সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও অর্থপাচারের নতুন অভিযোগ পেয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। অভিযোগে বিভিন্ন নিয়োগ, পদায়ন ও উন্নয়ন প্রকল্পে অর্থ লেনদেনের পাশাপাশি বিদেশে ১১ হাজার কোটি টাকা পাচারের কথা বলা হয়েছে। এসব অভিযোগ আগে থেকে চলমান অনুসন্ধানের সঙ্গে যুক্ত করে খতিয়ে দেখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে দুদক।
রোববার দুদকের প্রধান কার্যালয়ে সাংবাদিকদের এসব তথ্য জানান সংস্থাটির জনসংযোগ বিভাগের সহকারী পরিচালক তানজির আহমেদ। তিনি বলেন, উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালনের সময় আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক নিয়োগ, জেলা প্রশাসক পদায়ন, বিভিন্ন সিটি করপোরেশন ও স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের উন্নয়ন প্রকল্পের দরপত্র, নিয়োগ, বদলি ও পদোন্নতিতে অর্থ লেনদেনের অভিযোগ এসেছে।
দুদকের নথি অনুযায়ী, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক নিয়োগে প্রায় ৬০ কোটি টাকা এবং সারা দেশে ৩৬ জন জেলা প্রশাসক পদায়নে ২ কোটি থেকে ১০ কোটি টাকা পর্যন্ত লেনদেনের অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া ঢাকা ওয়াসা, স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর ও গাজীপুর সিটি করপোরেশনে কর্মকর্তাদের নিয়োগে অর্থ লেনদেনের অভিযোগ করা হয়েছে। এসব চার নিয়োগে অভিযোগের মোট অর্থের পরিমাণ ১৮৭ কোটি টাকা বলে নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
এছাড়া বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের দরপত্র থেকে ১০ থেকে ৩০ শতাংশ কমিশন নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন, নারায়ণগঞ্জ ও কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের দরপত্র কার্যক্রমেও সম্পৃক্ততার অভিযোগ করা হয়েছে। গ্রামীণ অবকাঠামো ও সেতু নির্মাণ প্রকল্পের ব্যয় বাড়িয়ে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগও রয়েছে।
অভিযোগে কুমিল্লার মুরাদনগরে গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পে ৪৫৩ কোটি টাকা বরাদ্দ ও অর্থ ছাড়ের প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে। পাশাপাশি ঢাকা ওয়াসার সায়েদাবাদ পানি শোধনাগার প্রকল্পের তৃতীয় ধাপে অস্বাভাবিকভাবে ব্যয় বাড়ানো এবং শেখ রাসেল মিনি স্টেডিয়াম প্রকল্পে ১ হাজার ২০০ কোটি টাকা ব্যয় বাড়িয়ে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ করা হয়েছে।
যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ে নিয়োগ, বদলি ও পদোন্নতিতে কোটি কোটি টাকা লেনদেনের অভিযোগও রয়েছে। ঢাকা ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে আব্দুস সালামকে নিয়োগের বিনিময়ে ১০ কোটি টাকা ঘুষ নেওয়ার অভিযোগ করা হয়েছে। এলজিইডির সাবেক প্রধান প্রকৌশলী মো. আব্দুর রশীদ খানকে নিয়োগে ৫২ কোটি এবং গাজীপুর সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা আব্দুল লতিফ খানকে নিয়োগে ৬৫ কোটি টাকা নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
বিদেশে অর্থপাচারের অভিযোগে দুদকের নথিতে বলা হয়েছে, দুর্নীতির অর্থ দিয়ে পর্তুগালে জমি কেনা, দুবাইয়ের একটি প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগ এবং সুইজারল্যান্ডের ব্যাংকে অর্থ রাখার অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগ অনুযায়ী, দুবাইয়ে ৪ হাজার ৫০০ কোটি, সিঙ্গাপুরে ৩ হাজার কোটি, অস্ট্রেলিয়ায় ২ হাজার কোটি এবং সুইজারল্যান্ডে ১ হাজার ৫০০ কোটি টাকা পাচার করা হয়েছে। চার দেশে পাচারের অভিযোগের মোট অর্থ ১১ হাজার কোটি টাকা।
আসিফ মাহমুদের দুই বোনজামাই ও এক ভাগ্নের মাধ্যমে বিদেশে অর্থ পাচারের অভিযোগও করা হয়েছে। তার বাবা বিল্লাল হোসেন, এপিএস মোয়াজ্জেম হোসেন এবং পিও মাহফুজুল আলম ভূঁইয়ার বিরুদ্ধেও ঠিকাদারি সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ, ঘুষের তদবির ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে।
এছাড়া হেলিকপ্টারে ভ্রমণের মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় অর্থ অপচয়, পাঁচ তারকা হোটেলে যাতায়াত, বিলাসবহুল ফ্ল্যাটে বসবাস ও দামি গাড়ি ব্যবহারের অভিযোগও আনা হয়েছে।
তবে দুদক জানিয়েছে, এসব অভিযোগ এখনো অনুসন্ধান পর্যায়ে রয়েছে। অভিযোগের সত্যতা এখনো প্রমাণিত হয়নি। অনুসন্ধান শেষে প্রাপ্ত তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে পরবর্তী আইনগত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
দেশবার্তা/এসআইএস/একে