তৈরি পোশাক রপ্তানিতে প্রবৃদ্ধি থাকলেও সংকট কাটছে না দেশের প্রধান রপ্তানি খাতে। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) হিসাবে, চলতি অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে (জুলাই-সেপ্টেম্বর) এ খাতের রপ্তানি আয় বেড়েছে ৬ দশমিক ১০ শতাংশ। তবে খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, আগের বছরের তুলনামূলক কম রপ্তানির কারণে প্রবৃদ্ধির হার বেশি দেখাচ্ছে। বাস্তবে মাসের ব্যবধানে রপ্তানি আয় কমেছে ধারাবাহিকভাবে। জ্বালানি সংকট, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, সময়মতো পণ্য জাহাজীকরণের চাপ এবং ক্রেতাদের আস্থা ধরে রাখার চ্যালেঞ্জে চাপে রয়েছেন রপ্তানিকারকেরা। এর মধ্যে ছোট ও মাঝারি কারখানার সক্ষমতা কমে যাওয়ায় উদ্বেগ বাড়ছে।
ইপিবির সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, জুলাই-সেপ্টেম্বর সময়ে তৈরি পোশাক রপ্তানি থেকে আয় হয়েছে ১ হাজার ৫৮ কোটি ডলার। গত অর্থবছরের একই সময়ে এ আয় ছিল ৯৯৭ কোটি ডলার। সে হিসাবে প্রবৃদ্ধি ৬ দশমিক ১০ শতাংশ। সেপ্টেম্বরে আগের বছরের একই মাসের তুলনায় রপ্তানি বেড়েছে ৮ দশমিক ৫৬ শতাংশ।
তবে মাসভিত্তিক হিসাব ভিন্ন চিত্র তুলে ধরছে। চলতি বছরের জুলাইয়ে তৈরি পোশাক রপ্তানি থেকে আয় হয়েছিল ৩৮৮ কোটি ৬৭ লাখ ডলার। আগস্টে তা কমে দাঁড়ায় ৩৬০ কোটি ৮৮ লাখ ডলারে, যা জুলাইয়ের তুলনায় ৭ দশমিক ১৫ শতাংশ কম। সেপ্টেম্বরে রপ্তানি আয় আরও কমে ৩০৮ কোটি ২৯ লাখ ডলারে নেমে আসে। আগস্টের তুলনায় এ পতন ১৪ দশমিক ৫৭ শতাংশ।
বাংলাদেশ গার্মেন্ট ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিজিএমইএ) সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বলেন, আগের বছরের একই সময়ে রপ্তানি কম থাকায় এবার প্রবৃদ্ধি বেশি দেখা যাচ্ছে। এ পরিসংখ্যান দিয়ে ব্যবসায়িক পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে বলে সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যাবে না।
তিনি বলেন, সময়মতো পণ্য পাঠাতে গিয়ে বাড়তি ব্যয় বহন করতে হচ্ছে রপ্তানিকারকদের। এতে আর্থিক ক্ষতি হচ্ছে। তাই রপ্তানির পরিমাণ বা আয়ের হিসাবের পাশাপাশি অতিরিক্ত ব্যয়ের বিষয়টিও বিবেচনায় নেওয়া জরুরি।
মাহমুদ হাসান খান জানান, জুলাই, আগস্ট ও সেপ্টেম্বরে জ্বালানি সংকট ছিল পোশাক কারখানাগুলোর অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ। পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হলেও সংকট পুরোপুরি কাটেনি। আগে যেখানে দৈনিক ৮ থেকে ১০ ঘণ্টা কাজ করে পণ্য উৎপাদন ও জাহাজীকরণ করা যেত, সেখানে এখন সময়মতো পণ্য পাঠাতে ১২ থেকে ১৩ ঘণ্টা পর্যন্ত কাজ করতে হচ্ছে। ফলে শ্রমিকদের অতিরিক্ত মজুরি দিতে হচ্ছে। পাশাপাশি ডিজেল কিনতে হচ্ছে, বাড়তি গ্যাস ব্যবহার করতে হচ্ছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে পণ্য আকাশপথে পাঠানোর প্রয়োজনও হচ্ছে, যা অনেক বেশি ব্যয়বহুল।
বিজিএমইএ সভাপতি বলেন, সময়মতো পণ্য পাঠানো এবং ক্রেতাদের আস্থা ধরে রাখতে রপ্তানিকারকদের এসব বাড়তি ব্যয় মেনে নিতে হচ্ছে। কারণ, ক্রেতাদের আস্থা নষ্ট হলে ভবিষ্যতে নতুন অর্ডার হারানোর ঝুঁকি তৈরি হবে।
