জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে বছরের পর বছর ধরে চলে আসা সরকারি ও রোগীদের কেনা জীবনরক্ষাকারী ওষুধ চুরির কারবার বন্ধ হচ্ছে না। এ নিয়ে বিভিন্ন সময়ে তদন্ত কমিটি গঠন, অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা এবং দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়ার ঘটনা ঘটলেও আড়ালে সক্রিয় রয়েছে অসাধু চক্র। সর্বশেষ হাসপাতালের বিভিন্ন বিভাগ, বিশেষ করে করোনারি কেয়ার ইউনিটের (সিসিইউ) কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারীকে ঘিরে নতুন করে ওষুধ সরিয়ে ফেলা ও চুরির অভিযোগ উঠেছে।
রোগীদের স্বজনরা অভিযোগ করেন, চিকিৎসার জন্য হাজার হাজার টাকার ওষুধ কিনে দেওয়ার পরও সেই ওষুধ রোগীর শরীরে প্রয়োগ না করে সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে। স্বজনদের অসহায়ত্বের সুযোগ নিয়ে ৫ থেকে ১০ হাজার টাকার বাড়তি ও অপ্রয়োজনীয় ওষুধ কিনতে বাধ্য করা হয়। এমনকি নতুন সামগ্রী ব্যবহার না করে পুরোনো ব্যবহৃত চিকিৎসাসামগ্রী দিয়ে কাজ চালিয়ে নেওয়ারও অভিযোগ রয়েছে। পরবর্তীতে নতুন কেনা সামগ্রীগুলো বাইরে বিক্রি করে বিপুল পরিমাণ টাকা হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে। মূলত ওয়ার্ড বয়, নার্স, কর্মকর্তা ও বাইরের ফার্মেসির লোকজনের যোগসাজশে এ সিন্ডিকেট পরিচালিত হয়।
সর্বশেষ ২০২৬ সালের ৯ অক্টোবর প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে রোগীদের কেনা অপারেশনের ওষুধ বাইরে বিক্রি এবং ফার্মেসিতে ফেরত পাঠানোর অভিযোগে ১৪ জন কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধে প্রশাসনিক পদক্ষেপ ও তদন্তের তথ্য জানানো হয়। সে সময় ছয়জন সিনিয়র স্টাফ নার্সকে প্রত্যাহার করে মেট্রোনের দপ্তরে ন্যস্ত করা হলেও কর্মচারীদের চুরি থামেনি।
অভিযোগের কেন্দ্রে ওয়ার্ড বয় ও নার্সরা
সিসিইউ-১-এর ওয়ার্ড বয় আবু বক্কর ওরফে লিটনকে ঘিরে গুরুতর অভিযোগ তুলেছেন সংশ্লিষ্ট সূত্র ও রোগীদের স্বজনেরা। জানা যায়, রোগীদের কেনা ওষুধ ও চিকিৎসাসামগ্রী সরিয়ে নেওয়ার একাধিক অভিযোগের পর সাবেক পরিচালক অধ্যাপক ডা. মীর জামাল উদ্দীন তাঁকে প্রায় দুই বছর সিসিইউর দায়িত্ব থেকে সরিয়ে রেখেছিলেন। ওয়ার্ড মাস্টারদেরও নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল, তাঁর দায়িত্বকাল পর্যন্ত যেন লিটনকে সিসিইউতে ডিউটি দেওয়া না হয়। তবে সাবেক পরিচালক চলে যাওয়ার পর কয়েকজন চিকিৎসকের সঙ্গে যোগসাজশ ও তদবিরের মাধ্যমে লিটন আবারও সিসিইউতে দায়িত্ব ফিরে পান। এরপর আগের মতোই অনিয়মে জড়িয়ে পড়ার অভিযোগ ওঠে তাঁর বিরুদ্ধে।
এবার তাঁর সহযোগী হিসেবে নার্স সবুজ ও নার্স লিখনের নাম সামনে এসেছে। এই তিনজনকে ঘিরে সিসিইউতে রোগীদের কেনা ওষুধ এবং চিকিৎসাসামগ্রী সরিয়ে নেওয়ার একটি চক্র সক্রিয় রয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে। এছাড়া লিটন বিভিন্ন সময় দাবি করেন তাঁর উপস্থিতি ছাড়া অনেকে চিকিৎসা পান না, যা বিভ্রান্তিকর এবং প্রভাব বিস্তারের কৌশল বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
চিকিৎসা য় পুরনো সামগ্রী ব্যবহার।
