পটুয়াখালীর কলাপাড়া উপজেলার লতাচাপলী ইউনিয়নে অবস্থিত দেশের সর্বদক্ষিণের পর্যটন শিল্প হিসেবে পরিচিত ‘কুয়াকাটা’ সমুদ্রসৈকত। ভ্রমণপিপাসু মানুষের কাছে ‘কুয়াকাটা’ সমুদ্রসৈকতটি বেশ সমাদৃত। গত আগস্ট মাসের ২৬ থেকে ২৮ তারিখ পর্যন্ত মোট তিন দিন সেখানে অবস্থান করেছি।
সমুদ্রসৈকতটি ১৯৯৮ সালের মে মাসে আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশের একটি পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে পরিচিতি লাভ করে। তৎকালীন সরকার এই অঞ্চলটিকে একটি আধুনিক পর্যটন এলাকা হিসেবে গড়ে তোলার ঘোষণা দেয়। ২০০৫ সালে পর্যটকদের বিনোদন ও পরিবেশ সংরক্ষণের জন্য এখানে ইকোপার্ক নির্মাণ করা হয়। পরবর্তীতে ২০১০ সালে কুয়াকাটাকে পৌরসভা হিসেবে ঘোষণা করা হয় এবং একই বছর এখানকার কুয়াকাটা জাতীয় উদ্যানকে গেজেটভুক্ত করে সরকার।
কিন্তু যেখানে জটিলতা, মাত্র কয়েক বছরের ব্যবধানে সমুদ্রসৈকতের পাড় ভেঙেছে কমপক্ষে পাঁচ কিলোমিটারের মতো। সৈকতে নৌ-পুলিশের বক্সটিও কয়েক দিনের মধ্যে ভেঙে পড়বে। কেবল জিও ব্যাগ দিয়ে পাড়ভাঙা আটকানোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হলেও এটি করা উচিত ছিল শুরু থেকেই।
হারিয়ে গেছে বহুতল হোটেল। ভবিষ্যৎ শঙ্কায় রয়েছেন ইতোমধ্যে গড়ে ওঠা বহুতলবিশিষ্ট হোটেলগুলোর মালিক। যা উন্নয়ন হচ্ছে, তাও খুব ধীরগতিতে। কুয়াকাটা পৌর কর্তৃপক্ষ ও স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে কুয়াকাটা পর্যটন শিল্প এলাকা দিন দিন উন্নত ও উন্নয়নের জন্য কতটা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে কিংবা কী পরিকল্পনা রয়েছে, তা চোখে পড়ার মতো নয়।
দর্শনীয় স্থান, মৎস্য আহরণ ও শুঁটকি উৎপাদনে কুয়াকাটা অন্যতম। রাষ্ট্রের পক্ষে লোকাল পর্যায়ে যারা প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করেন, তাঁদের তীক্ষ্ণ ও টেকসই পরিকল্পনা নিয়ে সরকারের নির্দিষ্ট ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে অবহিত করে দ্রুত সময়ের মধ্যে সমুদ্রসৈকত ও এলাকার উন্নয়নে সরকারের তরফ থেকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা এখনই আবশ্যক।
না হলে মুখ থুবড়ে পড়বে ‘কুয়াকাটা’। দিশেহারা হয়ে পড়বেন মৎস্য আহরণ ও শুঁটকি উৎপাদনকারী ব্যবসায়ীরা। অচল হবে গড়ে ওঠা হোটেলগুলো। সৌন্দর্য হারাতে পারে ‘কুয়াকাটা’। এতে ক্ষতির সম্মুখীন হবে সরকারের রাজস্ব ও পর্যটন শিল্প।
কুয়াকাটা সৈকতকে ঘিরে যা গড়ে উঠেছে, এর মধ্যে কুয়াকাটার খুব নিকটবর্তী এলাকায় রয়েছে দর্শনীয় স্থানগুলোর মধ্যে লেবুর চর, গঙ্গামতির চর ও জঙ্গল, ফাতরার চর, মিশ্রীপাড়া, সীমা বৌদ্ধ মন্দির, ঝাউবন ইত্যাদি।
