পাঁচ দশক পর পাকিস্তানের সামরিক কমান্ড কাঠামোয় বড় ধরনের পরিবর্তন আনা হয়েছে। দেশটির পার্লামেন্ট আগস্টের শেষ দিকে দুটি আইন পাস করেছে। এর মাধ্যমে সশস্ত্র বাহিনীর সর্বোচ্চ সামরিক পদ চিফ অব ডিফেন্স ফোর্সেসের (সিডিএফ) ক্ষমতা আইনি ভিত্তি পেয়েছে। একই সঙ্গে ১৯৭৬ সালে গঠিত চেয়ারম্যান অব দ্য জয়েন্ট চিফস অব স্টাফ কমিটির (সিজেসিএসসি) পদ বিলুপ্ত করে নতুন কমান্ড কাঠামো চালু করা হয়েছে।
২০ আগস্ট পাকিস্তানের ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলি ডিফেন্স ফোর্সেস অব পাকিস্তান অ্যাক্ট, ২০২৬ এবং ন্যাশনাল কমান্ড অথরিটি অ্যাক্ট, ২০১০-এর সংশোধনী অনুমোদন করে। এর মাধ্যমে গত বছর ২৭তম সংবিধান সংশোধনীর ভিত্তিতে সৃষ্ট সিডিএফ পদটির ক্ষমতা ও দায়িত্ব নির্ধারণ করা হয়। আইন দুটি ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলির মূল আলোচ্যসূচিতে ছিল না। মন্ত্রিসভা ওই দিন সকালে অনুমোদন দেয়ার পর কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই তা পাস হয়।
বিশ্লেষকদের মতে, গত বছরের মে মাসে ভারতের সঙ্গে চার দিনের সংঘাতের এক বছরের কিছু বেশি সময়ের মধ্যে এ পরিবর্তন পাকিস্তানের সামরিক কমান্ড ব্যবস্থায় বড় পুনর্বিন্যাসের ইঙ্গিত দিচ্ছে। ১৯৭৬ সালে সিজেসিএসসি গঠনের পর তিন বাহিনীর মধ্যে সমন্বয়ের জন্য যে কাঠামো চালু ছিল, নতুন ব্যবস্থায় সেটি বদলে গেছে।
নতুন কাঠামোয় সিজেসিএসসি পদ বিলুপ্ত করে ডিফেন্স ফোর্সেস হেডকোয়ার্টার্স (ডিএফএইচকিউ) গঠন করা হয়েছে। এর প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির। তিনি একই সঙ্গে পাকিস্তানের সেনাপ্রধান।
আগের কাঠামোয় সিজেসিএসসি মূলত সমন্বয়কের ভূমিকা পালন করত। নৌ ও বিমানবাহিনীর ওপর এর সরাসরি কমান্ড ছিল না। তিন বাহিনীও নিজ নিজ কার্যক্রম পরিচালনা করত। নতুন আইনে সিডিএফকে তিন বাহিনীর সামরিক কার্যক্রমের ‘অপারেশনাল কমান্ড অ্যান্ড কন্ট্রোল’ দেয়া হয়েছে। ফলে সামরিক অভিযানের ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রী, সিডিএফ ও তার সদর দফতর, তিন বাহিনীর প্রধান এবং মাঠপর্যায়ের কমান্ড—এমন একটি আনুষ্ঠানিক কমান্ড কাঠামো তৈরি হয়েছে।
অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট জেনারেল নাঈম খালিদ লোধির মতে, নতুন ব্যবস্থায় সিডিএফ এখন প্রকৃত অর্থেই কমান্ডারের ভূমিকায় এসেছেন। আগে সিজেসিএসসি নৌ ও বিমানবাহিনীর বিষয়ে কোনো ব্যবস্থা নিতে পারতেন না। নতুন কাঠামোয় সেই ক্ষমতা তিন বাহিনীকেই অন্তর্ভুক্ত করেছে।
তবে নতুন ব্যবস্থায় তিন বাহিনীর মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষ করে কৌশলগত কমান্ড কাঠামোয় সেনাবাহিনীর প্রাধান্য বাড়ার আশঙ্কা করছেন বিশ্লেষকরা।
নতুন আইনে নিউক্লিয়ার সক্ষমতাসম্পন্ন বাহিনীর দায়িত্বে থাকা কমান্ডার অব ন্যাশনাল স্ট্র্যাটেজিক কমান্ডের (সিএনএসসি) পদটি সেনাবাহিনীর কর্মকর্তার জন্য নির্ধারিত করা হয়েছে। সিডিএফের সুপারিশে এ পদে নিয়োগ হবে। ২০২৬ সালের জুলাইয়ে জেনারেল সৈয়দ আমের রাজাকে এ পদে প্রথম নিয়োগ দেয়া হয়। তিনি এর আগে চিফ অব জেনারেল স্টাফ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।
ফলে নৌ ও বিমানবাহিনীর কর্মকর্তাদের জন্য এ পদে যাওয়ার সুযোগ থাকছে না। বিশ্লেষক মাজিদ নিজামির মতে, আগে সিজেসিএসসি পদটি তিন বাহিনীর মধ্যে ঘুরিয়ে দেয়ার সুযোগ ছিল। নতুন কাঠামোয় ন্যাশনাল স্ট্র্যাটেজিক কমান্ডের চার তারকা পদটি কার্যত সেনাবাহিনীর জন্য নির্দিষ্ট হয়ে গেছে।
