ব্যবহৃত ও রিকন্ডিশন্ড ইলেকট্রিক ভেহিকেল (ইভি) আমদানির ওপর নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করে শর্তসাপেক্ষে আমদানির সুযোগ দেওয়ার দাবি জানিয়েছে বাংলাদেশ রিকন্ডিশন্ড ভেহিক্যালস ইমপোর্টার্স অ্যান্ড ডিলার্স অ্যাসোসিয়েশন (বারভিডা)।
বুধবার (৯ সেপ্টেম্বর) ঢাকায় ঢাকা ক্লাবে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে সংগঠনটির পক্ষ থেকে এ দাবি জানানো হয়। এতে বারভিডার সভাপতি আবদুল হক, সাবেক সভাপতি আবদুল মান্নান চৌধুরী, সাবেক সভাপতি হাবিবুল্লাহ ডন, সাবেক সাধারণ সম্পাদক মাহাবুবুল হক চৌধুরী, হাবিবুর রহমান, শহিদুল ইসলাম, বর্তমান কমিটির সিনিয়র সহ-সভাপতি মহিবুল ইসলাম, সহ-সভাপতি হাবিবুর, ফরিদসহ সংগঠনটির কেন্দ্রীয় নেতা ও শীর্ষ ব্যবসায়ীরা উপস্থিত ছিলেন।
সংবাদ সম্মেলনে বারভিডার প্রেসিডেন্ট আবদুল হক বলেন, গত ২৪ আগস্ট প্রকাশিত নতুন আমদানি নীতিতে ব্যবহৃত ও রিকন্ডিশন্ড ইলেকট্রিক গাড়ি আমদানি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এতে সাধারণ ও মধ্যবিত্ত মানুষের নতুন প্রযুক্তির গাড়ি ব্যবহারের সুযোগ সীমিত হবে।
তিনি বলেন, নতুন ইভির দাম এখনো মধ্যবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্ত মানুষের নাগালের বাইরে। তুলনামূলক কম দামে রিকন্ডিশন্ড ইভি বাজারে পাওয়া গেলে সাধারণ মানুষের পরিবহন ব্যয় কমার পাশাপাশি দেশে বৈদ্যুতিক গাড়ির ব্যবহার দ্রুত বাড়বে।
বারভিডা জানায়, ২০০৯ সালে শুল্ক প্রণোদনাসহ নতুন হাইব্রিড গাড়ি আমদানির অনুমতি দেওয়া হলেও ব্যবহৃত ও রিকন্ডিশন্ড হাইব্রিড গাড়ি আমদানির অনুমতি ছিল না। সংগঠনটির বিভিন্ন উদ্যোগ ও তথ্য-উপাত্ত উপস্থাপনের পর ২০১৬-১৭ অর্থবছরে রিকন্ডিশন্ড হাইব্রিড গাড়ি আমদানির অনুমতি দেওয়া হয়। এর ফলে দেশে জ্বালানি সাশ্রয়ী ও পরিবেশবান্ধব গাড়ির বাজার সম্প্রসারিত হয়।
সংগঠনটির দাবি, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে শর্তসাপেক্ষে ব্যবহৃত ও রিকন্ডিশন্ড ইভি আমদানির সুযোগ রয়েছে। যুক্তরাজ্যে সর্বোচ্চ ১০ বছর, জর্জিয়ায় ছয় বছর, কেনিয়ায় আট বছর এবং সৌদি আরবে পাঁচ বছর পর্যন্ত পুরোনো ইভি আমদানি করা যায়। নিউজিল্যান্ড ও আয়ারল্যান্ডে নির্দিষ্ট বয়সসীমা ছাড়াই শর্তসাপেক্ষে আমদানির সুযোগ রয়েছে বলেও জানায় বারভিডা।
বারভিডার মতে, নিয়ন্ত্রিতভাবে রিকন্ডিশন্ড ইভি আমদানির সুযোগ দেওয়া হলে দেশে চার্জিং স্টেশন, সার্ভিসিং, ব্যাটারি ডায়াগনস্টিক ও রিসাইক্লিং খাতে বিনিয়োগ বাড়বে। একই সঙ্গে ইভি প্রযুক্তিতে দক্ষ জনবল তৈরির সুযোগ সৃষ্টি হবে।
ইভির ব্যবহার বাড়লে আমদানিনির্ভর জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমবে বলেও মনে করে সংগঠনটি। এতে দীর্ঘমেয়াদে বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়ের পাশাপাশি জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদার হবে। ইভির বাজার সম্প্রসারণ হলে ২০৩০ সালের মধ্যে মোটরযান খাতে ৩০ শতাংশ বৈদ্যুতিক গাড়ি ব্যবহারের সরকারি লক্ষ্যমাত্রা অর্জনেও তা সহায়ক হবে।
রিকন্ডিশন্ড ইভি আমদানির ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ পাঁচ বছরের বয়সসীমা নির্ধারণের প্রস্তাব দিয়েছে বারভিডা। পাশাপাশি ব্যাটারির ন্যূনতম স্টেট অব হেলথ (SOH) ৭০ শতাংশ নির্ধারণ এবং অনুমোদিত সংস্থার মাধ্যমে আমদানির আগে গাড়ি পরিদর্শন ও প্রত্যয়ন বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
