রাজধানীর ভাটারা থানার পুলিশ হাউজিং-১ এলাকার একটি বাড়িতে ডিজে পার্টির আড়ালে মাদককেন্দ্রিক অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড চলার অভিযোগ উঠেছে। বাড়িটির মালিক পুলিশ সদর দপ্তরের অতিরিক্ত ডিআইজি আব্দুল্লাহ আল জহির। ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) অভিযানে মদ, ইয়াবা, কুশসহ বিভিন্ন ধরনের মাদকদ্রব্য উদ্ধার করা হয়েছে। এ ঘটনায় ৮৪ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে জানিয়েছে ডিবি।
রাত গভীর হলে বাড়িটির সামনে দামি গাড়ির সারি দেখা যেত। সেখানে তরুণ-তরুণীদের উপস্থিতিতে ডিজে পার্টির আয়োজন করা হতো। বাইরে থেকে দেখে বাড়িটিতে কী চলছিল, তা বোঝা সহজ ছিল না। বাড়িটি নিয়ে সন্দেহ তৈরি হলে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ তদন্ত শুরু করে। পরে ডিএমপির উত্তরা বিভাগের গোয়েন্দা পুলিশ সেখানে অভিযান চালায়।
বাড়িটিতে কীভাবে এসব অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হতো, সে বিষয়ে তথ্য জানিয়েছেন ডিএমপির উত্তরা বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) ইলিয়াস কবির।
তিনি গণমাধ্যমকে জানান, অনলাইন প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে এসব ডিজে পার্টির আয়োজন করা হতো। এ জন্য এয়ারবিএনবি ও ট্রাভেলা নামের প্ল্যাটফর্ম ব্যবহারের তথ্য পেয়েছেন তাঁরা। অনলাইনে নিবন্ধনের মাধ্যমে অংশগ্রহণকারীরা এসব অনুষ্ঠানে যুক্ত হতেন। বাড়িটির কো-হোস্ট মাহবুবুল আলমের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সাল থেকে সেখানে এ ধরনের আয়োজন চলছিল। মাসে প্রায় ২০ থেকে ২২টি অনুষ্ঠান হতো বলে তাঁকে জানানো হয়েছে।
ডিসি ইলিয়াস কবির জানান, বাড়ি ভাড়া বাবদ ১০ জনের কাছ থেকে ১৮ হাজার ৫০০ টাকা করে নেওয়ার হিসাব পাওয়া গেছে। এ ছাড়া অনুষ্ঠানে অংশ নিতে নিবন্ধনকারীদের কাছ থেকে জনপ্রতি ৬০০ টাকা নেওয়া হতো। তাঁর দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, একটি অনুষ্ঠানে প্রায় ১০০ জন অংশ নিলে শুধু নিবন্ধন ফি থেকেই উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অর্থ আসতে পারে।
ইলিয়াস কবির বলেন, “বাড়ির মালিক বা সংশ্লিষ্ট অন্য ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে পরবর্তী আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা দেখবেন।”
রাতের ডিজে পার্টিতে অংশ নেওয়ার আমন্ত্রণ জানিয়ে পাঠানো একটি বার্তা গণমাধ্যমের হাতে এসেছে। যার বাংলা অনুবাদে বলা হয়েছে, “হ্যালো! আগামী সোমবার, ১৯ অক্টোবর, আমরা একটি হাউস পার্টি ও রেভ পার্টির আয়োজন করছি। এটি ব্যক্তিগত ও শুধু আমন্ত্রিত অতিথিদের জন্য। তাই অংশ নিতে আগাম নিবন্ধন বাধ্যতামূলক। রাত ৯টা থেকে পরদিন সকাল ৯টা পর্যন্ত গানবাজনা চলবে। প্রস্তুত হয়ে আসুন পুরো রাত গান, নাচ আর আনন্দে কাটানোর জন্য! পার্টিটি হবে তিনতলা একটি বাড়িতে। বাড়িটির মালিক একজন পুলিশ ডিআইজি। তাই যেকোনো ধরনের অভিযানের আশঙ্কা নেই। আমাদের নিরাপত্তার জন্য পুলিশ সদস্যরাও সেখানে থাকবেন। উন্মাতাল এক রাতের আনন্দে যোগ দিন। চাইলে বন্ধুদের সঙ্গেও এই আমন্ত্রণ শেয়ার করতে পারেন। আসন সীমিত, তাই আগেই নিবন্ধন নিশ্চিত করুন।”
অভিযানে অংশ নেওয়া এক গোয়েন্দা কর্মকর্তা জানান, “এখানে অনেক বছর ধরে চলছিল অপকর্ম। ডিজে পার্টি, মাদক ব্যবসা-সেবন, অশ্লীল কর্মকাণ্ড সবই চলত এই বাড়িতে।”
এদিকে বুধবার (২১ অক্টোবর) দুপুরে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার মো. শফিকুল ইসলাম জানান, “আমরা মাদকসহ অবৈধ কর্মকাণ্ডের তথ্য পেয়ে অভিযান চালিয়ে সেখান থেকে ৮৪ জনকে গ্রেপ্তার করি।”