সিসিইউ-১-এর দুটি ভিডিওর সূত্রে অভিযোগকারীরা দাবি করেছেন, সেখানে চিকিৎসকের পরিবর্তে ওয়ার্ড বয় লিটনকে রোগীর শরীর থেকে পানি বের করার প্রক্রিয়ায় অংশ নিতে দেখা গেছে। একজন শিশু ও একজন নারী রোগীর ক্ষেত্রে এমন ঘটনা ঘটে। ওই দুই রোগীর জন্য সিভিপি সেটসহ প্রায় ১৪ হাজার টাকার চিকিৎসাসামগ্রী কেনা হলেও নতুন সিভিপি সেট ব্যবহার না করে অন্য রোগীর ব্যবহৃত পুরোনো সেট ব্যবহারকরে এবং নতুন কেনা সামগ্রী সরিয়ে নেয়। চিকিৎসক ও নার্সদের না ডেকেলিট ননিজেই চিকিৎসাসংক্রান্ত কাজ করেএবিষয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
প্যাথিডিন চুরির অভিযোগ
সিসিইউ-২-এর ইনচার্জ রোকসানা মনোয়ারের বিরুদ্ধে সরকারি প্যাথিডিন ওষুধ ব্যবস্থাপনায় অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। নার্স অনুপম, রুবেল ও ওয়ার্ডবয় খিতিশের সঙ্গে যোগসাজশে সরকারি প্যাথিডিন ও রোগীদের কেনা ওষুধের মধ্যে অনিয়ম করা হচ্ছে। ইনচার্জ সরকারি প্যাথিডিন দিয়ে যাওয়ার পর রোগীদের স্বজনেরা বাইরে থেকে প্যাথিডিন কিনে আনলে সেই ওষুধ না দিয়ে সরকারি ওষুধ ব্যবহার করা হয়। পরে রোগীদের কেনা প্যাথিডিন বাইরে বিক্রি করে দেওয়া হয়। এক্ষেত্রে সরকারি প্যাথিডিনের স্টকেও কোনো সঠিক হিসাব রাখা হয় না বলে দাবি উঠেছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী ২০২৬ সালের অক্টোবরে সিসিইউ-২-এর অনুপম, রুবেল ও ওয়ার্ডবয় খিতিশের নাম অভিযোগের প্রসঙ্গে এলেও কাজের কাজ কিছুই হয়নি।
হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা অধিকাংশ রোগীই আর্থিক ও শারীরিকভাবে বিপর্যস্ত। তাদের রক্ত পানি করা টাকায় কেনা ওষুধ চুরির হাত থেকে বাঁচাতে হাসপাতালের প্রতিটি সিসিইউতে ওষুধ গ্রহণ, সংরক্ষণ ও ব্যবহারের পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল হিসাব চালুসহ অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগীরা।
সিসিইউ-২ এর ইনচার্জ রোকসানা মনোয়ারের বিরুদ্ধে সরকারি প্যাথিডিন ওষুধ ব্যবস্থাপনায় অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। নার্স অনুপম, রুবেল ও ওয়ার্ডবয় খিতিশের সঙ্গে যোগসাজশে সরকারি প্যাথিডিন ও রোগীদের কেনা ওষুধের মধ্যে অনিয়ম করা হচ্ছে। ইনচার্জ সরকারি প্যাথিডিন রেখে যাওয়ার পর রোগীদের স্বজনেরা বাইরে থেকে প্যাথিডিন কিনে আনলেও সেই ওষুধ না দিয়ে সরকারি ওষুধ ব্যবহার করা হয় এবং পরবর্তীতে রোগীদের কেনা প্যাথিডিন বাইরে বিক্রি করে দেওয়া হয়। এক্ষেত্রে সরকারি প্যাথিডিনের স্টকেও কোনো সঠিক হিসাব রাখা হয় না। ২০২৬ সালের অক্টোবরে সিসিইউ-২এর কয়েকজনের নাম অভিযোগের প্রসঙ্গে এলেও কোনো দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।
এছাড়া সিসিইউ-২ এর সিকিউরিটি গার্ড নিজাম, ওয়ার্ড মাস্টার বাহার উদ্দিন ও বেল্লালের বিরুদ্ধে নানা অনিয়মের অভিযোগ তুলেছেন ভুক্তভোগীরা।
অভিযোগ রয়েছে, ওয়ার্ড মাস্টার বাহার উদ্দিন ও বেল্লাল আওয়ামী লীগপন্থী চিকিৎসক নেতা ডা. জুলফিকার আলি লেলিন ও কাজলের সহযোগী ছিলেন এবং ছাত্র-জনতার আন্দোলনের সময় গুলিবিদ্ধ রোগীদের চিকিৎসাসেবা প্রদানে বাধা সৃষ্টি করতেন। বর্তমান প্রশাসনের কর্তাব্যক্তিদের সঙ্গে নতুন করে সখ্য গড়ে তুলে তারা পার পেয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা অধিকাংশ রোগী আর্থিক ও শারীরিকভাবে বিপর্যস্ত। তাদের কষ্টার্জিত অর্থে কেনা ওষুধ চুরির হাত থেকে বাঁচাতে হাসপাতালের প্রতিটি সিসিইউতে ওষুধ গ্রহণ, সংরক্ষণ ও ব্যবহারের পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল হিসাব চালুসহ অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগীরা।