সেই ১৯৫২ সালের কথা। মানিকগঞ্জ থেকে ঢাকার সঙ্গে যোগাযোগ ব্যবস্থা ছিল একমাত্র লঞ্চ ও স্টিমার। বেউথা নদীর ঘাট তখন সরগরম। নদীতে প্রচুর পানি, স্রোতে পাড়ের ভাঙন চলছে। গোরনা, নাসকর নামে বড় দুটি স্টিমার ছিল। স্টিমার তখন কয়লার আগুনে চলত। নিচতলায় কিছু লোক নিয়োজিত থাকত । তারা খাঞ্চায় কয়লা ভরে অনবরত আগুনে নিক্ষেপ করত। ঢাকার বাড়িতে হাসিনা ফুফুর বিয়ের অনুষ্ঠান, তাই আমাদের যেতে হবে। আব্বা যাত্রার প্রস্তুতি নিলেন । হোল্ডারে বিছানা, বদনা, পানির পাত্র ইত্যাদি আব্বা দড়ি দিয়ে বাঁধতেন আর গাইতেন, ‘চলো মুসাফির বান্দ গাঠোরি আজ বিনা জানা কালভি জানা হায় ।' বাসা থেকে স্টিমার ঘাটে ঘোড়ার গাড়িতে যেতে হতো অন্য কোনো বাহনের আবির্ভাব তখনো হয়নি। এক গাড়িতে আব্বা, আম্মা, আমি আর মিনু, ঘটি, বাটি, বিছানা সব নিয়ে যাত্রা শুরু হলো। ভাঙা এবড়োথেবড়ো রাস্তা দিয়ে ঘোড়া ছুটে চলেছে আর গাড়িতে আমরা একবার ডানে-বামে সামনে-পেছনে হুমড়ি খেয়ে পড়ছি। এমনি করে বেউথা নদীর ঘাটে রাত্রিতে পৌঁছে গেলাম। কুলিকে ডেকে যাত্রীদের ভেতরে পথ করে অগ্রসর হলাম। স্টিমারে বড় বড় তকতা বিছিয়ে সিঁড়ি, তার ওপর কাপড় বিছানো। টিকিট দেখিয়ে দোতলায় চলে গেলাম। আব্বার প্রথম কাজ জায়গা দখল, এরপর চাদর বিছিয়ে তোশক, বালিশ, তারপর মশারি। ছোটখাটো ঘর হয়ে গেল, সবাই ঢুকে পড়লাম ।
রাত্রি আটটার হুইসেল দিয়ে বহু যাত্রীসহ স্টিমার চলতে শুরু করল। স্টিমারের মেশিনের আওয়াজ, যাত্রীদের কোলাহল; পান, বিড়ি, সিগারেট বিক্রেতাদের উঁচু গলার স্বর ‘পান, বিড়ি, সিগারেট লাগবে?' ক্রেতাদের হাঁকডাক, বড় বড় বাতি, বাতির চারপাশে পোকা। আব্বা-আম্মাকে বলে উৎসুক চিত্তে মশারির বাইরে চলে এলাম ও স্টিমারের রেলিংয়ের পাশে চলে এসে ঘেরাও করা পর্দা উঠালাম। তাকিয়ে দেখি স্টিমার তরতর করে এগিয়ে যাচ্ছে, দুরের গ্রামগুলোয় মিট মিট করে বাতি জ্বলছে। নদীর নৌকাগুলো ঢেউয়ের দোলায় দুলছে। আকাশপানে চেয়ে দেখি আকাশজুড়ে তারার মেলা। এসব দৃশ্যের মধ্যে আমি হারিয়ে গেলাম।
আব্বা-আম্মার ডাকে আমার সম্বিত ফিরে এল। মশারির ভেতর ঢুকে রাত্রের আহার শেষ করে শুয়ে পড়লাম, আর চারদিকের শোরগোলও তখন কমে গেছে এবং অনেকেই শুয়ে পড়েছে কেউবা তাস খেলছে। কখন যেন ঘুমের ঘোরে অজান্তে চলে গেছি। খুব ভোরে ঘুম ভেঙে গেল। হাত-মুখ ধুয়ে এক পা এক পা করে রেলিংয়ের ধারে গিয়ে পর্দা খুলে দেখি আরেক দৃশ্য, কিছুটা কুয়াশাচ্ছন্ন চারদিকের পরিবেশ, স্টিমার তখন ঢাকার কাছাকাছি