চট্টগ্রামে বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটি (বিআরটিএ) কার্যালয়ে ঘুষ বাণিজ্যের অভিযোগ ক্রমেই জোরালো হচ্ছে। যানবাহনের রেজিস্ট্রেশন, রুট পারমিট, ফিটনেস সনদ, ট্যাক্স টোকেন, ডিজিটাল নম্বরপ্লেট ও ড্রাইভিং লাইসেন্সসহ প্রায় প্রতিটি সেবা পেতে অতিরিক্ত অর্থ গুনতে হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
অভিযোগ রয়েছে, সরকারি নির্ধারিত ফি জমা দেওয়ার পরও বিভিন্ন কাজ দ্রুত সম্পন্ন করতে সেবাগ্রহীতাদের কাছ থেকে বাড়তি টাকা দাবি করা হয়।
সেবাগ্রহীতাদের অভিযোগ, দালালের মাধ্যমে কাজ করালে নির্ধারিত সময়ের আগেই ফাইলের অগ্রগতি হয়। তবে সরাসরি সেবা নিতে গেলে নানা ধরনের হয়রানি ও দীর্ঘসূত্রতার মুখে পড়তে হয়। ফলে সময় বাঁচাতে এবং হয়রানি এড়াতে অনেকেই বাধ্য হয়ে দালালের শরণাপন্ন হচ্ছেন।
এতে একদিকে সাধারণ মানুষকে সরকারি সেবার নির্ধারিত ফির বাইরে অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে, অন্যদিকে বিআরটিএর সেবা ব্যবস্থাপনা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে।
নানা অনিয়ম ও ঘুষ বাণিজ্যের অভিযোগে আবারও আলোচনায় এসেছে চট্টগ্রামের বিআরটিএ হালিশহর কার্যালয়ের (মেট্রো সার্কেল-১) উপপরিচালক (প্রকৌশল) তৌহিদুল হোসেন। তার বিরুদ্ধে অনৈতিক সুবিধার মাধ্যমে অবৈধভাবে স্লিপার কোচের রেজিস্ট্রেশন প্রদান, আমদানি ফাইল ছাড়া কাটা গাড়ির নিবন্ধন, মালিকানা পরিবর্তন, ফিটনেস ইস্যুসহ বিভিন্ন কাজে চিহ্নিত দালালের মাধ্যমে ঘুষ গ্রহণ, সেবাপ্রার্থীদের হয়রানি এবং আদায় করা ঘুষের অর্থ পলাতক আওয়ামী লীগ নেতাদের লালন-পালন ও সরকারবিরোধী কাজে ব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে।
এসব বিষয়ে সম্প্রতি সড়ক পরিবহন মন্ত্রী, দুদক চেয়ারম্যান ও বিআরটিএ চেয়ারম্যানসহ একাধিক দপ্তরে লিখিত অভিযোগ করেছেন বাংলাদেশ সিএনজি অটোরিকশা হালকাযান পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশন (রেজি. নং-বি-২১৮১) চট্টগ্রাম মহানগর শাখার সাধারণ সম্পাদক মো. জহির উদ্দিন।
অভিযোগে বলা হয়েছে, বিআরটিএ চট্টগ্রামের হালিশহর কার্যালয়ের উপপরিচালক (প্রকৌশল) তৌহিদুল হোসেন ২০১৬ সাল থেকে চট্টগ্রাম বিভাগীয় কার্যালয়ে সহকারী পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পদোন্নতি পেয়ে উপপরিচালক হলেও দীর্ঘ সময় একই দায়িত্বে বহাল ছিলেন। বর্তমানে তিনি হালিশহর বিআরটিএ কার্যালয়ের উপপরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। দীর্ঘ সময় গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থাকায় সিএনজি স্ক্র্যাপিং, নম্বর প্রতিস্থাপন, যানবাহন নিবন্ধন, মালিকানা পরিবর্তন, আমদানি-সংক্রান্ত ফাইল এবং বিভিন্ন অনুমোদন কার্যক্রমে তার ভূমিকা ও সিদ্ধান্ত গুরুত্বপূর্ণ। এসব কার্যক্রমে ঘুষ গ্রহণ, অনিয়ম, দালালনির্ভরতা, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং আর্থিক লেনদেনের গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগগুলোর প্রকৃত সত্যতা নথিপত্র, সরকারি রেকর্ড, আর্থিক তথ্য ও অন্যান্য আইনানুগভাবে সংগ্রহযোগ্য প্রমাণের মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন।
অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, ২০১৮ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত চট্টগ্রামে পুরাতন ফোর-স্ট্রোক অটোরিকশা প্রতিস্থাপন কার্যক্রমে প্রতিটি সিএনজি স্ক্র্যাপিংয়ে ৫০ হাজার থেকে ১ লাখ এবং নিবন্ধনে ২০ থেকে ৫০ হাজার টাকা ঘুষ নেওয়া হয়েছে। এ কারণে ওই সময়ে প্রতিস্থাপিত প্রতিটি গাড়ির পূর্ণাঙ্গ তালিকা, স্ক্র্যাপিং রেকর্ড, স্ক্র্যাপিংয়ের প্রমাণ, নতুন নিবন্ধনের নথি এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের অনুমোদন যাচাইয়ের দাবি জানানো হয়েছে।
