দেশে বিদেশি ব্যাংকগুলোর নিট মুনাফায় বড় পতন হয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্যমতে ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে ব্যাংকগুলোর নিট মুনাফা কমেছে প্রায় ৩৮ শতাংশ। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সম্প্রতিক সময়ে দেশে বিদেশি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর কার্যক্রম হ্রাস পাওয়া মুনাফায় বড় ধরনের ধাক্কা লেগেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের এক প্রতিবেদনে বিদেশি ব্যাংকগুলোর আয়, ঋণ, আমানত, মূলধন ও তারল্য পরিস্থিতির এ চিত্র উঠে এসেছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জুলাই-ডিসেম্বর সময়ে বিদেশি ব্যাংকগুলোর সম্মিলিত নিট মুনাফা ছিল ৩ হাজার ৭৩৮ কোটি টাকা। চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে তা আগের ছয় মাসের তুলনায় ১ হাজার ৪১৭ কোটি টাকা কমেছে।
এদিকে ২০২৬ সালের জানুয়ারি-জুন সময়ে বিদেশি ব্যাংকগুলোর সম্মিলিত কর-পূর্ববর্তী মুনাফা দাঁড়িয়েছে ৩ হাজার ৬৩২ কোটি টাকা। আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় এ মুনাফা কমেছে ১৮ দশমিক ৪ শতাংশ। আর ২০২৫ সালের জুলাই-ডিসেম্বর সময়ের তুলনায় কমেছে ১৭ দশমিক ৩ শতাংশ। একই সঙ্গে সম্পদ ও মূলধনের বিপরীতে মুনাফার হারও কমেছে।
মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, ব্যাংক খাত বর্তমানে কঠিন সময় পার করছে। আয় বাড়ানোর সুযোগ সীমিত থাকায় ব্যাংকগুলোর মুনাফা অর্জনের সক্ষমতা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। তিনি বলেন, ‘খেলাপি ঋণের হার ৩০ শতাংশ ছাড়িয়ে গেলে এবং সমস্যাগ্রস্ত সম্পদের পরিমাণ ৫০ শতাংশের বেশি হলে লোকসান অনিবার্য হয়ে পড়ে।’
তিনি আরও বলেন, বিশ্ববাজারে পণ্যের দাম বেড়ে যাওয়ায় আমদানির পরিমাণ কমেছে। একই সঙ্গে আমদানি ব্যয় মেটাতে বেশি বৈদেশিক মুদ্রার প্রয়োজন হচ্ছে। গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহে সংকটের কারণে উৎপাদনও ব্যাহত হচ্ছে। এতে আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম কমার পাশাপাশি ব্যাংকগুলোর আয় ও মুনাফায় নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, দেশে কার্যরত বিদেশি ব্যাংকগুলোর মোট আমানত ৮৭ হাজার ৩৭৮ কোটি ৫০ লাখ টাকা। দেশের ব্যাংক খাতের মোট আমানতের প্রায় ৪ শতাংশ এসব ব্যাংকের হাতে রয়েছে। দেশীয় ব্যাংকগুলো সাধারণ গ্রাহকদের বিস্তৃত পরিসরে সেবা দিলেও বিদেশি ব্যাংকগুলোর কার্যক্রম মূলত করপোরেট গ্রাহককেন্দ্রিক।
এসব ব্যাংকের আমানতের বড় অংশ চলতি হিসাব, সঞ্চয়ী হিসাব এবং নিবাসী বৈদেশিক মুদ্রা হিসাবে জমা রয়েছে। ফলে তুলনামূলক কম খরচে তহবিল সংগ্রহের সুযোগ পাচ্ছে ব্যাংকগুলো। ২০২৬ সালের জুন শেষে বিদেশি ব্যাংকগুলোর মোট ঋণের স্থিতি দাঁড়িয়েছে ৪৮ হাজার ৭০৪ কোটি টাকা। এক বছর আগে এ পরিমাণ ছিল ৪৮ হাজার ৩৫৫ কোটি টাকা। অর্থাৎ এক বছরে ঋণ বেড়েছে মাত্র শূন্য দশমিক ৭ শতাংশ। ঋণের প্রবৃদ্ধি সীমিত থাকলেও ব্যাংকগুলোর আমানত ও ঋণের মধ্যে ব্যবধান রয়েছে উল্লেখযোগ্য।