এ পরিবর্তনে তিন বাহিনীর মধ্যে বিশেষ করে নৌ ও বিমানবাহিনীর প্রাতিষ্ঠানিক স্বাতন্ত্র্য ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে বলেও আশঙ্কা রয়েছে। সামরিক বাহিনীর একজন সাবেক কর্মকর্তা বলেন, তিন বাহিনীর গুরুত্বপূর্ণ পদ ও পদোন্নতি সিডিএফের অনুমোদনের আওতায় এলে অন্য দুই বাহিনীর মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হতে পারে।
নতুন কাঠামোর প্রভাব পড়তে পারে পাকিস্তানের পারমাণবিক কমান্ড ব্যবস্থাতেও। সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকদের মতে, সিডিএফ এখন প্রধানমন্ত্রী নেতৃত্বাধীন ন্যাশনাল কমান্ড অথরিটির (এনসিএ) ডেপুটি চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন। পাকিস্তানের পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবস্থাপনার সর্বোচ্চ কাঠামো হিসেবে এনসিএর আনুষ্ঠানিক নিয়ন্ত্রণ প্রধানমন্ত্রীর হাতেই থাকার কথা। তবে বাস্তবে পারমাণবিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে সিডিএফের প্রভাব বাড়তে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
পাকিস্তান গত বছর প্রচলিত ক্ষেপণাস্ত্র হামলার জন্য আর্মি রকেট ফোর্স কমান্ডও গঠন করেছে। এর ফলে পারমাণবিক প্রতিরোধ ব্যবস্থা ও প্রচলিত ক্ষেপণাস্ত্র অভিযানের মধ্যে আলাদা কমান্ড কাঠামো তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে দেশটির পারমাণবিক ও ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি পরিচালনাকারী স্ট্র্যাটেজিক প্ল্যানস ডিভিশন নতুন ব্যবস্থায়ও দায়িত্ব পালন করবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
সামরিক বাহিনীর ওপর বেসামরিক সরকারের নিয়ন্ত্রণের বিষয়টিও নতুন আইনে আলোচনায় এসেছে। সাবেক সেনা কর্মকর্তা কর্নেল ইনাম রাহিমের মতে, নতুন ব্যবস্থায় নির্বাচিত বেসামরিক সরকারের কাছ থেকে সামরিক বাহিনীর ওপর কিছু গুরুত্বপূর্ণ ক্ষমতা সরে গেছে। আগে কোনো কর্মকর্তাকে বরখাস্ত বা অবসরে পাঠাতে প্রধানমন্ত্রীর কাছে সারসংক্ষেপ পাঠানোর প্রয়োজন হতো। নতুন ব্যবস্থায় এ ক্ষমতা সিডিএফের হাতে দেয়া হয়েছে বলে তিনি দাবি করেন।
তবে সবাই এ পরিবর্তনকে সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক মনে করছেন না। সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী হাফিজ আহসান আহমদ খোখর বলেন, গত বছরের সংবিধান সংশোধনীর পর নতুন সামরিক কাঠামোর ক্ষমতাগুলো আইনের মাধ্যমে কার্যকর করাই এ আইনগুলোর উদ্দেশ্য। তার মতে, পার্লামেন্ট সংবিধানের বাইরে কোনো নতুন কর্তৃত্ব তৈরি করেনি।
তবে পাকিস্তানের নতুন ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্তরাজ্য ও অস্ট্রেলিয়ার কাঠামোর পার্থক্য রয়েছে। ওই দেশগুলোয় শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তার পদটি পৃথক এবং ঐতিহাসিকভাবে সেনা, নৌ ও বিমানবাহিনীর মধ্যে ঘুরিয়ে দেয়া হয়। পাকিস্তানে সিডিএফ পদটি একই সঙ্গে সেনাপ্রধানের দায়িত্ব পালনকারী কর্মকর্তার হাতেই থাকছে। ফলে নতুন কমান্ড কাঠামোয় সেনাবাহিনীর প্রাতিষ্ঠানিক প্রভাব আরো শক্তিশালী হওয়ার আশঙ্কাই বেশি বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
দেশবার্তা/এমআর