নিখোঁজ শিশু সন্তানদের জন্য অপেক্ষা করতে করতে কেউ করেছেন ব্রেন স্ট্রোক, কাঁদতে কাঁদতে কেউ হারিয়েছেন চোখের দৃষ্টি, আবার কেউবা পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করে চলে গেছেন পরপারে। তবুও তাদের অপেক্ষার প্রহর শেষ হয়নি। এখনো আদরের সন্তানের অপেক্ষায় দিন কাটাচ্ছেন স্বজনরা। এসব নিখোঁজ শিশুকে খুঁজে বের করতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর আলাদা একটি সেল গঠন ও প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপের আহ্বান জানিয়েছেন ভুক্তভোগীরা।
রোববার ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির শফিকুল কবির মিলনায়তনে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলেন ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্যরা। জিরো মিসিং চিলড্রেন ফাউন্ডেশনের সহযোগিতায় সংবাদ সম্মেলনটির আয়োজন করে ‘মুন পরিবার’। এতে লিখিত বক্তব্য উপস্থাপন করেন জিরো মিসিং চিলড্রেন ফাউন্ডেশনের সভাপতি মো. সাদাত রহমান।
এছাড়া বক্তব্য দেন ফাউন্ডেশনের মিডিয়া অ্যান্ড কমিউনিকেশন অফিসার মারুফ হায়াত, নিখোঁজ শিশু তানজিলার ভাই শাকিল হোসেন, আবদুল্লাহ ওরফে তামিমের বাবা নজরুল ইসলাম, জুনায়েদ হাসান সকালের বাবা মো. ইসমাইল হোসেন, কাওসারের মা রত্না বেগম, সিফাতের মা স্বপ্না আক্তার, শিশু আজমাইনের বড় ভাই আজম, মানতাশা খাতুনের বাবা মনিরুজ্জামান মনির, আরাফাত হোসেন রিয়াদের বাবা আনোয়ার হোসেনসহ ৪০টি ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্য।
কান্নাজড়িত কণ্ঠে নিখোঁজ শিশু তানজিলার ভাই শাকিল হোসেন বলেন, ২০২৬ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি এক বাবা যখন প্রধানমন্ত্রীর কাছে গিয়ে বলেন যে আমার বাচ্চা অপহরণ হয়েছে, তখন খোদ প্রধানমন্ত্রী নিজেই ডিসিকে কল দিয়ে সেই বাচ্চাকে উদ্ধারের নির্দেশ দেন এবং পুলিশের তৎপরতায় এক ঘণ্টার মধ্যে বাচ্চাটি উদ্ধার হয়। আজকে আমার বাবা, আমার মা এবং এই পরিবারের সবার বাবা-মা কি প্রধানমন্ত্রীর কাছে পৌঁছাতে পারবে? এদের বাচ্চাদের খোঁজার জন্য কি প্রধানমন্ত্রী তৎপরতা দেখাবেন? তাহলে এই পরিবারগুলো কোথায় যাবে, কার কাছে আকুতি জানাবে? পুলিশের কাছে? এর দায়ভার কে নেবে?