অভিযোগে বলা হয়েছে, আওয়ামী লীগের ঘনিষ্ঠ হওয়ায় কখনোই তার অনিয়মের তদন্ত হয়নি। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর অনিয়মের অভিযোগে একপর্যায়ে তাকে হালিশহর বিআরটিএ কার্যালয় থেকে ময়মনসিংহে বদলি করা হলেও রহস্যজনক কারণে কিছুদিনের মধ্যেই তিনি পূর্বের কর্মস্থলে ফিরে আসেন। যোগদানের পর আবারও আগের মতো বিআরটিএ কার্যালয়কে ঘুষের স্বর্গরাজ্যে পরিণত করেছেন বলেও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, সম্প্রতি প্রচলিত নিয়ম না মেনে মোটা অঙ্কের ঘুষের বিনিময়ে প্রকৃত মালিকের অনুপস্থিতিতে গাড়ির মালিকানা পরিবর্তন করা হয়েছে। এক্ষেত্রে গাড়িপ্রতি ৫০ থেকে ৬০ হাজার টাকা পর্যন্ত ঘুষ নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। গত এক বছরে সম্পন্ন হওয়া মালিকানা পরিবর্তনের ফাইল পরীক্ষা করে ক্রেতা-বিক্রেতার ছবি, বায়োমেট্রিক তথ্য, আবেদনপত্র, দলিলপত্র এবং অনুমোদনের তথ্য মিলিয়ে দেখার আবেদন জানানো হয়েছে।
এ ছাড়া পিকআপ, ট্রাক, কভারভ্যান ও অন্যান্য ভারী যানবাহনের নিবন্ধনের ক্ষেত্রে প্রকৃত আমদানি ও কাস্টমস-সংক্রান্ত নথিতে জটিলতা থাকলেও ৩ থেকে সাড়ে ৩ লাখ টাকা ঘুষের বিনিময়ে নিবন্ধন দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে। সত্যতা যাচাইয়ের জন্য গত এক বছরে নিবন্ধিত এসব যানবাহনের ফাইল, বিল অব এন্ট্রি, কাস্টমস নথি, ইনভয়েস, আমদানি-সংক্রান্ত কাগজপত্র, চেসিস ও ইঞ্জিন নম্বর এবং বিআরটিএর নিবন্ধন ফাইল পরস্পরের সঙ্গে মিলিয়ে দেখার দাবি জানানো হয়েছে।
অভিযোগে বলা হয়েছে, সহকারী পরিচালক (এডি) আনোয়ার হোসেন ও কম্পিউটার অপারেটর মোহাম্মদ দিদার ২০১৬ সাল থেকে তৌহিদুল হোসেনের অন্যতম সহযোগী হিসেবে কাজ করছেন। পরবর্তীতে হালিশহর কার্যালয়েও তারা একসঙ্গে কর্মরত রয়েছেন। তৌহিদুল হোসেনের অবৈধ অর্থ সংগ্রহ ও হিসাব সংরক্ষণের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট আরেকজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি রুবেল দাস। গুরুত্ব বিবেচনায় হালিশহর বিআরটিএ কার্যালয়ের সাম্প্রতিক সিসিটিভি ফুটেজ দ্রুত সংরক্ষণের প্রয়োজন রয়েছে বলেও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে বিআরটিএ হালিশহর কার্যালয়ের (চট্টগ্রাম মেট্রো সার্কেল-১) উপপরিচালক (প্রকৌশল) তৌহিদুল হোসেন অভিযোগ অস্বীকার করেন। তিনি বলেন, “আমার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলো সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। ব্যক্তিগত শত্রুতা ও বিরোধের জেরে কেউ হয়তো আমাকে হেয় করতে এসব অভিযোগ করেছে। এসব অভিযোগের বিষয় আমি জানি না।”
অভিযোগের বিষয়টি নিশ্চিত করে বাংলাদেশ সিএনজি অটোরিকশা হালকাযান পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশন (রেজি. নং–বি-২১৮১) চট্টগ্রাম মহানগর শাখার সাধারণ সম্পাদক মো. জহির উদ্দিন বলেন, “উত্থাপিত অভিযোগগুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সরকারের বৃহত্তর স্বার্থে এসব অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া জরুরি। তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা ও দায়ীদের চিহ্নিত করা প্রয়োজন।”
প্রতিনিধি/আরএইচ