বর্ষার প্রথম বৃষ্টিতে দক্ষিণ বাংলার প্রকৃতি যেন নতুন করে প্রাণ ফিরে পায়। সেই প্রাণের সবচেয়ে মোহময় রূপগুলোর একটি দেখা যায় ঝালকাঠির ভিমরুলী, কীর্তিপাশা, আটঘর, কুড়িয়ানা ও আশপাশের বিস্তীর্ণ পেয়ারা বাগানে। জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর- এই তিন মাস সবুজ পাতার ফাঁকে ঝুলে থাকা কাঁচা-পাকা পেয়ারা, খালজুড়ে সারি সারি নৌকা আর ভাসমান হাট মিলিয়ে পুরো এলাকা যেন রূপ নেয় এক জল-সবুজের রাজ্যে।
দেশের সবচেয়ে বড় পেয়ারা উৎপাদন অঞ্চল হিসেবে পরিচিত ঝালকাঠি ও পিরোজপুর জেলার চারটি ইউনিয়নজুড়ে বিস্তৃত এই অঞ্চল শতবর্ষের কৃষি ঐতিহ্য বহন করে চলেছে। একই সঙ্গে কৃষিভিত্তিক পর্যটনের অন্যতম আকর্ষণ হিসেবেও এর জনপ্রিয়তা বাড়ছে বছর বছর। বর্ষা শুরু হলেই দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে হাজারো মানুষ ছুটে আসেন এই ভাসমান পেয়ারার হাট দেখতে।
ভোরের আলো ফুটতেই ভিমরুলী, কীর্তিপাশা, আটঘর ও কুড়িয়ানার খালগুলো প্রাণচাঞ্চল্যে ভরে ওঠে। ছোট-বড় শত শত ডিঙি নৌকায় সাজানো থাকে টাটকা সবুজ ও সোনালি পাকা পেয়ারা। নৌকার ওপরই চলে পাইকারি ও খুচরা বেচাকেনা। খালের দুই তীরেও বসে মৌসুমি হাট। প্রকৃতির বুকের ওপর গড়ে ওঠা এই ভাসমান বাজার বাংলাদেশের কৃষি ঐতিহ্যের এক অনন্য নিদর্শন, যা দেশি-বিদেশি পর্যটকদের কাছে সমান আকর্ষণের।
স্থানীয় কৃষক পুলক হালদার, বিমল রায়, সুজন হালদার, নজরুল হাওলাদার ও মোশাররফ মল্লিক জানান, অতিবৃষ্টির কারণে চলতি মৌসুমে কিছু বাগানে ক্ষতির আশঙ্কা তৈরি হলেও সামগ্রিকভাবে ফলন সন্তোষজনক। বাজারেও মিলছে ভালো দাম। বর্তমানে প্রতি মণ পেয়ারা বিক্রি হচ্ছে ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৫০০ টাকায়। এখান থেকে নৌকা ও ট্রাকযোগে দেশের বিভিন্ন জেলায় সরবরাহ করা হচ্ছে মৌসুমি এই ফল।
শুধু কৃষিই নয়, এই মৌসুমকে ঘিরে চাঙা হয়ে উঠেছে স্থানীয় পর্যটন অর্থনীতিও। প্রতিদিন শত শত পর্যটক পরিবার কিংবা বন্ধুদের নিয়ে নৌকাভ্রমণে বের হচ্ছেন। কেউ খালের বুক চিরে এগিয়ে চলা নৌকায় বসে উপভোগ করছেন সবুজে ঘেরা পেয়ারা বাগান, কেউ আবার কৃষকদের কাছ থেকে সরাসরি বাগান থেকেই কিনে নিচ্ছেন টাটকা পেয়ারা। নৌভ্রমণ, স্থানীয় খাবার, গাইডিং সেবা এবং পর্যটনকেন্দ্রিক ছোট ছোট ব্যবসার মাধ্যমে অনেক মানুষের কর্মসংস্থানও সৃষ্টি হয়েছে।
ঢাকা থেকে বেড়াতে আসা কয়েকজন পর্যটক জানান, বর্ষাকালে ভিমরুলীর ভাসমান পেয়ারা হাট, সবুজে ঘেরা জলপথ এবং নির্মল প্রাকৃতিক পরিবেশ বারবার তাদের টেনে আনে। কৃষি, প্রকৃতি ও নৌজীবনের এমন অপূর্ব সমন্বয় দেশের অন্য কোথাও খুব একটা দেখা যায় না বলেও তারা মনে করেন।
ঝালকাঠি সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সেগুফতা মেহনাজ বলেন, ভাসমান পেয়ারার বাজার এখন দেশের অন্যতম আকর্ষণীয় পর্যটন গন্তব্যে পরিণত হয়েছে। পর্যটকদের নিরাপত্তা, পরিচ্ছন্ন পরিবেশ এবং নির্বিঘ্ন নৌযান চলাচল নিশ্চিত করতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, এই ঐতিহ্য সংরক্ষণ ও আরও বিকশিত করতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। কৃষিভিত্তিক পর্যটনের সম্প্রসারণ, পেয়ারা প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পের বিকাশ এবং কার্যকর ব্র্যান্ডিংয়ের মাধ্যমে ঝালকাঠির অর্থনীতিতে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত হতে পারে।
তাঁর ভাষায়, ঝালকাঠির পেয়ারা শুধু একটি ফল নয়; এটি এ অঞ্চলের ইতিহাস, সংস্কৃতি, জীবনধারা ও মানুষের স্বপ্নের প্রতীক। তাই এই ঐতিহ্য টিকিয়ে রাখতে কৃষকদের স্বার্থ সংরক্ষণ এবং পর্যটন ব্যবস্থাপনাকে আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন।
বর্ষার এই তিন মাসে ভিমরুলী, আটঘর, কুড়িয়ানা ও আশপাশের বিস্তীর্ণ পেয়ারা বাগান হয়ে ওঠে প্রকৃতি, কৃষি ও মানুষের জীবিকার এক অনন্য মিলনমেলা। শতবর্ষের এই ভাসমান পেয়ারার হাট আজ শুধু স্থানীয় অর্থনীতির চালিকাশক্তিই নয়; বাংলাদেশের গ্রামীণ ঐতিহ্য, কৃষিনির্ভর জীবন ও সম্ভাবনাময় কৃষি-পর্যটনের এক উজ্জ্বল প্রতীক।
প্রতিনিধি/একে