বাংলাদেশের জাতীয় মাছ ইলিশের প্রাকৃতিক অভয়ারণ্য ও চলাচলের ক্ষেত্রে দেখা দিয়েছে অভূতপূর্ব পরিবর্তন। গত সাত-আট বছর ধরে উপকূল ও নদীর অগভীর পানিতে আশঙ্কাজনক হারে কমেছে ইলিশের উপস্থিতি। ফলে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে উপকূলীয় এলাকায় জাল ফেলা প্রান্তিক জেলেরা এখন কাঙ্ক্ষিত মাছের দেখা পাচ্ছেন না। জেলে ও মৎস্য বিশেষজ্ঞদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তন, নদীর প্রবাহ হ্রাস এবং উজান থেকে আসা পলির কারণে মাছের এই স্বাভাবিক বিচরণপথ ও গভীরতায় পরিবর্তন এসেছে।
পটুয়াখালীর কলাপাড়ার নীলগঞ্জের তিন দশকের অভিজ্ঞ জেলে সিদ্দিক মাঝি বলেন, ‘তিন দশকের বেশি সময় ধরে ইলিশ ধরছি। কিন্তু গত সাত-আট বছরে ধীরে ধীরে ইলিশের পরিমাণ কমে গেছে।’
তাঁর মতে, ইলিশ বঙ্গোপসাগরে বিদ্যমান থাকলেও তা আগের মতো ২০ থেকে ৪০ ফুট গভীরতার ওপরের স্তরে আসছে না। বর্তমানে উপকূল থেকে দূরে, বিশেষ করে ৪০ মিটারের বেশি গভীর পানিতে ইলিশের উপস্থিতি থাকলেও আধুনিক সরঞ্জাম ও উপযুক্ত নৌকার অভাবে প্রান্তিক জেলেদের পক্ষে সেখানে গিয়ে মাছ ধরা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে।
সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২২-২৩ অর্থবছরে দেশে ইলিশের উৎপাদন রেকর্ড প্রায় ৫ লাখ ৭১ হাজার টনে পৌঁছালেও পরবর্তী দুই বছরে তা ১২.৫ শতাংশ হ্রাস পায়। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে জাতীয়ভাবে ইলিশের আহরণ সাত বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন প্রায় ৫ লাখ টনে নেমে আসে। অতিরিক্ত হিসেবে, ২০২৫ সালের জুলাই ও আগস্টে আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ইলিশ আহরণ প্রায় ৪৫ শতাংশ কমেছে। অগভীর সমুদ্র ও নদীর মোহনা থেকে মাছ স্থানান্তরিত হওয়ায় চরম আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন উপকূলীয় জেলেরা।
পটুয়াখালীর আরেক জেলে আবুল হোসেন জানান, ইলিশের ভরা মৌসুমে ১৪ দিন সাগরে কাটিয়ে তিনি পেয়েছেন মাত্র তিন হাজার টাকা, যেখানে আগের বছর একই সময়ে তাঁর আয় ছিল প্রায় এক লাখ টাকা। জেলেদের যৌথ অংশীদারত্বে মাছ ধরার প্রচলিত প্রক্রিয়ায় ভ্রমণ ব্যর্থ হলে জ্বালানি, বরফ ও খাবারের ব্যয় মেটানো অসম্ভব হয়ে ওঠে। এতে মাছ বিক্রি থেকে আয় তো দূরে থাক, অধিকাংশ সাধারণ জেলেকে নতুন করে ঋণের চক্রে পড়তে হচ্ছে।
উজানের গবেষণাতেও মাছের শারীরিক আকার ও অভিবাসন হ্রাসের চিত্র মিলেছে। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের মৎস্যবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. ইয়ামিন হোসেন ২০১৭ সাল থেকে পদ্মায় পরিচালিত তাঁর গবেষণার ভিত্তিতে জানান, আগে পাওয়া ইলিশের বড় অংশ ৩০০ গ্রামের বেশি ওজনের হলেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সেটির দেখা মেলা ভার। অধিকাংশ ইলিশের ওজন ৩০০ গ্রামের নিচে এবং এমনকি ১৭-১৮ সেন্টিমিটার দৈর্ঘ্যের ও ১৪০-১৫০ গ্রাম ওজনের ইলিশকেও প্রাপ্তবয়স্ক ও প্রজননক্ষম হতে দেখা যাচ্ছে, যা একটি উদ্বেগজনক লক্ষণ।
এদিকে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের মৎস্য জীববিজ্ঞান ও জেনেটিকস বিভাগের অধ্যাপক ড. শামসুল আলম জানান, ইলিশের ওপর কোনো নেতিবাচক জিনগত প্রভাব বা তাদের সার্বিক সংখ্যায় ধস নামার প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তবে ইলিশের মধ্যে পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার উচ্চ ক্ষমতাই তাদের সাগরের আরও গভীরে নিয়ে যাচ্ছে। ফারাক্কা বাঁধের প্রভাবে নদীতে পানিপ্রবাহ হ্রাস, চর জেগে ওঠা এবং মেঘনা-তেঁতুলিয়া মোহনার ১৭টি চিহ্নিত স্থানে পলি জমে পানির গভীরতা ৩০ ফুট থেকে ভাটার সময় মাত্র ৮-৯ ফুটে নেমে আসা মাছ চলাচলের পথকে রুদ্ধ করে দিয়েছে।
মৌসুমি নিষেধাজ্ঞা এবং প্রজনন সুরক্ষার সুফল পাওয়া গেলেও তা সঠিকভাবে প্রয়োগ না হওয়া এবং বিকল্প জীবিকার অপ্রতুলতা নিয়ে জেলেদের মধ্যে ক্ষোভ রয়েছে। উপকূলীয় অনেক অঞ্চলের জেলে নিয়ম মানলেও অন্যান্য স্থানে অসাধু উপায়ে মাছ ধরা বন্ধ না হওয়ায় মূল উদ্দেশ্য ব্যাহত হচ্ছে। তদুপরি, নিষেধাজ্ঞার সময়ে দেওয়া সরকারি খাদ্য সহায়তা অপ্রতুল এবং তা প্রকৃত জেলেদের কাছে পৌঁছানো নিয়ে জটিলতা থেকেই যাচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, সুনির্দিষ্ট ড্রেজিংয়ের মাধ্যমে নদীর নাব্য ফিরিয়ে আনা, নদী ও প্রজননক্ষেত্রের দূষণ রোধ এবং গবেষণার পরিমাণ বাড়ালে ইলিশের প্রাচুর্য আবার ফিরিয়ে আনা সম্ভব।
ড. ইয়ামিন হোসেন আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, প্রজননক্ষম মা ইলিশ ও জাটকা সুরক্ষার সঠিক ব্যবস্থাপনা বজায় রাখা গেলে ২০২৮-২৯ সালের মধ্যে নদীতে ইলিশের সরবরাহ আবার স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরতে পারে। তথ্যসূত্র: ডেইলিস্টার বাংলা
দেশবার্তা/একে