বিজিএমইএর সহসভাপতি ও এমিটি ডিজাইনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শিহাব উদ্দোজা চৌধুরী বলেন, গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটের কারণে অধিকাংশ কারখানা তাদের সক্ষমতা অনুযায়ী উৎপাদন করতে পারেনি। ইপিবির হিসাবে আগের বছরের একই সময়ের সঙ্গে তুলনা করে প্রবৃদ্ধি নির্ধারণ করা হয়। গত বছর ওই সময়ে রপ্তানি কম থাকায় এবার প্রবৃদ্ধি বেশি দেখাচ্ছে। তাঁর মতে, বর্তমানে যে রপ্তানি আয় হচ্ছে, তা স্বাভাবিক সময়ের গড় আয় থেকেও কম।
এদিকে ইপিবির তথ্য অনুযায়ী, ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের মতো প্রধান বাজারের পাশাপাশি অপ্রচলিত বাজারেও বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানি বেড়েছে। জুলাই-সেপ্টেম্বর সময়ে এসব বাজারে রপ্তানি বেড়েছে ৯ দশমিক ৪০ শতাংশ। ফলে মোট তৈরি পোশাক রপ্তানিতে অপ্রচলিত বাজারের হিস্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৭ দশমিক ১৩ শতাংশ।
তবে রপ্তানি প্রবৃদ্ধির পরিসংখ্যান নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) নির্বাহী সভাপতি ফজলে শামীম এহসান। তিনি বলেন, আগস্টজুড়েই জ্বালানি সংকট ছিল। আগের বছরের একই সময়ে রপ্তানি কম থাকায় এবার প্রবৃদ্ধি বেশি দেখা যাচ্ছে। তবে এ তথ্য আগের সময়ের মতো উদ্ভাবিত—এমনটি তিনি বিশ্বাস করতে চান না।
ফজলে শামীম এহসান বলেন, বড় কারখানাগুলো আর্থিক ক্ষতি মেনে নিয়ে বিপুল পরিমাণ ডিজেল ও নিজস্ব উৎস থেকে এলপিজি কিনে উৎপাদন চালু রেখেছে। এতে উৎপাদনের ধারাবাহিকতা কিছুটা বজায় রাখা সম্ভব হয়েছে এবং রপ্তানিও অব্যাহত ছিল। কিন্তু সামগ্রিক পরিস্থিতি ভিন্ন।
তিনি বলেন, শুধু রপ্তানির পরিসংখ্যান দিয়ে খাতের প্রকৃত অবস্থা বোঝা সম্ভব নয়। কর্মসংস্থান বাড়ছে কি না এবং কারখানার সংখ্যা বাড়ছে নাকি কমছে, তা-ও বিবেচনায় নিতে হবে। বর্তমানে বড় কারখানাগুলো আরও বড় হচ্ছে, অন্যদিকে ছোট ও মাঝারি কারখানাগুলো বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। এ প্রবণতা শুধু রপ্তানি খাত নয়, সামগ্রিক অর্থনীতির জন্যও উদ্বেগজনক। অর্থনীতির বিকাশে ছোট ও মাঝারি শিল্পপ্রতিষ্ঠানের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ।
ফজলে শামীম এহসানের মতে, কারখানাগুলো উৎপাদন ও রপ্তানি ধরে রাখতে পারছে কি না, ব্যবসায় টিকে থাকার সক্ষমতা বাড়ছে কি না এবং আর্থিক সুরক্ষা নিশ্চিত হচ্ছে কি না, সেদিকে নজর দেওয়া প্রয়োজন।
ইপিবির তথ্য অনুযায়ী, জুলাই-সেপ্টেম্বর সময়ে ওভেন পোশাকের রপ্তানি আয় বেড়েছে ৫ দশমিক ১১ শতাংশ। নিট পোশাকের ক্ষেত্রে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৬ দশমিক ৮৮ শতাংশ।
অন্যদিকে, বিকেএমইএর তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত সাত মাসে ইউরোপের বাজারে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানি কমেছে ১৩ দশমিক ৬৫ শতাংশ। এর মধ্যে নিট পোশাক রপ্তানি কমেছে ১৪ দশমিক ২৯ শতাংশ। সংগঠনটির মতে, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দা, চাহিদা সংকোচন, মূল্যস্ফীতি এবং দেশীয় রপ্তানিকারকদের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা কমে যাওয়ায় ইউরোপের বাজারে এ পতন হয়েছে।
দেশবার্তা/এমআর