দেশের মোট আমানত ও ঋণে অংশ তুলনামূলক কম হলেও বৈদেশিক বাণিজ্যে অর্থায়ন, বৈদেশিক মুদ্রার লেনদেন এবং বহুজাতিক কোম্পানিগুলোকে ব্যাংকিং সেবা দেওয়ার ক্ষেত্রে বিদেশি ব্যাংকগুলোর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারি-জুন সময়ে বিদেশি ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে ৩৯৫ কোটি ডলারের রপ্তানি আয় দেশে এসেছে। এটি দেশের মোট রপ্তানি আয়ের ১৮ দশমিক ৬ শতাংশ। একই সময়ে এসব ব্যাংকের মাধ্যমে ৪৬২ কোটি ডলারের আমদানি মূল্য পরিশোধ করা হয়েছে, যা দেশের মোট আমদানি ব্যয়ের ১৩ শতাংশের বেশি।
আমদানি মূল্য পরিশোধের তুলনায় রপ্তানি আয় দেশে আনার ক্ষেত্রে বিদেশি ব্যাংকগুলোর অংশ বেশি হলেও বৈদেশিক মুদ্রার নিট অবদান নির্ভর করে অর্থপ্রবাহের প্রকৃত পরিমাণ ও অর্থ আসা-যাওয়ার সময়ের ওপর।
মুনাফা কমলেও বিদেশি ব্যাংকগুলোর মূলধন ও তারল্য পরিস্থিতি শক্তিশালী রয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশে কার্যরত ৯টি বিদেশি বাণিজ্যিক ব্যাংক ৬৭টি শাখার মাধ্যমে কার্যক্রম পরিচালনা করছে। এসব ব্যাংকের মূলধন পর্যাপ্ততা, তারল্য ও সম্পদের মান তুলনামূলক ভালো অবস্থানে রয়েছে।
২০২৬ সালের জুন শেষে বিদেশি ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণের হার বেড়ে ৬ দশমিক ৫ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। এক বছর আগে এ হার ছিল ৬ দশমিক ১ শতাংশ। তবে দেশীয় ব্যাংকগুলোর তুলনায় বিদেশি ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণের হার উল্লেখযোগ্যভাবে কম। বড় করপোরেট ঋণগ্রহীতা, বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের সহযোগী সংস্থা এবং ভালো ঋণমানসম্পন্ন রপ্তানিমুখী ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানকে ঋণ দেওয়ার কারণে এসব ব্যাংকের ঋণঝুঁকি তুলনামূলক কম বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
জুন শেষে বিদেশি ব্যাংকগুলোর মূলধন পর্যাপ্ততার অনুপাত দাঁড়িয়েছে ৪১ দশমিক ২১ শতাংশে। একই সময়ে টিয়ার-১ মূলধনের অনুপাত ছিল প্রায় ৩৯ দশমিক ৪ শতাংশ। এ ছাড়া ব্যাংকগুলোর মোট সম্পদের প্রায় অর্ধেক তরল সম্পদ। গ্রাহক আমানতের পরিমাণও মোট ঋণের তুলনায় ২৮ শতাংশের বেশি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জুন শেষে বিদেশি ব্যাংকগুলোর মোট সম্পদের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩ লাখ ১০ হাজার ৬২১ কোটি ৩০ লাখ টাকা। অর্থাৎ মুনাফায় চাপ থাকলেও মূলধন, তারল্য ও সম্পদের দিক থেকে ব্যাংকগুলো তুলনামূলক শক্ত অবস্থানে রয়েছে।
#####