জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে পূর্ব গ্রিনল্যান্ডের সামুদ্রিক বরফ দ্রুত গলে যাচ্ছে। এর ফলে এতদিন বরফে ঢাকা ও তিমির জন্য দুর্গম উপকূলীয় জলসীমায় এখন বিপুলসংখ্যক বিশাল তিমি প্রবেশ করছে। কয়েক দশক ধরে চালানো এক গবেষণায় এ পরিবর্তনের চিত্র উঠে এসেছে।
গবেষকেরা পূর্ব গ্রিনল্যান্ডের উপকূলে গ্রীষ্মকালে শত শত হাম্পব্যাক, মিনকে ও ফিন তিমিকে বরফমুক্ত সাগরে খাবার সংগ্রহ করতে দেখেছেন। ঐতিহাসিকভাবে এসব সামুদ্রিক স্তন্যপায়ী প্রাণী এ অঞ্চলে পাওয়া যেত না। উপকূলীয় জলসীমা বরফে ঢাকা থাকায় সেখানে তাদের প্রবেশের সুযোগ ছিল না। কিন্তু সমুদ্রের তাপমাত্রা বৃদ্ধি ও বরফ গলে যাওয়ার সঙ্গে নিজেদের মানিয়ে নিয়েছে তিমিগুলো।
বিজ্ঞানীরা এ ঘটনাকে আর্কটিক অঞ্চলের মৌসুমি ‘ফিডিং ফ্রেঞ্জি’ বা দলবদ্ধভাবে ব্যাপক খাদ্য গ্রহণ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তাদের মতে, এটি পূর্ব গ্রিনল্যান্ডের সামুদ্রিক পরিবেশে বড় ধরনের পরিবর্তনের অংশ।
পরিবর্তনের মাত্রা বোঝা যায় জাহাজভিত্তিক জরিপের তথ্য থেকে। ২০০৬ সাল পর্যন্ত ওই অঞ্চলে একটিও হাম্পব্যাক তিমি দেখা যায়নি। ২০০৭ সালে প্রথম সাতটি হাম্পব্যাক তিমির দেখা মেলে। এরপর সংখ্যাটি দ্রুত বাড়তে থাকে। ২০২৪ সালের জাহাজভিত্তিক জরিপে ১৫০টির বেশি হাম্পব্যাক তিমি দেখা গেছে।
পূর্ব গ্রিনল্যান্ড উপকূলে বেলিন তিমির উপস্থিতি ও সংখ্যা জানতে ২০১৫ এবং ২০২৪ সালের গ্রীষ্মে প্রথম পদ্ধতিগত আকাশ জরিপ পরিচালনা করেন গবেষকেরা। বেলিন তিমির এ গোষ্ঠীর মধ্যে ফিন, মিনকে ও হাম্পব্যাক রয়েছে। আকাশ জরিপের তথ্যের সঙ্গে স্যাটেলাইট ট্যাগ লাগানো ১৫টি তিমির গতিপথ এবং স্থানীয় ইনুইট শিকারিদের অভিজ্ঞতা যুক্ত করা হয়।
গবেষণার প্রধান গ্রিনল্যান্ড ইনস্টিটিউট অব ন্যাচারাল রিসোর্সেসের অধ্যাপক ম্যাডস পিটার হাইডে-ইয়র্গেনসেন এ পরিবর্তনকে সামুদ্রিক প্রতিবেশের ‘বড় ধরনের কাঠামোগত পরিবর্তন’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। তার ভাষ্য, উপ-আর্কটিক অঞ্চলের যেকোনো জায়গার তুলনায় এখানকার পরিবর্তন সম্ভবত সবচেয়ে আমূল।
গবেষকদের হিসাবে, ২০২৪ সালের গ্রীষ্মে গ্রিনল্যান্ড সাগরে প্রায় ৪ হাজার হাম্পব্যাক, ৬ হাজার ফিন ও ৬ হাজার মিনকে তিমি এসেছিল। সমুদ্রের তাপমাত্রা বৃদ্ধি ও খাবারের প্রাপ্যতা তিমিগুলোকে সেখানে আকৃষ্ট করছে। উষ্ণ হয়ে ওঠা পূর্ব গ্রিনল্যান্ডের জলসীমায় যেসব মাছ চলে এসেছে, সেগুলোই তিমিগুলোর প্রধান আকর্ষণ বলে ধারণা করা হচ্ছে।
গবেষকদের হিসাবে, এক গ্রীষ্মের খাদ্য গ্রহণ মৌসুমে তিন প্রজাতির তিমি অন্তত ৮ লাখ টন মাছ ও ক্রিল খেতে পারে। তবে এসব প্রজাতির মোট সংখ্যা বেড়েছে, নাকি তারা অন্য অঞ্চল থেকে পূর্ব গ্রিনল্যান্ডে স্থানান্তরিত হয়েছে—এ গবেষণা থেকে তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
পরিবর্তনটি কিছু তিমির জন্য নতুন সুযোগ তৈরি করলেও আর্কটিকের সব প্রাণীর জন্য সুখবর নয়। নারহোয়াল ও বেলুগার মতো বরফনির্ভর প্রাণী নতুন আসা বিশাল তিমিগুলোর সঙ্গে একই আবাসস্থল ভাগ করতে বাধ্য হচ্ছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে তারা নিজেদের পুরনো আবাসস্থল থেকে বিতাড়িতও হতে পারে। অধ্যাপক হাইডে-ইয়র্গেনসেন বলেন, জলবায়ু পরিবর্তন কিছু প্রজাতির জন্য নতুন সুযোগ তৈরি করলেও অন্য প্রজাতিগুলো তাদের আবাসস্থল হারাচ্ছে।
দেশবার্তা/এমআর