মাগুরার ঐতিহ্যবাহী দারিয়াপুর ডিগ্রি কলেজের দৃশ্যপট বদলে যাচ্ছে। কলেজ মাঠের জলাবদ্ধতা নিরসন, ক্যাম্পাস সিসি ক্যামেরার আওতায় আনা, অধ্যক্ষের বাসভবন ও ছাত্রী হোস্টেল নির্মাণ, ছাত্রদের হোস্টেল পুনর্নির্মাণ, হোস্টেলের জন্য রান্নাঘর নির্মাণ, ভাঙনরোধে বস্তায় বালু ভরে গর্ত ভরাট, শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের সাইকেল গ্যারেজ, খেলার মাঠ সংস্কার ও সম্প্রসারণসহ বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কাজ করা হয়েছে।
এ ছাড়া প্রশাসনিক ভবন সম্প্রসারণ, একতলা কলেজ ক্যান্টিন নির্মাণ, পুরো কলেজ ক্যাম্পাস আলোকিত করা, ছাত্রদের ওয়াশরুম এবং ছাত্রীদের কমনরুম ও ওয়াশরুম সংস্কার, ফুলের বাগান করে কলেজের শোভাবর্ধন, চলতি বর্ষা মৌসুমে বিভিন্ন প্রজাতির দুই শতাধিক বনজ ও ঔষধি গাছ রোপণ এবং ১০০ শিক্ষার্থীকে পাঁচটি ক্যাটাগরিতে বৃত্তি প্রদান করা হয়েছে। এসব কার্যক্রমে ধীরে ধীরে বদলে যাচ্ছে ঐতিহ্যবাহী দারিয়াপুর ডিগ্রি কলেজের চিত্র। ইতিমধ্যে প্রায় ১৯টি উন্নয়নমূলক কাজ সম্পন্ন হয়েছে বলে জানান কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ আব্দুস ছবুর।
চলতি বছরের ৫ জানুয়ারি কলেজ পরিচালনা পর্ষদের নতুন সভাপতি ঢাকা জজ কোর্টের বিশিষ্ট আইনজীবী ও দুর্নীতি দমন কমিশনের পাবলিক প্রসিকিউটর মো. তরিকুল ইসলামের নির্দেশনায় এবং কলেজ পরিচালনা পর্ষদের সদস্যদের সহযোগিতায় এসব কার্যক্রম সম্পন্ন হয়েছে।
বর্তমান সরকার স্কুল ও কলেজ পর্যায়ে খেলাধুলার ওপর গুরুত্ব দেওয়ায় কলেজের মাঠ সম্প্রসারণের পাশাপাশি প্রতিদিন ফুটবলসহ বিভিন্ন খেলাধুলা শুরু হয়েছে। কলেজের শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি গ্রামের ছেলেরাও কলেজ মাঠে নিয়মিত খেলাধুলা করছে। এতে এ প্রজন্মের তরুণ-যুবারা খেলাধুলার প্রতি আগ্রহী হচ্ছে।
১৯৯২ সালের ২৮ আগস্ট এলাকার ঐতিহ্যবাহী বিদ্যাপীঠ দারিয়াপুর ডিগ্রি কলেজ প্রতিষ্ঠিত হয়। প্রতিষ্ঠাকালীন সময়ে গণপূর্ত বিভাগের সাবেক প্রধান প্রকৌশলী মরহুম এ এন কামাল উদ্দিন মোস্তফা, দারিয়াপুর দরবার শরীফের মরহুম পীরজাদা মওলানা আবু সাঈদ, দারিয়াপুর ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান মো. মোমতাজ উদ্দিন বিশ্বাস, সাবেক জেলা স্যানেটারি ইন্সপেক্টর মো. আতাউর রহমান বিশ্বাস, সিনিয়র সাংবাদিক মো. মতিউর রহমান টুকু, দারিয়াপুর ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান ও বর্তমান পরিচালনা পর্ষদের হিতৈষী সদস্য মো. মছিহুল আজমসহ এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তিদের অক্লান্ত পরিশ্রমে গড়ে ওঠে দারিয়াপুর ডিগ্রি কলেজ।