লেবুর চর:
সৌন্দর্যের অপার লীলায় গড়ে ওঠা লেবুর চরটি কুয়াকাটা জিরো পয়েন্ট থেকে পশ্চিম দিকে অবস্থিত। সাগরের কোল ঘেঁষে ভ্যানযোগে যেতে হয় সেখানে। কয়েকটি শুঁটকি ও হরেক রকমের আচার, চকলেটের দোকান গড়ে উঠেছে। চরটিতে প্রবেশ করলেই দেখা যায় লাল কাঁকড়ার দলছুট ছুটে চলা ও মানুষের টের পেলেই বালুর ছোট ছোট গর্তে প্রবেশ করার দৃশ্য।
রয়েছে ঘন জঙ্গল, যার মধ্যে স্থানীয়দের উদ্যোগে বন বিভাগ থেকে লিজ নেওয়া কিছু অংশে দোলনার ব্যবস্থা করা হয়েছে। এ নিয়েই গড়ে ওঠা লেবুর চর। যদিও চরটিতে একসময় লেবুর বাগান ছিল। এখন তা নেই।
গঙ্গামতির চর ও জঙ্গল:
পুরো কুয়াকাটা জুড়ে বালুর চরের বুকে হেঁটে বেড়ানোই মূলত কুয়াকাটা ভ্রমণের ভালো লাগার জায়গা তৈরি করে। শন শন শব্দে মুখরিত সমুদ্রের পাড়। তবুও সূর্যোদয় দেখার জন্য এবং বনভোজনের জন্য গঙ্গামতির চর একটি চমৎকার স্থান। এর পাশেই রয়েছে গঙ্গামতির জঙ্গল।
ফাতরার চর:
ফাতরার চর সুন্দরবনের একটি অংশ। এটি ম্যানগ্রোভ বা লবণাক্ত বনাঞ্চল। যেখানে নৌকা করে ঘুরতে যেতে হয়। ভ্রমণপিপাসু মানুষের ‘কুয়াকাটা’ ভ্রমণের পরিকল্পনার খাতায় ফাতরার চরটাও স্থান পায়।
ঐতিহাসিক ও ধর্মীয় স্থান—কুয়াকাটার প্রাচীন কূপ (কুয়া):
রাখাইন সম্প্রদায়ের খনন করা ঐতিহাসিক কূপ, যার নামানুসারে এই এলাকার নাম ‘কুয়াকাটা’ হয়েছে। এটি কুয়াকাটা মূল শহরের পূর্ব পাশে নিকটবর্তী রাখাইন মহিলা মার্কেট সংলগ্ন।
শ্রীমঙ্গল বৌদ্ধ বিহার (মিশ্রীপাড়া বৌদ্ধ মন্দির):
এখানে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম বড় বৌদ্ধ মূর্তি রয়েছে। ‘কুয়াকাটা’ সমুদ্রসৈকত থেকে পূর্ব দিকে ৮.২ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। সেখানে পরিবারসহ যাওয়ার বাহন ভ্যান গাড়ি। সরু রাস্তা ধরে যেতে যেতে খারাপ মনটাও ভালো হয়ে যায়। গ্রামের গন্ধ শুঁকে শুঁকে মিশ্রীপাড়া পৌঁছানোর পরে দেখা মিলবে বৌদ্ধ মন্দির ও গোছানো একটি বাজার। পাওয়া যাবে তাঁতে তৈরি বিভিন্ন কাপড়। গ্রাম্য ও ঘরোয়া পরিবেশ থেকে কম নয় এই জায়গাটি।
সীমা বৌদ্ধ মন্দির:
‘কুয়াকাটা’ সৈকত এলাকায় অবস্থিত শতবর্ষী প্রাচীন একটি বৌদ্ধ মন্দির। যেখানে গৌতম বুদ্ধের প্রাচীন মূর্তি আছে। প্রায় ৩৭ মণ ওজনের ধ্যানমগ্ন বুদ্ধ মূর্তি। ধারণা করা হয়, এটি ভারতীয় উপমহাদেশের অন্যতম বৃহৎ বুদ্ধ মূর্তি। এটি অষ্টধাতুর তৈরি।
প্রকৃতি ও উদ্যান—ঝাউবন:
সৈকতের পূর্ব ও পশ্চিম পাশে বিস্তৃত ঝাউবনের সারি প্রাকৃতিক সৌন্দর্য বাড়িয়ে দিয়েছে। তবে এখন বিলীনের পথে। বন্যপ্রাণী ও নানা রকম গাছপালা দেখতে এবং সময় কাটাতে পর্যটকরা এখানে যান। তবে আগের মতো সেই আনন্দটা হারিয়ে গেছে অগোছালো পরিকল্পনায়।
