ভ্রমনের প্রবল ইচ্ছা তাড়িত করে। তাই যখনই সুযোগ হয় বাড়ি ছেড়ে বের হয়ে পড়ি। ঘরে থাকতে পারি না । একাকিত্ব অস্থির করে তোলে। তাই অতৃপ্ত আত্না নিয়ে ছুটে বেড়াই। দুর্গাপূজার ছুটি, ১৩ই অক্টোবর হতে ১৮ই অক্টোবর ২০১০। এ সুযোগটা হাতছাড়া করলাম না। বেরিয়ে পড়লাম পশ্চিম অঞ্চলের পথে। যোগাযোগ হলো ইলা রানী বিশ্বাসের সঙ্গে। তিনি, আমি যে স্কুলে শিক্ষকতা করি, সে স্কুলের প্রিন্সিপাল। ইনি সপরিবারে বাড়ি যাচ্ছেন; ঝিনাইদহের এক অজ পাড়াগাঁয়ে নাম ‘চরবাখরবা'। উনাদের সঙ্গে সাথী হয়ে গেলাম । ভ্রমন শুরু হোল ১৩ তারিখে ভোর ৯টায়।
ঢাকা ছেড়ে যাত্রা শুরু। বাসে করে আশা ছিল, বেলা ৩টায় পৌছে যাব। কিন্তু পাটুরিয়া ফেরিঘাটে প্রায় ২ ঘন্টা বাস লাইনে অপেক্ষমান থাকতে হলো। রাজবাড়ী, ফরিদপুর, মাগুরায় পাশ দিয়ে বেড়াতে চলে এলাম ঝিনাইদহের শৈলকুপা থানা। ওখান থেকে টেম্পুতে কাতলাগাড়ী বাজার হয়ে চলা শুরু হলো। তখন রাত্রি নেমে গেছে। গ্রামের শান্ত, নিঝুম পরিবেশে অগ্রসর হচ্ছি। বাঁ-পাশে আঁকাবাঁকা হয়ে খাল চলে গেছে। গহীনতর আঁধারের বুক চিরে আমার চোখে ভেসে উঠল, দু'দিকের সবুজ গ্রামে।
কাতলাগাড়ী বাজারের স্বনামধন্য যাত্রার জাত শিল্পি ‘মাধাই চন্দ্ৰ বিশ্বাস'-এর সাথে দেখা। ইনি ইলা রানী বিশ্বাসের পিতা। উনাকে টেম্পুতে নেওয়া হলো। আমি আন্তরিকতার সাথে দু'হাত জড়িয়ে দু'জনে দুজনার কুশলাদি জিজ্ঞাসা করলাম। যত ‘চরবাখরবা' গ্রামের নিকটবর্তী হচ্ছি, ততই, ঢোলের বাদ্যের শব্দ পূজা মণ্ডপ থেকে ভেসে আসছে, ‘দ্রুমদ্রুম, দম, দ্রমাদম'। বাড়িতে পৌঁছে গেলাম । পূজায় সব আত্নীয়-স্বজন একত্রিত হয়েছে। বাড়ি ভর্তি মানুষের আনন্দ হুল্লোড়।
ইলা রানী বিশ্বাসের পিতা-মাতা, ভাইগণ, শ্যামল,বিজন, নারুগোপাল ও বিপুল আর আছে দু'ভাই-র স্ত্রী ও দুই চাচা। তিন শরিকের বিরাট বাড়ির উঠান, মাঝে কোল দেয়াল নেই।
আমি একজন ভিন্ন ধর্মের মানুষ মুসলমান। কিন্তু ওনাদের মধ্যে কোন দ্বিধাদ্বন্দ্ব নেই। সাদরে আমায় আপনজনদের মতো গ্রহণ করে নিল আমিও মন খুলে বসে গেলাম। রাত্রে আর পূজামণ্ডপে গেলাম না। বিদ্যুৎ নেই, চারিদিক অন্ধকার মোমবাতি,চার্জ লাইট দিয়ে আলোর ব্যবস্থা হোল। এর মধ্যে খেয়েদেয়ে শান্তির ঘুম দিলাম।
স্বাভাবিক নিয়মিতভাবে, ভোরে উঠে নামায পড়ে, হাঁটার পোষাক অর্থাৎ ছোট ট্রাউজার, গেঞ্জি, কেডস পরে হাতে ছড়ি নিয়ে মাথায় হ্যাট পরে মোবাইলে গান অন করে নদীর দিকে হাঁটা শুরু করলাম। গ্রামটা অতীব সুন্দর। একদিকে ক্যানেল, অপরদিকে গড়াই নদী দ্বারা সম্পুর্ণ গ্রামটি বেষ্টিত। যখন প্রাতঃভ্রমণে বের হলাম, তখনও সূর্য্য ওঠেনি । আলো -আঁধারের লুকোচুরি খেলা চলছে। পাখিগুলো কিচির-মিচির করে নীড় ছেড়ে উড়ে যাওয়ার প্রস্তুতি গ্রহণ করছে। গ্রামের অনেক লোক বের হয়ে নদীর ধারে জড়ো হচ্ছে। কোনো কোলাহল নেই, কোনো ধুলাবালি নেই।
