রাশিয়ার ধারাবাহিক বিমান হামলায় ইউক্রেনের সবচেয়ে বড় ইস্পাত কারখানার উৎপাদন বন্ধ হয়ে গেছে। মধ্যাঞ্চলের ক্রিভি রিহ শহরে অবস্থিত কারখানাটি পরিচালনা করে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম ইস্পাত উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান আর্সেলর মিত্তাল। পাঁচ সপ্তাহে চার দফা হামলায় কারখানাটি ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর সেখানে নিরাপদ ও স্থায়ীভাবে উৎপাদন চালানো সম্ভব হচ্ছে না বলে জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।
শুক্রবার ইউক্রেন সরকারকে দেওয়া এক বার্তায় আর্সেলর মিত্তাল এ তথ্য জানায়। প্রতিষ্ঠানটির ভাষ্য, সাম্প্রতিক হামলায় কারখানাটির পাঁচ শ্রমিক নিহত হয়েছেন।
ইউক্রেনের অর্থনীতিতে ইস্পাতশিল্পের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। একসময় দেশটির মোট রপ্তানির প্রায় ১৫ শতাংশ এ খাত থেকে আসত। তবে রুশ হামলা এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের বিভিন্ন বিধিনিষেধের কারণে দীর্ঘদিন ধরেই খাতটি চাপের মুখে রয়েছে।
বাড়ছে রুশ বিমান হামলা
সাম্প্রতিক মাসগুলোতে ইউক্রেনে রাশিয়ার বিমান হামলার মাত্রা বেড়েছে। ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও জেটচালিত ড্রোন ব্যবহার করে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, সরবরাহব্যবস্থা, কৃষ্ণসাগরের বন্দর এবং বেসামরিক অবকাঠামো লক্ষ্য করে হামলা চালানো হচ্ছে।
ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি শুক্রবার বলেন, রাশিয়া এখন ইউক্রেনীয়দের দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে যুক্ত অবকাঠামোকেও হামলার লক্ষ্যবস্তু করছে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, গুদাম, তথ্য সংরক্ষণকেন্দ্র ও ইন্টারনেট সেবা প্রতিষ্ঠানসহ বিভিন্ন স্থাপনায় হামলা হচ্ছে।
জেলেনস্কি বলেন, এসব হামলার কারণে মানুষের যোগাযোগ, পড়াশোনা ও কাজ চালিয়ে যাওয়ার সক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
প্রতিরক্ষা ব্যয় বাড়ানোর উদ্যোগ
ইউক্রেনের বাজেট ও প্রতিরক্ষা ব্যয় নিয়ে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) সঙ্গে আলোচনা চলছে। চলতি বছর প্রতিরক্ষা খাতে অতিরিক্ত ২৭ বিলিয়ন ডলার সহায়তা চেয়েছে কিয়েভ।
জেলেনস্কি বলেন, আগামী বছরের শুরুতে ড্রোন সরবরাহ নিশ্চিত করতে অক্টোবর ও নভেম্বরের মধ্যেই নতুন করে ড্রোনের অর্ডার দিতে হবে। এ জন্য ইউক্রেনের নিজস্ব তৈরি ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্রে আরও বিনিয়োগ প্রয়োজন বলেও জানান তিনি।
রাশিয়া-ইউরোপ উত্তেজনা
চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আলোচনার বিষয়েও নজর রাখছে ইউক্রেন। জেলেনস্কি ট্রাম্পকে চীনের ওপর বেইজিংয়ের প্রভাব কাজে লাগিয়ে রাশিয়াকে যুদ্ধ বন্ধে চাপ দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
অন্যদিকে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন বলেছেন, ইউরোপের সঙ্গে কোনো ধরনের সংঘাতের প্রস্তুতি নিচ্ছে না রাশিয়া। ইউরোপের কয়েকটি ন্যাটো সদস্যদেশ রাশিয়ার সম্ভাব্য হামলা নিয়ে সতর্ক করার পর তিনি এ মন্তব্য করেন।
পুতিন বলেন, ইউরোপের সঙ্গে উত্তেজনা বাড়ানোর কোনো বাস্তব কারণ রাশিয়ার নেই। তবে ইউক্রেনকে সহায়তা করা ন্যাটোর অবকাঠামোয় রাশিয়া হামলা চালাতে পারে বলে ইউরোপের কয়েকটি দেশের গোয়েন্দা ও নিরাপত্তা সংস্থা সতর্ক করেছে।
এদিকে ফ্রান্স ও জার্মানিতে ইউক্রেনবিরোধী বা ইউক্রেনকে কম সমর্থনকারী রাজনৈতিক দলগুলো নির্বাচনে শক্তিশালী হলে ইউক্রেনের প্রতি ইউরোপের সমর্থন কমে যেতে পারে—এমন আশঙ্কা নিয়ে আলোচনা চলছে। তবে ইউরোপের কয়েকজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেছেন, কিছু দেশে সমর্থন কমলেও ইউক্রেনের প্রতি ইউরোপের সহযোগিতা অব্যাহত থাকবে।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের ১৪ জন সিনেটর ট্রাম্পকে ডিসেম্বরে ফ্লোরিডায় অনুষ্ঠেয় জি-২০ সম্মেলনে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট পুতিনকে আমন্ত্রণ প্রত্যাহারের আহ্বান জানিয়েছেন।
চিঠিতে তাঁরা বলেন, ইউক্রেনে রাশিয়ার যুদ্ধের কারণে পুতিনকে জি-২০ সম্মেলনে অংশ নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হলে তা রাশিয়া সরকারের কর্মকাণ্ডকে স্বাভাবিক হিসেবে দেখানোর ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
দেশবার্তা/এমআর