ভবিষ্যতে বিনিয়োগ পাওয়ার সম্ভাবনা দেখিয়ে ঋণখেলাপি কোনো কোম্পানির অবসায়ন বা লিকুইডেশন প্রক্রিয়া আটকে রাখা যাবে না বলে পর্যবেক্ষণ দিয়েছেন হাইকোর্ট। এ-সংক্রান্ত এক মামলায় রিজেন্ট এয়ারওয়েজের মূল কোম্পানি এইচজি এভিয়েশন লিমিটেডকে অবসায়নের নির্দেশ দিয়েছেন আদালত। একই সঙ্গে অবসায়ন কার্যক্রম পরিচালনার জন্য সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার আসিফ বিন আনোয়ারকে সরকারি অবসায়ক নিয়োগ করা হয়েছে।
কোম্পানি আইন, ১৯৯৪-এর অধীনে দায়ের করা বাণিজ্যিক বিরোধসংক্রান্ত মামলায় গত ১৯ আগস্ট বিচারপতি মো. তৌফিক ইনামের একক হাইকোর্ট বেঞ্চ এ রায় দেন। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক উইলমিংটন ট্রাস্ট কোম্পানির আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে এ সিদ্ধান্ত আসে। আদালতে আবেদনকারীর পক্ষে ছিলেন আইনজীবী মো. মোক্তাদির রহমান। তবে বিবাদীপক্ষের কোনো আইনজীবী আদালতে উপস্থিত ছিলেন না।
প্রকাশিত রায়ের বিবরণ অনুযায়ী, ২০১২ সালের ১৪ ডিসেম্বর উইলমিংটন ট্রাস্ট কোম্পানি ‘মালিক ট্রাস্টি’ হিসেবে এইচজি এভিয়েশন লিমিটেডের সঙ্গে একটি উড়োজাহাজ ইজারা চুক্তি করে। রিজেন্ট এয়ারওয়েজ নামে পরিচালিত প্রতিষ্ঠানটিকে চুক্তির আওতায় একটি ব্যবহৃত বোয়িং বি৭৩৭-৭০০ উড়োজাহাজ ইজারা দেওয়া হয়।
পরবর্তী সময়ে চুক্তির শর্ত অনুযায়ী উড়োজাহাজের ইজারামূল্যসহ বিভিন্ন বকেয়া পরিশোধে ব্যর্থ হয় এইচজি এভিয়েশন। এতে পাওনা আদায়ে আইনি পদক্ষেপ নেয় উইলমিংটন ট্রাস্ট কোম্পানি। আবেদনকারীর দাবি অনুযায়ী, ২০২০ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত উড়োজাহাজ ইজারা চুক্তির অধীনে এইচজি এভিয়েশন লিমিটেডের কাছে ৩৭ লাখ ৯ হাজার ৮২৭ দশমিক ৩৮ মার্কিন ডলার বকেয়া ছিল।
এর সঙ্গে চুক্তি অনুযায়ী সুদ ও অন্যান্য পাওনাও দাবি করা হয়। বকেয়া পরিশোধের জন্য ২০২০ সালের ২৮ জানুয়ারি, ৩ ফেব্রুয়ারি ও ১৮ ফেব্রুয়ারি কোম্পানিটিকে আইনি নোটিশ পাঠানো হয়েছিল। রায়ের বিবরণে বলা হয়, বারবার তাগাদা ও আইনি নোটিশ দেওয়ার পর এইচজি এভিয়েশন তাদের আইনজীবীদের মাধ্যমে বকেয়া দায় স্বীকার করে। পাওনা পরিশোধে নতুন সময়সূচি ও কিস্তিভিত্তিক ব্যবস্থায়ও সম্মত হয় প্রতিষ্ঠানটি। কিন্তু পরবর্তী সময়ে সেই কিস্তিগুলোও পরিশোধ করতে পারেনি।
এ অবস্থায় পাওনা অর্থ আদায় ও কোম্পানিটির অবসায়নের নির্দেশনা চেয়ে কোম্পানি আইন, ১৯৯৪-এর ২৪১(৫) ও ২৪৫ ধারার অধীনে হাইকোর্টে আবেদন করে উইলমিংটন ট্রাস্ট কোম্পানি। মামলার নথিপত্র পর্যালোচনা করে আদালত বলেন, ২০১২ সালের ১৪ ডিসেম্বর দুই পক্ষের মধ্যে উড়োজাহাজ ইজারা চুক্তি সম্পাদনের বিষয়টি স্বীকৃত। আবেদনকারীর দাবির জবাবে বিবাদী কোম্পানি মূল দায় অস্বীকার করেনি; বরং বকেয়া অর্থ পরিশোধের অঙ্গীকার করেছিল। পরে কিস্তিতে অর্থ পরিশোধের ব্যবস্থায় সম্মত হলেও সেই প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে ব্যর্থ হয়েছে।
আদালতের পর্যবেক্ষণে বলা হয়, কোনো কোম্পানি ভবিষ্যতে বিনিয়োগ পেতে পারে এবং সেই অর্থ দিয়ে পাওনাদারদের ঋণ পরিশোধ করতে পারে—এমন সম্ভাবনার ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত ও বর্তমানে পরিশোধযোগ্য ঋণের ক্ষেত্রে অবসায়ন প্রক্রিয়া আটকে রাখা যায় না। তবে পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতি থেকে কোম্পানিটির বর্তমান দায় পরিশোধের বাস্তব ও বিশ্বাসযোগ্য সক্ষমতা প্রমাণিত হলে তা বিবেচনায় নেওয়া যেতে পারে।