মৃদুমন্দ বাতাস বইছে। আমি নদীর কিনারা দিয়ে প্রভাতের এমন সুন্দর পরিবেশে গান শুনতে শুনতে পশ্চিম দিকে দ্রুতগতিতে এগিয়ে চল্লাম। গ্রামবাসীর কাছে আমি রহস্যময় হয়ে উঠলাম। এবার ইনারা সরাসরি প্রশ্ন করলেন “আপনার ধর্ম”? আমি বল্লাম “ইসলাম”। এবার প্রশ্ন আপনি কি নামায পড়েন”? আমি মুচকি হেসে উত্তর দিলাম “নিয়মিত পাঁচ ওয়াক্ত নামায পড়ি” ।
এবার ভিড়ের ভিতর থেকে বয়স্ক দাড়িওয়ালা ভদ্রলোক প্রশ্নবাণ ছুড়ে দিলেন ' হিন্দু বাড়িতে নামায পড়তে আপনার অসুবিধা হয়না”? এবার আমি নছিহত দেওয়ার ভঙ্গিতে কিছুটা ব্যাখ্যা দিলাম এইভাবে নামায পড়ার জন্য কয়েকটি শর্ত পালন করতে হয়, যেমন:- প্রথমত পাঁকছাফ থাকতে হয়; দ্বিতীয়ত, পরিধেয় বস্ত্র পাঁকছাফ থাকতে হবে এবং তৃতীয়ত, যে জায়গায় নামায পড়া হবে সে জায়গাটি পাঁকছাফ থাকতে হবে। সমস্ত পৃথিবীই জায়নামায। অতএব, আমার নামায পড়ার কোনো অসুবিধা হচ্ছে না”?।
এবার প্রশ্নের পালা, “আপনার খাওয়া-দাওয়ার অসুবিধা হচ্ছে না”? ওনাদের বুঝিয়ে দিলাম যে কোন অসুবিধা হচ্ছে না। আমারও আপনারা যা খাচ্ছেন সেভাবেই স্বাভাবিক খাওয়া-দাওয়া হচ্ছে। সমস্ত প্রশ্নত্তোর শেষে, গ্রামবাসিদের আমার পরিচয় দিয়ে বললাম “গড়াই নদীর পাড় ঘেষে আপনাদের এই গ্রাম আমাকে মুগ্ধ করেছে। সুন্দর একটি গ্রাম। আপনাদের সাথে পরিচিত হয়ে খুশি হলাম। আপনারা ঢাকায় আসলে আমার বাড়িতে বেড়াতে আসবেন।
ওনারা জানালেন যারা এখানে উপস্থিত সকলেই এক শরিকের। সকলেই উৎসাহিত হয়ে আমায় নাস্তা খাওয়ার দাওয়াত করলো। আমি আমার অপারগতা জানিয়ে বল্লাম, “আমি দুঃখিত। কারণ, আমার খাওয়া-দাওয়ার সীমাবদ্ধতা আছে। সবকিছু খাইনা এবং সঠিক সময়ে খাওয়া-দাওয়া করতে হয়”। গ্রামবাসীরা ইলা রানী বিশ্বাসের পিতা মাধাই চন্দ্র বিশ্বাসের ভূয়সী প্রশংসা করলো। প্রাতঃভ্রমণ শেষে ফিরে এলাম ইলা রানী বিশ্বাসদের বাড়ীতে। পূজামন্ডপের কার্যক্রম শুরু। এবার পূজা উদ্যাপন দেখার পালা।
এর মধ্যে ইলা রানী বিশ্বাসের ছোট চাচা, তিনি খুব রসিক মানুষ। তিনি মাইকে প্রচার করে দিলেন যে, “সুদূর ইরান থেকে মেহমান এসেছেন পূজা দেখতে। তিনি কয়েকটি ভাষায় কথা বলতে পারেন”। আমাকে বলা হোল আমি যেন কোন অবস্থায় বাংলা না বলি। আমি পূজামন্ডপে গেলাম। আমি যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে অনেক ছেলেপিলে ভিড় করলো। ইলা বিশ্বাসের চাচা আমায় বাংলায় ও নানান অঙ্গভঙ্গির সাথে এটাওটা প্রশ্ন করতে লাগলেন। আমি ইংরেজি ও বাংলা মিলিয়ে উত্তর দিলাম।