বন্যা, অগ্নিকাণ্ড, গুরুতর দুর্ঘটনা বা কাঠামোগতভাবে ক্ষতিগ্রস্ত ইভি আমদানি নিষিদ্ধ করার পাশাপাশি ব্যাটারি রিসাইক্লিং ও নিরাপদ নিষ্পত্তির কাঠামো প্রণয়নেরও দাবি জানিয়েছে সংগঠনটি। একই সঙ্গে চার্জিং স্টেশন ও ইভি সার্ভিসিং খাতে বিনিয়োগে প্রণোদনা অব্যাহত রাখার প্রস্তাব দিয়েছে তারা।
সংবাদ সম্মেলনে বারভিডা জানায়, গত ৭ এপ্রিল এনবিআর শিক্ষার্থী, সাধারণ যাত্রী ও পণ্য পরিবহনের জন্য ইলেকট্রিক বাস ও ট্রাক আমদানিতে শুল্ক-কর প্রত্যাহার করে। তবে এখন পর্যন্ত এ সুবিধার আওতায় উল্লেখযোগ্য আমদানির তথ্য পাওয়া যাচ্ছে না। এ বিষয়ে সরকারের পর্যালোচনা প্রয়োজন বলেও মনে করে সংগঠনটি।
আবদুল হক বলেন, ‘আমরা সরকারের নীতির বিরোধিতা করছি না। এই শিল্পের জন্য আমাদের চাওয়া বাস্তবসম্মত, ভারসাম্যপূর্ণ ও ভবিষ্যতমুখী নীতি।’
তিনি বলেন, ‘একটি নিষেধাজ্ঞা বাজারকে থামিয়ে দিতে পারে, কিন্তু একটি সঠিক নীতি একটি শিল্পকে গড়ে তুলতে পারে।’
বারভিডার পক্ষ থেকে আমদানি নীতি আদেশের সংশ্লিষ্ট ধারা সংশোধন করে শর্তসাপেক্ষে ব্যবহৃত ও রিকন্ডিশন্ড বৈদ্যুতিক যানবাহন আমদানির সুযোগ পুনর্বহালের জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানানো হয়।
বারভিডার প্রস্তাবনায় প্রাথমিকভাবে সর্বোচ্চ পাঁচ বছর পর্যন্ত ব্যবহৃত বা রিকন্ডিশন্ড ইলেকট্রিক ভেহিকেল (ইভি) আমদানির অনুমতি দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। আমদানি করা ইভির ব্যাটারির ন্যূনতম State of Health (SOH) ৭০ শতাংশ নির্ধারণের বিষয়টিও বিবেচনার প্রস্তাব দিয়েছে সংগঠনটি।
ক্রেতাদের স্বার্থ সুরক্ষায় স্থানীয়ভাবে সংযোজিত, উৎপাদিত ও আমদানি করা নতুন ইভির ব্যাটারির আয়ুষ্কাল সম্পর্কে যথাযথ কর্তৃপক্ষের প্রত্যয়ন বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাব দিয়েছে বারভিডা। পাশাপাশি ইভি আমদানির আগে অনুমোদিত সংস্থার মাধ্যমে পরিদর্শন ও প্রত্যয়ন বাধ্যতামূলক করার কথা বলা হয়েছে।
ব্যবহৃত ইভি ব্যাটারি ব্যবস্থাপনায় Battery Recycling/Safe Disposal Framework প্রণয়নেরও প্রস্তাব রয়েছে। বারভিডার মতে, ইভির ব্যবহার বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ব্যাটারি নিরাপদে সংরক্ষণ, পুনর্ব্যবহার ও নিষ্পত্তির জন্য কার্যকর নীতিমালা প্রয়োজন।
এ ছাড়া চার্জিং স্টেশন, সার্ভিসিং, ব্যাটারি ডায়াগনস্টিক ও রিসাইক্লিং খাতে বিনিয়োগ বাড়াতে শুল্ক ও করের মাধ্যমে দেওয়া প্রণোদনা অব্যাহত রাখার প্রস্তাব দিয়েছে বারভিডা।
চলতি বাজেটে ইলেকট্রিক ভেহিকেলের জন্য নির্ধারিত মূল্যস্তরভিত্তিক শুল্ক ও কর কাঠামো সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনা করে যৌক্তিকভাবে পুনর্বিন্যাসের আহ্বান জানিয়েছে সংগঠনটি। পাশাপাশি শুল্ক কাঠামোর বিভিন্ন স্তর পুনর্নির্ধারণের প্রস্তাবও দেওয়া হয়েছে।
সবশেষে নির্দিষ্ট সময় পর ইভি আমদানি নীতির ফলাফল মূল্যায়ন করে বয়সসীমা ও অন্যান্য শর্ত পুনর্বিবেচনার প্রস্তাব দিয়েছে বারভিডা। সংগঠনটির মতে, এসব উদ্যোগ বাস্তবায়ন হলে নিরাপদ ও মানসম্মত ইভি আমদানি নিশ্চিতের পাশাপাশি দেশে চার্জিং অবকাঠামো, সার্ভিসিং, ব্যাটারি ডায়াগনস্টিক ও রিসাইক্লিং খাতে বিনিয়োগ বাড়বে।
দেশবার্তা/এমআর