পৌঁছে গেছে। ঢাকার আগের স্টেশন ফতুল্লা । গ্রাম ছেড়ে শহুরে দৃশ্যের অবতারণা। প্রথমে চেয়ে দেখি চাঁদ প্রায় হাতের কাছে ৷ মনে হয় হাত দিয়ে ছোঁয়া যাবে। নারায়ণগঞ্জ থেকে দু-একটা গাড়ি ঢাকার দিকে ছুটে আসছে। গাড়ির হেডলাইট জ্বালানোয় দালানকোঠা কুয়াশার ভেতর থেকে দৃশ্যমান হচ্ছে। ঢাকায় ঢুকছে স্টিমার। বুড়িগঙ্গা নদী, সদরঘাটে লঞ্চ চলাচল শুরু হচ্ছে। নবাববাড়ির ঘাটলা। চলে এলাম বাদামতলি । রোমাঞ্চিত বোধ করলাম গ্রাম ছেড়ে শহরে অবতরণ করব ভেবে। বড় বড় দালান, পাকা রাস্তা, খাওয়ার জন্য অনেক হোটেল আরো বড় আকর্ষণ সিনেমা ।
আমাদের বড় বাড়িতে যৌথ পরিবারের সব সদস্য, বাড়িটা গমগমে, আরো আছে ছেলেবেলার সাথীরা, আবুজার ভাইয়া, মহসীন ভাইয়া, আজমেরী, রামলুসহ সব চাচাত ভাইবোন । চোর, চোরানি খেলা, গল্প-গান সবকিছু আমায় হাতছানি দিচ্ছে। স্টিমার বাদামতলিতে ভিড়ে গেল । গাট্টি গোল করে কুলির জন্য হাঁকডাক, দরদাম স্থির করে সব যাত্রীর সঙ্গে নেমে ঘোড়ার গাড়ি ঠিক করা। এটা পুরনো আমলের ঘোড়ার গাড়ি, পালকির মতো আকারে বড়। খড়খড়ি জানালা-দরজা, বসার জায়গাও দুই দিকে। কোচওয়ানের বসার স্থান ছাদের ওপর। সামনে দুটি ঘোড়া গাড়ির সঙ্গে বাঁধা। বড় বড় চারটি চাকা। কোচওয়ান চাবুক দিয়ে সপাৎ করে ঘোড়ার পিঠে আঘাত করে। দুলকি চালে গাড়ি চলা শুরু হয়। কোচওয়ান আমাদের জিজ্ঞাসা করল, ‘কই যাবেন সাব।' আব্বা বললেন, আজিমপুর শাহ্ সাহেব বাড়ি, উত্তর দায়রা শরিফ। ‘আহেন ছাব আহেন', আমরা উঠে বসলাম । ঢাকা তখন আড়মোড়া ভাঙছে। ভিস্তিওয়ালারা রাস্তায় পানি দিচ্ছে। ঠেলাগাড়ি বের হয়েছে। দুই পাশে দোকানের পাশে লোক শুয়ে আছে। ঘোড়ার গাড়ি করে আজিমপুরের দিকে চললাম ৷
চোখে কিছু ঘুম, কিছু জাগরণী আবেশে বিভিন্ন রাস্তা অতিক্রম করে আজিমপুর এলাকায় ছাপড়া মসজিদের কাছে এলাম। এখান থেকে দায়রা শরিফের এলাকা শুরু। উঁচু প্রাচীর দিয়ে ঘেরা ভেতরে বিভিন্ন ধরনের ফলের বাগান। এখন মূল চত্বরের গেট দিয়ে ভেতরে প্রবেশ করে করলাম। বাড়ির ভেতরে আমাদের আগমন বার্তা পৌছে গেল। আমরা সবাই আমাদের আত্মীয় স্বজনের অনেক প্রিয়,তাই ছোটো বড় সবাই বের হয়ে এলো। আব্বা সোজা দাদার সংগে দেখা করতে গেলেন গদিঘরে সংগে ঘি, মাখন,মিষ্টি নিয়ে। দাদাকে সালাম করে দুই হাত জোড় করে আব্বা দাড়িয়ে রইলেন। দাদার কাছে আব্বা বায়াত হয়েছিলেন। দাদা আব্বাকে দেখে খুব খুশি। দেখাশোনা - কুশলাদি পর্ব শেষ করে বাড়িতে বড় অন্দরমহলে প্রবেশ।
লেখক: আলহাজ সৈয়দ আমিন উল্লা