আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) তাদের সদ্য প্রকাশিত ‘রিজিওনাল ইকোনমিক আউটলুক: এশিয়া অ্যান্ড প্যাসিফিক’ শীর্ষক বিশ্ব রিপোর্ট প্রকাশ করেছে। ব্যাংককে আয়োজিত এক আন্তর্জাতিক সংবাদ সম্মেলনে উঠে এসেছে যে, দেশে প্রচলিত কর্মসংস্থান ও গ্র্যাজুয়েটদের অর্জিত শিক্ষার গুণগত মানের মধ্যে এক বিশাল ফারাক বা ‘স্কিল গ্যাপ’ তৈরি হয়েছে।
বর্তমানে সাধারণ তরুণদের সামগ্রিক বেকারত্বের হার ১২ থেকে ১৩ শতাংশের মধ্যে হলেও, উচ্চশিক্ষা শেষ করা তরুণদের ক্ষেত্রে বেকারত্বের হার ২৯ শতাংশে গিয়ে ঠেকেছে। এর চেয়েও বড় বিষাদের বিষয় হলো, যেসব উচ্চশিক্ষিত তরুণ কোনো না কোনো কাজে যুক্ত হতে পারছেন, তাঁদের অন্তত অর্ধেক অর্থাৎ ৫০ শতাংশ কর্মীই তাঁদের অর্জিত ডিগ্রির চেয়ে অনেক নিম্নমানের বা অসামঞ্জস্যপূর্ণ পেশায় বাধ্য হয়ে কাজ করছেন।
উচ্চশিক্ষিত মানবসম্পদের এই চরম অপচয় দেশের সার্বিক প্রাতিষ্ঠানিক উৎপাদনশীলতাকে বড় ধরনের ধাক্কা দিচ্ছে। দীর্ঘ সময় চেষ্টা করেও নিজের পড়াশোনা ও দক্ষতার সাথে মিল রেখে উপযুক্ত চাকরি না পেয়ে বহু তরুণ শেষ পর্যন্ত কম বেতনের ও অনানুষ্ঠানিক খাতের কাজ বেছে নিতে বাধ্য হচ্ছেন।
আইএমএফের প্রতিবেদনে এই অনানুষ্ঠানিক বা ইনফরমাল খাতের ব্যাপক প্রভাবকে দেশের শ্রমবাজারের অন্যতম প্রধান দুর্বলতা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। কৃষি, পরিবহন বা ছোটখাটো ট্রেডিংয়ের মতো অনানুষ্ঠানিক খাতে নিয়োজিত বিপুল শ্রমশক্তির কোনো চাকরির আইনি নিশ্চয়তা নেই, নেই নির্দিষ্ট পেনশন বা সামাজিক সুরক্ষা। ফলে দৃশ্যমান পরিসংখ্যানের নিচে এক বড় অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা ও প্রচ্ছন্ন বেকারত্ব ঢাকা পড়ে থাকছে।
সামনে ২০২৫ থেকে ২০৩৫ সালের মধ্যবর্তী সময়টিতে দেশের ১৫ থেকে ৬৪ বছর বয়সী কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর সংখ্যা ১০ থেকে ১২ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ার পূর্বাভাস রয়েছে। অর্থনীতিতে যাকে বলা হয় ‘ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড’ বা জনমিতিক সুবিধা অর্থাৎ বৃদ্ধ বা শিশুর চেয়ে কাজের উপযোগী মানুষের সংখ্যা বেশি হওয়া।
এই বিশাল কর্মক্ষম হাতগুলোকে যদি প্রস্তুত শিল্পখাত বা আধুনিক সেবা খাতে যুক্ত করা না যায়, তবে এই সম্ভাবনা আশীর্বাদ না হয়ে চরম সামাজিক হতাশা ও অর্থনৈতিক বোঝার কারণ হয়ে দাঁড়াবে। আইএমএফ মনে করে, দেশের শিল্প খাতের বিকাশ যদি কর্মসংস্থান তৈরি করতে না পারে, তবে স্রেফ জিডিপি প্রবৃদ্ধি দিয়ে সাধারণ মানুষের ভাগ্যের কোনো বড় পরিবর্তন আসবে না।
একই সাথে শ্রমবাজারে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই (AI)-এর দ্রুত বিস্তার প্রথাগত চাকরির বাজারকে এক নতুন চ্যালেঞ্জের মুখে ঠেলে দিয়েছে। আইএমএফের হিসাব অনুযায়ী, প্রযুক্তির প্রভাবে প্রচলিত কিছু প্রশাসনিক ও ডাটা এন্টির মতো পেশায় নতুন কর্মী নিয়োগের চাহিদা প্রায় ১০ শতাংশ কমে গেছে।
বিপরীতে এআই, কোডিং ও আধুনিক কারিগরি প্রযুক্তিতে দক্ষ জনবলের চাহিদা বিশ্বজুড়ে হু হু করে বাড়ছে। সরকার যদি দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা ও কারিগরি প্রশিক্ষণ সূচকে বড় সংস্কার এনে তরুণদের আধুনিক প্রযুক্তির সাথে খাপ খাইয়ে নিতে না পারে, তবে আন্তর্জাতিক ও দেশীয় শ্রমবাজারে বাংলাদেশি তরুণদের প্রতিযোগিতা করার ক্ষমতা আরও কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
দেশবার্তা/জেএ