উল্লেখ্য, আব্দুল্লাহ আল জহির বিসিএস পুলিশ ২৪তম ব্যাচের কর্মকর্তা। তাঁর বাড়ি সাতক্ষীরা জেলায়। চাকরিজীবনে তিনি বিভিন্ন ইউনিটে কর্মরত ছিলেন। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে তিনি একাধিকবার পুলিশ পদক পেয়েছেন। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর বাহারুল আলম আইজিপি থাকাকালে তাঁকে পুলিশ সদর দপ্তরে আনা হয় বলে জানা গেছে।
জহিরের বিরুদ্ধে পুলিশের একাধিক অতিরিক্ত আইজিপি ও ডিআইজির ঘনিষ্ঠ এবং আশীর্বাদপুষ্ট কর্মকর্তা হওয়ার অভিযোগ রয়েছে। তাঁদের সঙ্গে থেকে পুলিশের ভেতরে একটি চক্রের বিভিন্ন বিষয় তিনি পরিচালনা করেন বলেও অভিযোগ উঠেছে।
পুলিশ সদর দপ্তরসহ বিভিন্ন ইউনিটে কর্মরত অন্তত চারজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলেছে আলাপ। তাঁদের ভাষ্য, ডিবির অভিযানের পরই এসব তথ্য সামনে এসেছে। তবে মাদক উদ্ধারের ঘটনায় শুধু মোবাইল কোর্ট পরিচালনা না করে মামলা করা উচিত ছিল বলে মনে করেন তাঁরা।
কয়েকজন কর্মকর্তা ধারণা করছেন, অদৃশ্য ক্ষমতার প্রভাবে জহিরকে রক্ষার ব্যবস্থা করা হয়েছে। পুলিশ হাউজিংয়ের ভেতরে এ ধরনের ঘটনা পুরো পুলিশ বিভাগকে বিব্রত করছে বলেও ক্ষোভ প্রকাশ করেন তাঁরা।
অপর এক কর্মকর্তা জানান, জহির এই পুলিশ হাউজিংয়ের দপ্তর সম্পাদক ছিলেন। ঝিলমিল হাউজিং নামের আরেকটি প্রকল্পের তিনি সাধারণ সম্পাদক। ওই কর্মকর্তার অভিযোগ, একটি চক্রের মাধ্যমে বর্তমানে যোগ্য ব্যক্তিদের বাদ দিয়ে পুলিশের পদায়ন ও পদোন্নতি নিজেদের ইচ্ছামতো করা হচ্ছে। এ নিয়েও পুলিশের মধ্যে ক্ষোভ রয়েছে।
ওই কর্মকর্তা আরও অভিযোগ করেন, এসব কর্মকাণ্ড থেকে অতিরিক্ত ডিআইজি জহির প্রচুর অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছেন। তাঁর কার্যক্রম সম্পর্কে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের বারবার অবহিত করা হলেও অদৃশ্য শক্তির প্রভাবে তিনি এত দিন বহাল তবিয়তে ছিলেন। তদন্ত হলে তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের বিস্তারিত তথ্য সামনে আসতে পারে বলেও দাবি করেন তিনি।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে অতিরিক্ত ডিআইজি আব্দুল্লাহ আল জহিরের যোগাযোগ করা হলে তিনি প্রতিবেদককে হোয়াটসঅ্যাপে একটি লিখিত বক্তব্য পাঠান। বক্তব্যটি হুবহু তুলে ধরা হলো:
“আমার বাসা সরাসরি মনিটর করা বা সরেজমিনে সুপারভাইজ করা পুলিশ বাহিনীতে দায়িত্ব পালন করে বাস্তবে সম্ভব হয় না। এজন্য বাসা ভাড়া থেকে অংশীদারিত্ব দিয়ে ম্যানেজার/কো-হোস্ট নিয়োগ করা হয়েছে। সঠিক তথ্য উপস্থাপন করে সন্দেহ থাকলে জন্মদিনের জন্য দেওয়া বুকিং বাতিল সে করতে পারতো। আইন/নিয়ম ভঙ্গের বিষয়ে প্রাথমিক ও চূড়ান্ত দায় অংশগ্রহণকারীদের। এরপর যেকোনো গাফিলতি থাকলে সেটার দায় ম্যানেজার/কো-হোস্টের।”
এর আগে তিনি জানান, “অনলাইন প্ল্যাটফর্ম এয়ারবিএনবির মাধ্যমে বাড়ি ভাড়া দেওয়া হয়েছিল। এসব অবৈধ কাজের সঙ্গে আমি যুক্ত না।”
সহকর্মীদের আনা অভিযোগ সম্পর্কে মন্তব্য করতে রাজি না হলেও জহির বলেন, তাঁর সার্ভিস রেকর্ড সম্পর্কে খোঁজ নিয়ে দেখতে পারেন। তাঁর নামে থাকা গোয়েন্দা প্রতিবেদনগুলো থেকেই তাঁর সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যাবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
বাড়িটির মালিক হিসেবে জহিরের নাম প্রকাশ্যে আসার পর পুলিশ সদর দপ্তরও বিষয়টি নিয়ে পদক্ষেপ নেয়। একটি সূত্রের দাবি, প্রথমে তাঁর বক্তব্য জানতে চাওয়া হয়। পরে পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) আলী হোসেন ফকিরের স্বাক্ষরিত অফিস আদেশে তাঁকে ক্লোজ করার নির্দেশ দেওয়া হয়।
বুধবার পুলিশ সদর দপ্তরের মিডিয়া শাখার এআইজি কামারুম মুনিরা গণমাধ্যমকে বলেন, তাৎক্ষণিকভাবে অফিস আদেশের মাধ্যমে ওই অতিরিক্ত ডিআইজিকে সংযুক্ত করা হয়েছে। তিনি জানান, ডিবি বিষয়টি তদন্ত করছে। তদন্তে জহিরের সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেলে কর্তৃপক্ষ তাঁর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারে। সূত্র: আলাপ
দেশবার্তা/আরএইচ