গত সাড়ে ছয় বছরে রাজধানীতে ১ হাজার ৮৪৯টি সড়ক দুর্ঘটনায় ১ হাজার ৩৮৪ জনের অকালমৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে এসব দুর্ঘটনায় আহত হয়েছেন আরও ২ হাজার ৪৮৮ জন। উদ্বেগের বিষয় হলো, সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারানোদের মধ্যে প্রায় ৪৩ শতাংশই সাধারণ পথচারী।
শনিবার (১ আগস্ট) রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক সাইদুর রহমান স্বাক্ষরিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে রাজধানীর সড়ক দুর্ঘটনার এই ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরা হয়। দেশের ৯টি জাতীয় দৈনিক, ৭টি অনলাইন নিউজ পোর্টাল এবং বিভিন্ন ইলেকট্রনিক গণমাধ্যমের তথ্যের ভিত্তিতে প্রতিবেদনটি তৈরি করা হয়েছে।
প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের জুলাই পর্যন্ত রাজধানীতে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহতদের মধ্যে পুরুষ ১ হাজার ৩৪ জন (৭৪.৭১ শতাংশ), নারী ২১৯ জন (১৫.৮২ শতাংশ) এবং শিশু ১৩১ জন (৯.৪৬ শতাংশ)।
শ্রেণিভিত্তিক বিচারে দেখা যায়, নিহতদের মধ্যে সবচেয়ে বড় অংশই পথচারী- যার সংখ্যা ৫৯২ জন (৪২.৭৭ শতাংশ)। এ ছাড়া মোটরসাইকেল চালক ও আরোহী নিহত হয়েছেন ৫৩৬ জন (৩৮.৭২ শতাংশ)। বাকি ২৫৬ জন (১৮.৪৯ শতাংশ) বাস, রিকশা, সিএনজি ও অন্যান্য যানবাহনের চালক ও যাত্রী।
দুর্ঘটনার সময় বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, দিনের অন্যান্য সময়ের তুলনায় রাতে এবং সকালে প্রাণহানির ঘটনা সবচেয়ে বেশি ঘটেছে। দুর্ঘটনায় মোট নিহতের মধ্যে রাতে ৫১৯ জন (৩৭.৫ শতাংশ) এবং সকালে ২৫৮ জন (১৮.৬৪ শতাংশ) মারা যান। বাকিদের মধ্যে দুপুরে ১৯৫ জন, বিকেলে ১৭৪ জন, ভোরে ১৪২ জন এবং সন্ধ্যায় ৯৬ জনের মৃত্যু হয়েছে।
দুর্ঘটনায় সম্পৃক্ত যানবাহনের ধরনে দেখা যায়, সবচেয়ে বেশি দুর্ঘটনা ঘটিয়েছে ট্রাক, কাভার্ডভ্যান, পিকআপ, ট্যাংকার ও ময়লাবাহী ট্রাকের মতো ভারী যানবাহন (৩৩.২৫ শতাংশ)। এর পর রয়েছে মোটরসাইকেল (২৬ শতাংশ) এবং বাস (২১.৭৫ শতাংশ)। অটোরিকশা, সিএনজি ও লেগুনা জড়িত ছিল ১২.৭৩ শতাংশ দুর্ঘটনায় এবং প্রাইভেটকার, মাইক্রোবাস ও জিপ ৬.২৫ শতাংশ।
বছরভিত্তিক পরিসংখ্যান পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ২০২০ সালে ১২৪টি দুর্ঘটনায় ১২৬ জন নিহত হন। ২০২১ সালে ১৩৭টি দুর্ঘটনায় ১৪১ জন, ২০২২ সালে ২৬৮টি দুর্ঘটনায় ২৫৬ জন, ২০২৩ সালে ২৯৬টি দুর্ঘটনায় ২৪৯ জন, ২০২৪ সালে ৩৯৪টি দুর্ঘটনায় ২৪৬ জন, ২০২৫ সালে ৪০৭টি দুর্ঘটনায় ২২৯ জন এবং চলতি ২০২৬ সালের জুলাই পর্যন্ত ২২৩টি দুর্ঘটনায় ১৩৭ জন প্রাণ হারিয়েছেন।
সংগঠনটি জানিয়েছে, রাজধানীতে রাতে ও ভোরে দুর্ঘটনা বেশি হওয়ার প্রধান কারণ বাইপাস সড়কের অভাব। এর ফলে রাত ১০টার পর ভারী মালবাহী যানবাহন বেপরোয়া গতিতে চলে, যা পথচারী পারাপারের সময় মারাত্মক ঝুঁকির সৃষ্টি করে। এ ছাড়া ফুটপাত হকারদের দখলে থাকা, উপযুক্ত স্থানে ফুটওভার ব্রিজ না থাকা কিংবা তা ব্যবহারের অনুপযোগী হওয়া, একই সড়কে ধীর ও দ্রুতগতির যানবাহনের অনিয়ন্ত্রিত চলাচল এবং দীর্ঘ যানজটের কারণে চালকদের মানসিক অস্থিরতা ও অসচেতনতা দুর্ঘটনা বাড়ার পেছনে মূল ভূমিকা রাখছে।
প্রতিবেদনে বর্তমানে রাজধানীর যাত্রাবাড়ী, ডেমরা, মোহাম্মদপুর, কুড়িল বিশ্বরোড এবং বিমানবন্দর সড়ক-কে দুর্ঘটনাপ্রবণ মারাত্মক ‘হটস্পট’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
রাজধানীর সড়ক পরিবহন খাতে শৃঙ্খলা ফেরাতে দ্রুত কোম্পানিভিত্তিক বাস সেবা (রুট রেশনালাইজেশন) চালু করা এবং বিআরটিএ, বিআরটিসি, ডিটিসিএ, সিটি করপোরেশন ও ট্রাফিক পুলিশের যৌথ সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণের তাগিদ দিয়েছে রোড সেফটি ফাউন্ডেশন।
দেশবার্তা/একে