনুযায়ী, দেশের ৬১৯টি সরকারি হাসপাতালের মধ্যে মাত্র ৯৭টি নিয়মিত কেন্দ্রীয় ড্যাশবোর্ডে ডেঙ্গুর তথ্য পাঠাচ্ছে। বাকি ৫২২টি সরকারি হাসপাতাল, অর্থাৎ ৮৪ দশমিক ৩ শতাংশ, কোনো তথ্য দিচ্ছে না।
কীটতত্ত্ববিদ অধ্যাপক কবিরুল বাশার দেশবার্তাকে বলেন, ‘সরকারি ড্যাশবোর্ডে যে তথ্য দেখা যাচ্ছে, প্রকৃত আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা তার চেয়ে অনেক বেশি। ভেক্টর কন্ট্রোল বা মশা নিধনে বৈজ্ঞানিক পদক্ষেপের অভাব এবং সঠিক তথ্যের ঘাটতির কারণে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না।’
রোগীর চাপ সামাল দিতে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় সরকারি হাসপাতালগুলোতে ডেঙ্গুর এনএস-১ (NS1) পরীক্ষা সম্পূর্ণ বিনা মূল্যে করেছে। এ ছাড়া ঢাকার বিভিন্ন মোড়ে জরুরি ‘জ্বর ক্লিনিক’ স্থাপন করা হচ্ছে। দীর্ঘদিনের জনবলসংকট কাটাতে ৫ হাজার চিকিৎসক ও ২ হাজার ৫০০ নার্স নিয়োগের জরুরি প্রক্রিয়াও শুরু হয়েছে।
তবে মাঠপর্যায়ের চিকিৎসকদের মতে, চিকিৎসাসেবার সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি মশা নিয়ন্ত্রণেও বেশি গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন ছিল। তাঁদের মতে, প্রতিবছর ডেঙ্গুর মৌসুমে ক্র্যাশ প্রোগ্রাম চালানো হলেও বছরজুড়ে লার্ভা ধ্বংসের জন্য বিজ্ঞানভিত্তিক দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার ঘাটতি রয়েছে।
চিকিৎসকদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ডেঙ্গুতে মারা যাওয়া রোগীদের ৬০ শতাংশই উপসর্গ শুরুর তিন দিন পর হাসপাতালে আসছেন। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. মুশতাক হোসেন দেশবার্তাকে বলেন, ‘মৃত্যুর হার বৃদ্ধির অন্যতম প্রধান কারণ হলো রোগ নির্ণয়ে বিলম্ব এবং প্রত্যন্ত অঞ্চলে প্রাথমিক চিকিৎসার ত্রি-স্তর বিশিষ্ট ডেঙ্গু ব্যবস্থার অনুপস্থিতি। মানুষের জ্বর হলে অবহেলা না করে দ্রুত পরীক্ষা করা এবং প্লাটিলেট কমার আগেই চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া জরুরি।’
পরিস্থিতি বিবেচনায় গত শনিবার প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ঢাকার কুয়েত-বাংলাদেশ মৈত্রী সরকারি হাসপাতালসহ বিভিন্ন চিকিৎসাকেন্দ্র সরেজমিনে পরিদর্শন করেছেন। তিনি ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে সারা দেশে তিন মাসের বিশেষ পরিচ্ছন্নতা অভিযান জোরদার করার নির্দেশ দিয়েছেন। পাশাপাশি বাংলাদেশ ন্যাশনাল ক্যাডেট কোর (বিএনসিসি) সদস্যসহ দেশের তরুণদের মশা নিধন কার্যক্রমে সক্রিয় ভূমিকা রাখার আহ্বান জানিয়েছেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দেরিতে শুরু হওয়া তীব্র বর্ষার কারণে এডিস মশার প্রজননক্ষেত্র এখনো সক্রিয়। ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনসহ স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলো এখনই কার্যকর ও সমন্বিত পদক্ষেপ না নিলে ডিসেম্বরের আগে ডেঙ্গুতে মৃত্যু কমানো কঠিন হতে পারে।
দেশবার্তা/আরএইচ