পৃথিবীর আলো দেখেই মায়ের বুকে আশ্রয় নেওয়ার কথা ছিল নবজাতক ইয়াজান আল-খালিদির। কিন্তু জন্মের পরই তাকে নিয়ে যেতে হয় হাসপাতালের নবজাতক নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র (এনআইসিইউ)। মায়ের কোলের বদলে তার প্রথম আশ্রয় হয় একটি ইনকিউবেটর। কাঁচের দেয়ালের ওপাশে দাঁড়িয়ে মা নূর সালেম প্রতিদিন শুধু দেখেন- তার শিশুটি এখনো শ্বাস নিচ্ছে কি না।
৩০ বছর বয়সী নূর সালেমের মাতৃত্বের গল্প আনন্দের নয়, বরং বেদনার। ২০২৫ সালে গাজায় দুর্ভিক্ষের সময় জন্মের কিছুক্ষণের মধ্যেই তিনি তার প্রথম সন্তানকে হারান। সেই শোক কাটিয়ে আবার মা হলেও যুদ্ধ, ক্ষুধা ও অনিশ্চয়তার কারণে পুরো গর্ভকালজুড়েই তিনি আতঙ্কে ছিলেন।
অষ্টম মাসেই জন্ম নেয় ইয়াজান। জন্মের পর তার শরীর নীলচে হয়ে যায়, সে কাঁদছিল না এবং ঠিকভাবে শ্বাসও নিতে পারছিল না। দ্রুত তাকে মধ্য গাজার দেইর আল-বালাহ এলাকার আল-আকসা শহীদ হাসপাতালের এনআইসিইউতে ভর্তি করা হয়।
নূর বলেন, ‘যখন দেখলাম আমার ছেলে অন্য শিশুদের মতো নড়ছে না, কাঁদছেও না, তখন মনে হয়েছিল হয়তো আবারও তাকে হারাব। আমি শুধু চাই, আমার সন্তানটা বেঁচে থাকুক।’
গাজায় চলমান যুদ্ধ শুধু ঘরবাড়িই ধ্বংস করেনি, ভেঙে পড়েছে স্বাস্থ্যব্যবস্থাও। এর সবচেয়ে বড় মূল্য দিচ্ছে নবজাতক শিশুরা। ইউনিসেফের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে গাজায় প্রতি পাঁচজন নবজাতকের একজনের নিবিড় পরিচর্যা বা বিশেষ তাপ-সেবার প্রয়োজন হচ্ছে। একই সঙ্গে বেড়েছে অকালজাত শিশুর জন্ম, কম ওজনের নবজাতক, মৃত সন্তান প্রসব এবং জন্মগত জটিলতার ঘটনা।
চিকিৎসকদের মতে, অপুষ্টি, বারবার বাস্তুচ্যুতি, নিরাপদ পানির সংকট, মানসিক চাপ এবং প্রসবপূর্ব স্বাস্থ্যসেবার অভাব এই পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করে তুলেছে।
নুসেইরাত শরণার্থী শিবিরে কর্মরত প্রসূতি ও স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. আফনান আবু হাসাবাল্লাহ জানান, প্রতিদিন অসংখ্য অন্তঃসত্ত্বা নারী হাসপাতালে আসছেন, যাদের শরীরে অপুষ্টির স্পষ্ট লক্ষণ রয়েছে। অনেকেই দিনের পর দিন পর্যাপ্ত খাবার পাননি, কেউ নিরাপদ পানির অভাবে অসুস্থ হয়েছেন, আবার কেউ লাগাতার বোমা হামলার আতঙ্কে গর্ভকাল পার করেছেন। এসব কারণে অকালজাত শিশুর জন্মের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
তিনি বলেন, হাসপাতালগুলোতেও রয়েছে চরম সংকট। প্রয়োজনের তুলনায় ইনকিউবেটর, ভেন্টিলেটর ও ওষুধের সংখ্যা খুবই কম। বিদ্যুৎ ও জ্বালানির ঘাটতির কারণে চিকিৎসাসেবা ব্যাহত হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে সামান্য চিকিৎসা পেলেই যে শিশুকে বাঁচানো সম্ভব হতো, তাকেও হারাতে হচ্ছে।
হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র পাওয়ার পরও শেষ হচ্ছে না দুর্ভোগ। বহু পরিবারের কাছে শিশুখাদ্য, ডায়াপার, বিশুদ্ধ পানি কিংবা একটি উষ্ণ কম্বল পর্যন্ত নেই।
এমন পরিস্থিতিতে নুসেইরাত শরণার্থী শিবিরে কুতুফ আল-খাইর ফাউন্ডেশন অন্তঃসত্ত্বা নারী ও নবজাতকদের সহায়তা দেওয়ার চেষ্টা করছে। সংস্থাটির প্রধান আকরাম আবু জিয়াব বলেন, প্রতিদিন সহায়তার চাহিদা বাড়ছে, কিন্তু প্রয়োজনের তুলনায় সহায়তা অত্যন্ত সীমিত।
তার ভাষায়, ‘গাজায় জন্ম নেওয়া প্রতিটি শিশুর পেছনে এমন একজন মা রয়েছেন, যিনি চরম প্রতিকূলতার মধ্যেও সন্তানকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য লড়াই করছেন। এই মুহূর্তে মা ও শিশুদের সহায়তা করা কোনো বিলাসিতা নয়; এটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে বাঁচিয়ে রাখার অপরিহার্য দায়িত্ব।’
দেশবার্তা/একে