প্রতিষ্ঠাকালীন অধ্যক্ষ নিজাম উদ্দিনের আপ্রাণ চেষ্টায় যশোর বোর্ডের মধ্যে কয়েকবার পরীক্ষার ফলাফলে তৃতীয় স্থানের সুনাম অর্জন করে কলেজটি। এ কলেজ থেকে অনেক মেধাবী শিক্ষার্থী বের হয়েছেন। তাদের মধ্যে রয়েছেন অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক মিন্টু বিশ্বাস, চারজন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা—রিপন বিশ্বাস, মো. নাজমুল ইসলাম, সুদীপ্ত সিংহ ও রেক্সোনা খাতুন, একজন সহকারী কমিশনার (ভূমি) হোসেন আলী, একজন সহকারী অধ্যাপক ডা. ওহিদুল ইসলামসহ তিনজন এমবিবিএস ডাক্তার, ছয়জন বুয়েট থেকে পাস করা ইঞ্জিনিয়ার, দুইজন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক ও দুইজন উপসচিব পদমর্যাদাসহ দেশের বিভিন্ন জায়গায় কর্মরত রয়েছেন।
বিগত সরকারের আমলে অধ্যক্ষ হিসেবে নিয়োগ পাওয়া রমেন্দ্রনাথ বাছাড় সাময়িক (বরখাস্ত) এবং কতিপয় শিক্ষকের উদাসীনতা, লেখাপড়ার অবনতির পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের অশিক্ষাসুলভ আচরণ ও বহিরাগত ছাত্রদের মাদকের নেশায় পেয়ে বসে। হারিয়ে যেতে থাকে খেলাধুলা। সরকার পরিবর্তনের পর কলেজ পরিচালনা পর্ষদের নতুন সভাপতি তরিকুল ইসলাম যোগদানের পর থেকেই বদলে যাচ্ছে কলেজের দৃশ্যপট। এ ছাড়া ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ আব্দুস ছবুর কলেজের সুনাম ও শৃঙ্খলা ফেরাতে নিরলসভাবে কাজ করে চলেছেন।
স্থানীয় ইউপি সদস্য এহসান উল্লাহ মিলন বলেন, খেলার মাঠ সম্প্রসারণ ও লাইটিংয়ের ব্যবস্থায় খেলোয়াড়দের পদচারণা বেড়েছে।
দারিয়াপুর ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান ও বর্তমান কলেজ পরিচালনা পর্ষদের সদস্য মো. মছিহুল আজম বলেন, বিগত ১৫ বছর লেখাপড়ার অবনতির সঙ্গে কলেজ মাঠ সন্ধ্যার পর মাদকের আস্তানায় পরিণত হয়েছিল।
সাবেক শিক্ষার্থী শিক্ষক খান ওয়ালিউর রহমান মজনু বলেন, এ মাঠেই আমাদের শৈশব ও কৈশোর কেটেছে পড়ালেখার পাশাপাশি খেলাধুলায়।
ইঞ্জিনিয়ার মেহেদি হাসান বলেন, মাঠটি সম্প্রসারণের সঙ্গে আন্তঃফুটবল লীগ খেলা শুরু হয়েছে। দর্শক-শ্রোতা বেড়েছে।
বর্তমান দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী রাহাত মোল্যা বলেন, খেলার মাঠ বড় হওয়ায় খেলতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করছি। রাতে লাইটিংয়ের ব্যবস্থা ও সিসি ক্যামেরা থাকায় রাতে ব্যাডমিন্টন খেলছি।
বর্তমান কলেজ পরিচালনা পর্ষদের সভাপতি ঢাকা জজ কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী ও দুর্নীতি দমন কমিশনের পাবলিক প্রসিকিউটর মো. তরিকুল ইসলাম বলেন, আমি কলেজ পরিচালনা পর্ষদের সভাপতি নির্বাচিত হওয়ার পর দারিয়াপুর ডিগ্রি কলেজে গিয়ে সবার মতামত শুনে অবাক হয়েছি। কলেজ ক্যাম্পাস নোংরা, অগোছালো, শিক্ষকদের মধ্যে বিভেদ, শিক্ষার্থীদের কলেজে অনুপস্থিতি, পরীক্ষার ফলাফল খারাপসহ অসংখ্য অভিযোগ! কলেজ পূর্ণাঙ্গ পর্ষদ গঠন, স্থানীয় ব্যক্তিবর্গের সহযোগিতায় কলেজ ক্যাম্পাসের উন্নয়ন, শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের নিয়মিত কলেজে আসা-যাওয়া ও শৃঙ্খলা মেনে চলার নির্দেশনা প্রদান করি। কলেজ হবে জ্ঞানচর্চা ও খেলাধুলার স্থান। আগামীতে কলেজটি পূর্বের অবস্থায় নিয়ে যেতে পারবো ইনশাআল্লাহ।
প্রতিনিধি/আরএইচ