হাইকোর্ট আরও বলেন, এইচজি এভিয়েশনকে বারবার তাগাদা দেওয়া হলেও প্রতিষ্ঠানটি সম্মত কিস্তি পরিশোধে ব্যর্থ হয়েছে। সাধারণভাবে পাওনাদারদের কাছে বিপুল পরিমাণ অর্থ দেনা থাকার বিষয়টিও কোম্পানিটি স্বীকার করেছে। এসব পরিস্থিতি বিবেচনায় আদালত মনে করেন, আবেদনকারী বকেয়া ও স্বীকৃত ঋণের বিষয়ে সুস্পষ্ট প্রমাণ উপস্থাপন করতে পেরেছে। অন্যদিকে, কোম্পানিটি তার ঋণ পরিশোধের বর্তমান ও বিশ্বাসযোগ্য সক্ষমতা প্রমাণ করতে পারেনি।
আদালতের মতে, মামলার নথিপত্র ও পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতি কোম্পানি আইন, ১৯৯৪-এর সংশ্লিষ্ট ধারাগুলোর অধীনে অবসায়নের নির্দেশ দেওয়ার যথেষ্ট ভিত্তি তৈরি করেছে। ফলে আবেদনটি মঞ্জুর করা হয়।
রায়ে এইচজি এভিয়েশন লিমিটেডকে কোম্পানি আইন, ১৯৯৪ অনুযায়ী অবসায়নের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। অবসায়ন কার্যক্রম পরিচালনার জন্য সরকারি অবসায়ক ব্যারিস্টার আসিফ বিন আনোয়ারকে অবিলম্বে দায়িত্ব গ্রহণ করতে বলা হয়েছে। আদালতের তত্ত্বাবধানে তাঁকে কোম্পানিটির সম্পদ, সম্পত্তি, হিসাবের বই, রেকর্ড ও অন্যান্য নথিপত্র নিজের জিম্মা ও নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে।
আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী, আদেশ পাওয়ার তারিখ থেকে দুই মাসের মধ্যে সরকারি অবসায়ককে বিস্তারিত প্রতিবেদন দাখিল করতে হবে। প্রতিবেদনে কোম্পানিটির সম্পদ ও দায়, স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি, পাওনাদার, কর্মচারী, শেয়ারহোল্ডার এবং অন্যান্য দাবিদারের তথ্য তুলে ধরতে হবে। অবসায়ন কার্যক্রমে সংগৃহীত নথিপত্র, গৃহীত পদক্ষেপ, কোম্পানির সম্পদ থেকে আদায় হওয়া অর্থ এবং এ কাজে হওয়া ব্যয়ের হিসাবও দিতে হবে।
এ ছাড়া কোম্পানির সম্পদ চিহ্নিতকরণ, সংরক্ষণ ও বিক্রির প্রয়োজনীয়তা, দায় নিরূপণ ও পরিশোধের করণীয় এবং অবসায়ন সম্পন্ন করতে আরও কোনো পদক্ষেপ বা আদালতের অতিরিক্ত নির্দেশনা প্রয়োজন কি না, তা প্রতিবেদনে উল্লেখ করতে হবে। চূড়ান্তভাবে কোম্পানিটির বিলুপ্তির বিষয়টি বিবেচনার আগে আদালতের আর কোনো নির্দেশনা দরকার কি না, সে সম্পর্কেও মতামত দিতে হবে।
এইচজি এভিয়েশনের পরিচালক, শেয়ারহোল্ডার, কর্মকর্তা-কর্মচারী, ব্যাংকার, বিপণনকারী, হিসাবরক্ষক, এজেন্ট ও প্রতিনিধিসহ কোম্পানির সম্পদ বা নথিপত্রের দখল ও নিয়ন্ত্রণে থাকা সংশ্লিষ্ট সবাইকে সরকারি অবসায়ককে পূর্ণ সহযোগিতা করার নির্দেশ দিয়েছেন আদালত। তাঁদের কাছে থাকা কোম্পানির হিসাব, নথিপত্র ও সম্পদ অবিলম্বে অথবা সরকারি অবসায়ক নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তাঁর কাছে হস্তান্তর করতে হবে।
রায়ে আরও বলা হয়েছে, আদালতের তত্ত্বাবধান ও পরবর্তী নির্দেশনা সাপেক্ষে আইন অনুযায়ী অবসায়ন কার্যক্রম পরিচালনা করবেন সরকারি অবসায়ক। রায় ও আদেশের অনুলিপি প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য যৌথ মূলধন কোম্পানি ও ফার্মসমূহের পরিদপ্তরের রেজিস্ট্রার এবং সরকারি অবসায়কের কাছে পাঠানোর নির্দেশও দেওয়া হয়েছে।
দেশবার্তা/জেএ