আফ্রিকার ছয়টি দেশে ‘যৌনাঙ্গ চুরির’ কাল্পনিক অভিযোগে গণপিটুনি ও সহিংসতায় ৮০ জনেরও বেশি মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে। গত বছরের অক্টোবর থেকে চলতি বছরের জুলাই মাসের মধ্যে এসব হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটে।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম বিবিসির গ্লোবাল ডিসইনফরমেশন ইউনিট সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর পুলিশ বাহিনীর কাছ থেকে তথ্য সংগ্রহ করে এ সংক্রান্ত একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, সামান্য স্পর্শ বা পিঠে টোকা দিলেই পুরুষের যৌনাঙ্গ অদৃশ্য বা সংকুচিত হয়ে যায়- এমন অবৈজ্ঞানিক বিশ্বাসের সঙ্গে এ সব হত্যাকাণ্ডের যোগসূত্র রয়েছে। অঞ্চলটিতে জাদুটোনার পুরোনো কুসংস্কার থাকলেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া বিভ্রান্তিকর তথ্য ও ভিডিও এই ভয়ভীতিকে আরও প্রাণঘাতী করে তুলেছে।
২০০৮ সালে গণতান্ত্রিক কঙ্গো প্রজাতন্ত্রে উত্থান ঘটা এই গুজব সম্প্রতি বুরুন্ডি, জাম্বিয়া, তানজানিয়া, মোজাম্বিক, অ্যাঙ্গোলা, মালাউই ও কেনিয়ায় ছড়িয়ে পড়ে।
গত এপ্রিলে তানজানিয়া সীমান্তের কাছে তুন্দুমা এলাকায় একই অভিজ্ঞতার শিকার হন বনিফাস এমগালা নামের এক মেকানিক। তিনি জানান, ‘গাড়ি বিক্রির কাজে এক বন্ধুর সঙ্গে রেস্তোরাঁয় খাওয়ার সময় একদল উত্তেজিত জনতা ‘যৌনাঙ্গ চুরির’ ভুয়া অভিযোগে তাদের ওপর হামলা চালায়। এতে তার বন্ধু মারা যান এবং তিনি গুরুতর আহত হন।’
তিনি আরও বলেন, ‘তারা চিৎকার করে বলছিল আমরা কারও যৌনাঙ্গ চুরি করেছি। ভিড়ের কারণে পালানোর কোনো উপায় ছিল না।’
একই এলাকায় এক যুবককে আগুনে পুড়িয়ে হত্যার ঘটনা দেখেন ফটোগ্রাফার মাইকেল সিলাভওয়ে। তিনি জানান, টিকটকে এই সংক্রান্ত ভুয়া ভিডিওগুলো ছড়িয়ে পড়ার পর মানুষের মধ্যে চরম উদ্বেগ তৈরি হয়। তবে পরবর্তী সময়ে তিনি বুঝতে পারেন এই দাবির কোনো ভিত্তি ছিল না।
তুন্দুমার মোম্বা জেলার কমিশনার এলিয়াস ডেনিয়েল এমওয়ান্দোবো জানান, তদন্তে দেখা গেছে কিছু অপরাধী চক্র নিজেদের স্বার্থে ও অপরাধ সংঘটনের উদ্দেশ্যে জনমনে আতঙ্ক ছড়ানোর পরিকল্পনা করেছিল।
সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত মোজাম্বিকে ছয় সপ্তাহের সহিংসতায় একজন পুলিশ কর্মকর্তা ও স্বাস্থ্যকর্মীসহ ৫৫ জন নিহত হয়েছেন। মোজাম্বিকের প্রেসিডেন্ট ড্যানিয়েল চাপো এসব ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়ে বলেন, যৌনাঙ্গ হারানোর কোনো চিকিৎসাগত প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
স্বাস্থ্য প্রচারণায় সরকার জানিয়েছে, এই ভীতিটি মূলত ‘কোরো সিন্ড্রোম’ বা যৌনাঙ্গ কুঁকড়ে যাওয়া সংক্রান্ত মানসিক ব্যাধির সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে। সহিংসতার কারণে দেশটির ক্যাবো ডেলিগাডো প্রদেশের দুটি স্বাস্থ্যকেন্দ্রও সাময়িক বন্ধ রাখতে হয়।
সম্প্রতি কেনিয়ার উপকূলীয় অঞ্চলে এই গুজবে পাঁচজন এবং মালাউইতে আটজন নিহত হয়েছেন।
মোম্বাসা কাউন্টির কমিশনার মোহাম্মদ নুর জানান, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভিউ ও এনগেজমেন্ট বাড়াতে কিছু কনটেন্ট ক্রিয়েটর এসব ভুল তথ্য ছড়িয়েছিলেন, যা প্রাণহানির কারণ হয়। এ ঘটনায় পিতা-পুত্রসহ বেশ কয়েকজনকে গ্রেপ্তার ও কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
সোশ্যাল মিডিয়া বিশেষজ্ঞ ও লেখক জুলিয়েন বনহোম তার ‘দ্য সেক্স থিভস’ বইয়ের প্রসঙ্গ টেনে জানান, স্মার্টফোন ও সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করা ভিডিওগুলো তাৎক্ষণিকতার কারণে গুজবের গতি ও বিশ্বাসযোগ্যতা বাড়িয়ে দেয়। টিকটক ও ফেসবুকে এসব সহিংসতার বহু ভিডিও ও মিথ্যা প্রচার এখনও দৃশ্যমান।
মেটার একজন মুখপাত্র জানিয়েছেন, নীতি লঙ্ঘনকারী কনটেন্ট পর্যালোচনার মাধ্যমে সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে। তবে বিষয়টি নিয়ে টিকটকের কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। সূত্র: বিবিসি বাংলা
দেশবার্তা/একে