তিনি আরও বলেন, আমার পরিবারের সবাই দেশের বাইরে থেকে রেমিটেন্স পাঠাচ্ছে। তাহলে আমাদের বোনের নিরাপত্তা কেন সরকার দিতে পারবে না? অনেক প্রবাসীর ভাই-বোন ও সন্তান নিখোঁজ রয়েছে। আমরা প্রধানমন্ত্রীর কাছে পৌঁছাতে পারছি না, তাই আমাদের কথাও তার কাছে পৌঁছায় না। আমাদের অনুরোধ, এই নিখোঁজ পরিবারগুলোর সাথে যেন তারা বসেন, তাদের কষ্টের কথাগুলো শোনেন এবং এই বাচ্চাদের খোঁজার জন্য একটি স্পেশাল ইউনিট গঠন করে দেন।
নিখোঁজ আবদুল্লাহ ওরফে তামিমের বাবা নজরুল ইসলাম বলেন, আমার ছেলের জন্য কাঁদতে কাঁদতে আমি ব্রেইন স্ট্রোক করে পঙ্গুত্ববরণ করেছি, আমার এক পাশ প্যারালাইসিস। আমার শ্বশুরও নাতির শোকে ব্রেন স্ট্রোক করে মারা গেছেন। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে আমার আকুল আবেদন—আমাদের সন্তানদের যেন ফিরিয়ে দেওয়া হয় এবং যত শিশু পাচারকারী রয়েছে, তাদের একটি তালিকা করে আইনের আওতায় আনা হয়, যাতে আর কোনো শিশু নিখোঁজ বা পাচার না হয়।
নিখোঁজ কাউসারের মা রত্না বেগম বলেন, গত মাসের ৩ তারিখে মহাখালী বস্তি থেকে আমার ছেলে হারিয়ে গেছে। বাসা-বাড়ির কাজ করে খাই। ছেলেকে খুঁজতে খুঁজতে দুশ্চিন্তায় প্যারালাইসিস হয়ে আমার একটা হাতও চলে গেছে, কিন্তু ছেলেকে আজও পাইনি।
নিখোঁজ রিফাতের মা স্বপ্ন বেগম বলেন, আমার ছেলে পল্লবীর বাইগারটেক থেকে নিখোঁজ হয়েছে। এখনো ছেলের অপেক্ষায় আছি। বাংলাদেশ সরকার, পুলিশ প্রশাসন এবং দেশ-বিদেশের প্রবাসী ভাই-বোনদের কাছে এই বিপদের দিনে সহযোগিতা কামনা করছি।
সংবাদ সম্মেলনে মারুফ হায়াত জানান, শিশুরা মূলত বিভিন্ন কারণে হারিয়ে বা পালিয়ে যায়। একটু বড় শিশুরা অনেক সময় স্বাধীনভাবে চলার আশায় বা পরিবারের বকাঝকার কারণে ঘর ছাড়ে। কিন্তু এদের মধ্যে ১০ থেকে ১৫ শতাংশ শিশু পাচারকারী চক্রের হাতে পড়ে যায়। জাতিসংঘের গ্লোবাল রিপোর্ট অনুযায়ী, মোট মানবপাচারের অন্তত ৩৮ শতাংশই শিশু। বাংলাদেশের বর্ডার ভারতের সাথে যুক্ত থাকায় পাচার হওয়া শিশুদের একটি বড় অংশ প্রথমে ভারতে এবং পরবর্তীতে মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন দেশে চলে যায়। নিখোঁজ শিশুদের উদ্ধারে তারা পরিবারগুলোকে মানসিক সাপোর্টসহ বিভিন্নভাবে সহায়তা করে যাচ্ছেন বলে জানান তিনি।
সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে জানানো হয়, বাংলাদেশে শিশু নিখোঁজ ও পাচারের ঘটনা বহু বছর ধরে ঘটে আসছে।
পুলিশ হেডকোয়ার্টার্সের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে ১৭ হাজার ৮০৮টি, ২০২৪ সালে ১৬ হাজার ৪১৪টি, ২০২৫ সালে ২২ হাজার ৫৫১টি এবং ২০২৬ জানুয়ারি-জুলাই পর্যন্ত ১৫ হাজার ৭১৭টি নিখোঁজ জিডি করা হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে ২ হাজার ৩৮ শিশু এখনো নিখোঁজ রয়েছে। অথচ বহু বছর ধরে ঘটে চলা শিশু নিখোঁজ ও পাচারের অনেক ঘটনাই এখনো অমীমাংসিত রয়ে গেছে। এ সময় নিখোঁজ শিশুদের দ্রুত সন্ধান ও নিরাপদ প্রত্যাবর্তন নিশ্চিত করা, অমীমাংসিত মামলাগুলোর পুনঃতদন্ত, শিশু পাচার প্রতিরোধে কার্যকর রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা গ্রহণ এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর জন্য প্রয়োজনীয় সহায়তা ও বিশেষ যৌথ অভিযান পরিচালনার জোরালো দাবি জানানো হয়।
দেশবার্তা/আইএইচই/একে