এদিকে ঠাকুর আসলেন ও পূজাপর্ব শুরু হয়ে গেল। তিনি মন্ত্র পাঠ করেন আর মন্ত্র পড়া জল ছিটাতে লাগলেন। মাঝেমাঝে মহিলারা অঞ্জলি আর উলুধ্বনি আর শঙ্খ বাজাতে লাগলেন। এর প্রধান ভূমিকায় ছিলেন, ইলা রানী বিশ্বাস। ঢাকিরা তালেতালে ঢাক বাজাতে লাগলেন । এর মধ্যে নানান ধরণের ফল দিয়ে প্রসাদ তৈরি হোল । সন্ধ্যার পর শুরু হোল, হাতে ধুনুচি(আগুন ধারানোর মাটির পাত্র) নিয়ে গ্রামের জোয়ান- বুড়োদের শিবনৃত্য। একে বলে আরতি। প্রতিমার সম্মুখে নেচেনেচে আরতি প্রদান। আর ঢাকের বাদ্যের তালেতালে শিবনৃত্য। দূর্গামাতার সম্মুখভাগ ধূপের ধোঁয়ায় ছেয়ে গেল।
পূজা চলল সাতদিন । নিম্নোক্ত পূজার অনুষ্ঠানগুলো অবলোকন করলাম- ১ম দিন- ষষ্ঠী পূজা ২য় দিন- সপ্তমী পূজা ৩য় দিন- অষ্টমী পূজা ৩র্থ দিন- নবমী পূজা ৫ম দিন- বিজয়া দশমী পঞ্চম দিন বিসর্জনের পালা। আনন্দের যেমন চরম মুহূর্ত, তেমন বেদনাঘন মুহূর্ত। ঐ দিন আনন্দের বন্যা ও হুল্লোড় শুরু হয়ে গেল। পূজনীয় দুর্গামাতা যাকে ঘিরে এত পূজা-পর্ব তাকে বিদায় দিতে হবে। অতএব এসো বিয়োগ ব্যথার আগে আনন্দ উপভোগ করা হোক। শুরু হলো ক্যাদাখেড় আর সিঁদুর খেলা। পূজামণ্ডপ-এর সম্মুখে পানি ঢেলে পিছল করা হলো। এর মধ্যে রং মাখামাখি শুরু হলো।
ছোট-বুড়ো, পুরুষ, মহিলা সকলেই সকলকে রং মাখাতে লাগলো। আজ সকলের মনেই রং ধরেছে। রং মাখাতে মাখাতে হুড়োহুড়ি শুরু হলো আর পিছলে আছাড় খেতে লাগলো। ঢাকি প্রাণপণে ঢোল বাজিয়ে যাচ্ছে। বাজনার তালেতালে শুরু হলো সকলের একযোগে নৃত্য। একসময় সব থেমে এলো। যাকে ঘিরে এত অনুষ্ঠান, এত পূজা, এত আনন্দ তাকে “দুর্গা প্রতিমাকে” পূজামন্ডপ থেকে বের করা হলো। সকলে কাঁধে বহন করে পুকুরে ডুবাতে নিয়ে চলল ।
মহিলাগণ খালি পূজামণ্ডপে দাঁড়িয়ে এই বিদায় পর্ব করুণ নয়নে দেখতে লাগলো। কারো কারো চোখ বেয়ে জল গড়িয়ে পড়ছিল। হঠাৎ বৃষ্টি শুরু হলো। পুকুর পাড়ে যুবকরা ঢোলের তালেতালে শেষ নাচন নেচে এদেরই দুর্গা-মাকে বিসর্জন দিয়ে দিল । এই রাত্রে নারায়ণ পূজা হলো। ষষ্ঠ দিন ভোরে শুভচনী পূজা হলো। গ্রামে এই পূজা বিশেষভাবে “গাচ্ছি” নামে পরিচিত । আমরাও এই দিন সকালে, ইলা রানী বিশ্বাস ও তাঁর ছেলে চিন্ময় বিশ্বাস সকলের নিকট বিদায় নিয়ে ঢাকায় ফিরে এলাম। প্রথম সরাসরি পূজা দেখার সুযোগ হলো ও আনন্দের অংশীদার হলাম ৷ শুনলাম পাঁচদিন পর লক্ষ্মীপূজা হবে।
দেশবার্তা/জেএ