দিনাজপুরের ফুলবাড়ীতে শারদীয় দুর্গাপূজার বিজয়া দশমী উপলক্ষে বুধবার (২১ অক্টোবর) শতবর্ষী ঐতিহ্যবাহী দুর্গামেলা অনুষ্ঠিত হয়েছে। ফুলবাড়ী শহরের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত ছোট যমুনা নদীর পশ্চিম পাড়ে ফুলবাড়ী সরকারি কলেজ মাঠে এ মেলার আয়োজন করা হয়।
বিজয়া দশমী উপলক্ষে সকাল থেকেই বিভিন্ন পূজামণ্ডপে দেবী দুর্গাকে বিদায় জানাতে পূজার্চনার পাশাপাশি নারীরা সিঁদুরখেলায় অংশ নেন। প্রতিমা বিসর্জনকে কেন্দ্র করে দুপুর থেকে সব বয়সী নারী-পুরুষের পদচারণায় মুখর হয়ে ওঠে সরকারি কলেজ মাঠের দুর্গামেলা।
মেলায় গিয়ে দেখা যায়, শাঁখা, সিঁদুর, চুড়ি, মালা, রামায়ণ ও মহাভারতসহ হিন্দুধর্মের বিভিন্ন বিষয়ের বই, শিশুদের খেলনা, মিষ্টান্ন, প্রসাধনসামগ্রী, গ্রামবাংলার ঐতিহ্যবাহী মুখরোচক খাবার, মাটির তৈরি শোপিস ও মৌসুমি ফলসহ নানা পণ্যের পসরা সাজিয়েছেন মৌসুমি ব্যবসায়ীরা। এ ছাড়া ঘরের শোভাবর্ধনের বিভিন্ন উপকরণও বিক্রি হচ্ছে। এসব পণ্য কিনতে দূরদূরান্ত থেকে ক্রেতারা মেলায় ভিড় জমান।
মেলায় আসা উপজেলার শিবনগর ইউনিয়নের গোপালপুর গ্রামের জ্যোতিশ চন্দ্র রায় (৬৮) বলেন, ছোটবেলায় বাবার সঙ্গে মেলায় আসতেন তিনি। এখন নাতি-নাতনিদের নিয়ে মেলায় এসেছেন। অতীতে ফুলবাড়ীর জমিদারেরা বিজয়া দশমীর দিনে এ মেলার আয়োজন করতেন। সেই থেকে মেলাটি নিজস্ব ধারায় চলে আসছে। শতবর্ষী এই ঐতিহ্যবাহী মেলা সবার কাছে পরিচিত।
তিনি বলেন, মেলায় এলে দুটি লাভ হয়। একদিকে পৌর এলাকার প্রায় সব কটি দেবী দুর্গার প্রতিমা দেখা যায়, অন্যদিকে কেনাকাটাও করা যায়। কেনাকাটার মধ্যে গুড়ের জিলাপি থাকবেই।
ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সনাতন ধর্মাবলম্বী কলেজশিক্ষার্থী অমলী হেম্ব্রম (২২) বলেন, সপ্তম শ্রেণিতে পড়ার সময় থেকে বড় ভাইয়ের সঙ্গে মেলায় আসা শুরু করেন তিনি। এরপর থেকে প্রতি বছরই মেলায় আসেন। মেলায় এসে দেবী দুর্গার দর্শনের পাশাপাশি বাড়ির জন্য গুড়ের জিলাপি ও পছন্দের কিছু জিনিস কেনেন।
মেলায় খেলনা টমটম বিক্রি করতে আসা নবাবগঞ্জের আসাদুল ইসলাম বলেন, দীর্ঘ ৪২ বছর ধরে তিনি এ মেলায় টমটম বিক্রি করছেন। আগে বাবার সঙ্গে মেলায় আসতেন। বাবার মৃত্যুর পর তাঁর ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছেন।
ফুলবাড়ী উপজেলা কেন্দ্রীয় শ্রীশ্রী শ্যামা কালী মন্দির পরিচালনা কমিটির সভাপতি ও সাবেক পৌর কাউন্সিলর জয় প্রকাশ গুপ্ত, জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি সহকারী অধ্যাপক অমর চাঁদ গুপ্ত অপু এবং সাধারণ সম্পাদক জয় রাম প্রসাদ বলেন, শতবর্ষী এই ঐতিহ্যবাহী মেলা বিজয়া দশমীতে প্রতিমা বিসর্জনের দিন চিরাচরিত নিয়মে অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে। মেলায় ফুলবাড়ী উপজেলাসহ আশপাশের এলাকার অন্তত ১০ হাজার মানুষের সমাগম ঘটে। সনাতন ধর্মাবলম্বী ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সব বয়সী নারী-পুরুষেরও ব্যাপক উপস্থিতি থাকে। মেলাটি ফুলবাড়ীর ঐতিহ্য। এটি ধরে রাখার দায়িত্ব সবার।
ফুলবাড়ী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. শহিদুল ইসলাম বলেন, শারদীয় দুর্গোৎসবের শুরু থেকে বুধবার (২১ অক্টোবর) শেষ দিন পর্যন্ত শান্তি ও শৃঙ্খলা বজায় রাখতে সবার সহযোগিতায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী যথাযথভাবে দায়িত্ব পালন করেছে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মাসুম বিল্লাহ বলেন, সনাতন ধর্মাবলম্বীদের শারদীয় দুর্গাপূজার বিজয়া দশমী উপলক্ষে সরকারি কলেজ মাঠে আয়োজিত শতবর্ষী দুর্গামেলার সার্বিক নিরাপত্তায় পুলিশ সদস্যদের পাশাপাশি উপজেলা প্রশাসন সার্বক্ষণিক নজরদারি রেখেছে। শারদীয় দুর্গোৎসবের শুরু থেকে উপজেলা প্রশাসনের পাশাপাশি বিজিবি, পুলিশ ও আনসার সদস্যরাও দায়িত্ব পালন করেছেন।
প্রতিনিধি/আরএইচ