সারাদেশের ন্যায় উত্তরের জেলা নওগাঁতেও হঠাৎ করেই সংক্রামক রোগ হামের প্রাদুর্ভাব আশঙ্কাজনক হারে বাড়তে শুরু করেছে। জেলায় ইতিমধ্যে আটজন হাম রোগী শনাক্ত হওয়ার পাশাপাশি ৪১ জনের শরীরে এই রোগের উপসর্গ পাওয়া গেছে।
এদিকে, ঢাকায় বসবাসকারী নওগাঁ জেলার এক শিশু হামে আক্রান্ত হয়ে সেখানে মারা যাওয়ায় স্থানীয়দের মধ্যে আতঙ্ক আরও ঘনীভূত হয়েছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় জেলা স্বাস্থ্য বিভাগ সতর্কাবস্থা জারি করলেও হাসপাতালগুলোতে তিল ধারণের জায়গা নেই।
সোমবার (৩০ মার্চ) সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত নওগাঁ ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালের শিশু বিভাগ ঘুরে দেখা যায় এক ভয়াবহ চিত্র। ২০ শয্যার এই ওয়ার্ডটিতে সর্দি, জ্বর ও হামের উপসর্গ নিয়ে বর্তমানে ৭০ জন শিশু ভর্তি রয়েছে। শয্যা সংকটে অধিকাংশ রোগীকে হাসপাতালের নোংরা মেঝেতে থেকে চিকিৎসা নিতে হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে একটি বিছানায় দুই থেকে তিন জন রোগীকে রাখা হয়েছে, যার ফলে সুস্থ শিশুরও নতুন করে সংক্রমিত হওয়ার চরম ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
সেবা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে নওগাঁ শহরের চকদেবপাড়া থেকে আসা এক রোগীর স্বজন বলেন, ‘ডায়রিয়া, জ্বর ও হামের চিকিৎসা একই ওয়ার্ডে একইভাবে দেওয়া হচ্ছে। সংক্রামক রোগ হওয়ার পরও আলাদা কোনো ব্যবস্থা নেই। এমনকি হাসপাতালে জ্বর মাপার থার্মোমিটার পর্যন্ত নেই। নার্সরা হাত দিয়ে গা টিপে আন্দাজ করে ওষুধ দিচ্ছেন। সরকারি হাসপাতালে এসে যদি আইডিয়া করে চিকিৎসা নিতে হয়, তবে আমাদের নিরাপত্তা কোথায়?’
একই চিত্র দেখা গেছে মান্দা ও রানীনগর থেকে আসা রোগীদের ক্ষেত্রেও। মান্দার পাজোরভাঙ্গা এলাকার এক শিশুর মা জানান, কয়েক দিন ধরে তার ছেলে জ্বরের ঘোরে সারারাত কান্নাকাটি করছে এবং সারা শরীরে লালচে র্যাশ ও চুলকানি দেখা দিয়েছে।
রানীনগরের জোবেদা জানান, তার নাতির প্রচণ্ড জ্বরের পর খিঁচুনি শুরু হলে হাত-পা বাঁকা হয়ে যায়। হাসপাতালে এসে বেড না পেয়ে বাধ্য হয়ে মেঝেতেই আশ্রয় নিয়েছেন তারা।
হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ড ইনচার্জ রেহেনা স্বীকার করেন যে, গত কয়েক দিন ধরে জ্বরের পাশাপাশি কাশি ও শরীরে লালচে র্যাশ থাকা রোগীর সংখ্যা অস্বাভাবিক বেড়েছে। জনবল সংকটের কারণে এত বিপুল সংখ্যক রোগীকে সেবা দিতে হিমশিম খাচ্ছেন তারা।
হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার (আরএমও) ডা. আবু জার গাফফার জানান, পরিস্থিতি বিবেচনায় একটি আলাদা কেবিনকে ‘আইসোলেশন ওয়ার্ড’ হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে এবং প্রয়োজনে এর পরিধি বাড়ানো হবে।
জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, নওগাঁ সদর, পোরশা, নিয়ামতপুর, সাপাহার, আত্রাই ও মান্দা উপজেলায় এই রোগের প্রকোপ সবচেয়ে বেশি। এর মধ্যে নওগাঁ পৌরসভার ৫ নম্বর ওয়ার্ড ও নিয়ামতপুর উপজেলার ভাবিচা ইউনিয়নের একটি ওয়ার্ডকে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
নওগাঁর সিভিল সার্জন ডা. আমিনুল ইসলাম জানান, ‘হামের প্রাদুর্ভাব ঠেকাতে আমরা সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছি। আক্রান্ত এলাকাগুলোর চারপাশের প্রায় ৪০টি বাড়ির শিশুদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল খাওয়ানো হচ্ছে। এছাড়া পোরশা, সাপাহার ও মান্দায় সন্দেহভাজন রোগী পাওয়ায় সেখানে বিশেষ সার্চিং কার্যক্রম চলছে।’
তিনি আরও জানান, আগামী মে মাসে শিশুদের এমআর টিকার বুস্টার ডোজ দেওয়া হবে।
শিশুদের শরীরে কোনো অস্বাভাবিক উপসর্গ দেখা দিলে সময় নষ্ট না করে দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি।
প্রতিনিধি/একে