অপার সম্ভাবনাময় ও সৌন্দর্য বহন করা দীর্ঘ ১৮ কিলোমিটার ‘কুয়াকাটা’ সমুদ্রসৈকতে বর্তমানে তীব্র ভাঙন ও সুপেয় পানির সংকট বৃহৎ সমস্যাগুলোর একটি। সৈকতের পাড়ে জিও ব্যাগ দিয়ে সাময়িক রক্ষা করার চেষ্টা হলেও স্থায়ী সমাধান হচ্ছে না।
বিভিন্ন তথ্যভান্ডার ঘেঁটে জানা গেছে, ‘পায়রা-কুয়াকাটা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ’ নামে একটি বিশেষ সংস্থা গঠনের সিদ্ধান্ত ও প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। কুয়াকাটা সমুদ্রসৈকত ও পায়রা বন্দরসংলগ্ন এলাকায় পরিকল্পিত নগরায়ণ, পর্যটন শিল্পের বিকাশ এবং পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষার উদ্দেশ্যে সরকার এই কর্তৃপক্ষ গঠনের উদ্যোগ নিয়েছে। কুয়াকাটা অঞ্চলকে সুপরিকল্পিতভাবে গড়ে তুলতে ২০২৩ সালের ৯ অক্টোবর মন্ত্রিসভা ‘পায়রা-কুয়াকাটা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ আইন, ২০২৩’-এর খসড়ার নীতিগত অনুমোদন দেয়।
এটি মূলত কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের মতো কুয়াকাটা এলাকার অপরিকল্পিত ভবন নির্মাণ রোধ, পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এবং মাস্টার প্ল্যান অনুযায়ী টেকসই উন্নয়ন প্রকল্প তদারকি করবে। বর্তমানে এই অঞ্চলের সামগ্রিক ইকো-ট্যুরিজম ও অবকাঠামো উন্নয়নের জন্য সরকারের গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের অধীনে একটি বৃহৎ মহাপরিকল্পনা (Payra–Kuakata Comprehensive Plan) বাস্তবায়নের কাজ চলছে।
পর্যটন এলাকায় সুপেয় পানি সরবরাহ, ড্রেনেজ ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনার উন্নয়নে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের মাধ্যমে ৪৮ কোটি টাকার একটি প্রকল্প বাস্তবায়নাধীন রয়েছে। সৈকত রক্ষায় এবং ১১.২ কিলোমিটার এলাকা সুরক্ষায় প্রায় ৭৫৯ কোটি টাকার একটি বড় প্রকল্প অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। কুয়াকাটা ও আশপাশের এলাকার পরিবেশ ও পর্যটন সুরক্ষায় ‘পায়রা-কুয়াকাটা ইকো-ট্যুরিজম মহাপরিকল্পনা’ গ্রহণ করা হয়েছে।
তবে এত পরিকল্পনা কেবল কল্পনায় না রেখে প্রয়োজন সরকারের তরফ থেকে নেওয়া উদ্যোগগুলোকে অতি দ্রুত সময়ের মধ্যে বাস্তবায়ন করা ও বাস্তবে রূপ দেওয়া। অতি দ্রুত সময়ের মধ্যে পর্যটন শিল্প ‘কুয়াকাটা’ সমুদ্রসৈকত রক্ষায় পরিকল্পিত ও টেকসই ব্যবস্থা গ্রহণ না করলে হারিয়ে যেতে পারে ‘কুয়াকাটা’ সমুদ্রসৈকত।
প্রতিনিধি/আরএইচ