নেপালের দক্ষিণাঞ্চলীয় তরাই অঞ্চলের মধেশ প্রদেশে হিন্দু ও মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে রক্তক্ষয়ী সংঘাত ছড়িয়ে পড়েছে। একাধিক জেলায় ছড়িয়ে পড়া এই সহিংসতায় সংঘর্ষ ও গুলিবর্ষণে নিহতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে তিনজনে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে প্রশাসন ইতোমধ্যে চারটি জেলায় অনির্দিষ্টকালের জন্য সান্ধ্য আইন (কারফিউ) জারি করেছে।
উদ্ভূত এই ভয়াবহ পরিস্থিতিতে দেশবাসীকে শান্ত থাকার জোর আহ্বান জানিয়েছেন নেপালের প্রধানমন্ত্রী বালেন্দ্র (বালেন) শাহ। গত মার্চ মাসে দায়িত্ব গ্রহণের পর জনসম্মুখে খুব একটা না এলেও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে গত বৃহস্পতিবার তিনি জাতির উদ্দেশে প্রথম ভাষণ দেন। আবেগঘন এই বার্তায় তিনি দেশের সব নাগরিককে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালনের নির্দেশ দিয়ে অনাকাঙ্ক্ষিত অস্থিতিশীলতার মেঘ দূর করার উদাত্ত আহ্বান জানান।
স্থানীয় সূত্রের বরাত দিয়ে প্রশাসনিক কর্মকর্তারা জানান, ভারতীয় সীমান্তের কাছে সুনসারি জেলার একটি গ্রামে গত রোববার হিন্দুদের একটি শোভাযাত্রায় উচ্চস্বরে গান বাজানো ও ধর্মীয় পতাকা টানানো নিয়ে হিন্দু ও মুসলিম সম্প্রদায়ের কয়েকজন সদস্যের মধ্যে বাগ্বিতণ্ডা হয়। এর জের ধরেই সহিংসতার সূত্রপাত ঘটে।
পুলিশের মুখপাত্র আবি নারায়ণ কাফলে জানান, বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হলে উগ্র জনতাকে ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশ গুলি চালালে দুজন নিহত হন। পরবর্তীতে বৃহস্পতিবার সান্ধ্য আইন বহাল থাকা সত্ত্বেও নিকটবর্তী সিরাহা জেলায় বিক্ষোভের সময় আরও এক তরুণের মৃত্যু হয়।
সংবাদ সংস্থাগুলো জানায়, গত রোববার (২৬ জুলাই) রাতে সুনসারি জেলার দেওয়াংগঞ্জ গ্রামীণ পৌরসভায় দুই পক্ষের সংঘর্ষে ২৪ বছর বয়সী ওম প্রকাশ মেহতা গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান। সেখান থেকেই তরাই অঞ্চলের সর্বত্র ভয়াবহ উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে।
বৃহস্পতিবার দুপুরে সিরাহা জেলার গোলবাজারে নতুন করে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের সময় ১৭ বছর বয়সী গণেশ যাদব নামে এক কিশোর ঘাড়ে গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যায়। এর আগে ওই দিন সকালে বিরাটনগরের নিউরো হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান ২০ বছর বয়সী জয় প্রকাশ মেহতা, যিনি রোববারের সংঘর্ষে মারাত্মক আহত হয়েছিলেন।
সংঘর্ষে আহত ১৯ বছর বয়সী সুভাষ ঠাকুর নামে অপর এক তরুণের অবস্থা আশঙ্কাজনক। তবে নিরাপত্তাবাহিনী নাকি বিশৃঙ্খলাকারীদের গুলিতে এই হতাহতের ঘটনা ঘটেছে- তা নিশ্চিত করতে পারেনি পুলিশ।
সহিংসতা ছড়িয়ে পড়া রোধে প্রশাসন সুনসারি, সপ্তরী, সিরাহা এবং ধনুষা জেলায় কারফিউ জারি করেছে। পাশাপাশি পারসা জেলায় সব ধরনের সভা-সমাবেশের ওপর নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। সংঘাতপূর্ণ এলাকাগুলোতে পরিস্থিতি সামাল দিতে নেপাল পুলিশ, আর্মড পুলিশ ফোর্স এবং নেপাল সেনাবাহিনীর বিপুলসংখ্যক সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে।
বৃহস্পতিবার সকালে মধেশ প্রদেশের প্রাদেশিক রাজধানী জনকপুরে সহিংসতা মারাত্মক আকার ধারণ করে। বিক্ষোভকারীরা বাজার বন্ধ করে দিয়ে পুলিশ ও প্রতিপক্ষ দলগুলোর সঙ্গে ধাওয়া-পাল্টাধাওয়ায় জড়িয়ে পড়ে। পরিস্থিতি বিবেচনায় বেলা সাড়ে ৩টা থেকে জনকপুরধাম উপমহানগর এলাকায় অনির্দিষ্টকালের জন্য কারফিউ ঘোষণা করা হয়।
ধনুষা জেলা প্রশাসন নির্দেশ অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনে বলপ্রয়োগের জন্য সেনাবাহিনীকে বিশেষ ক্ষমতা প্রদান করেছে। ফলে জনকপুরে সেনাবাহিনীর সাঁজোয়া যান, হেলিকপ্টার এবং পদাতিক টহল বহুলাংশে জোরদার করা হয়েছে।
অন্যদিকে সিরাহা জেলার গোলবাজারে বিক্ষোভকারীরা কারফিউ ভেঙে পূর্ব-পশ্চিম মহাসড়ক অবরোধের চেষ্টা করলে টিয়ারশেল ও ফাঁকা গুলি ছুড়ে জনতাকে ছত্রভঙ্গ করে পুলিশ। তবে এর আগেই একাধিক দোকানপাট ও শপিং মলে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে।
সিরাহার মুখ্য জেলা কর্মকর্তা সুরেন্দ্র পৌডেল জানান, সংঘাত এড়াতে রাজনৈতিক দল ও স্থানীয় নেতাদের সঙ্গে আলোচনা চালানো হচ্ছে।
সহিংসতা রুখতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সর্বোচ্চ নজরদারিতে রয়েছে। এএফপিকে পুলিশ মুখপাত্র আবি নারায়ণ কাফলে বলেন, ‘আমরা মাঠপর্যায়ে কর্তব্যরত সমস্ত পুলিশ কর্মকর্তাকে উচ্চ সতর্কাবস্থায় রেখেছি। ন্যূনতম শক্তি প্রয়োগ নিশ্চিত করে জনগণের জানমাল রক্ষা করা এবং যেকোনো ধরনের সংঘাতময় পরিস্থিতি প্রতিরোধ করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি।’
একই সঙ্গে জরুরি প্রয়োজন ছাড়া সকল পুলিশ সদস্যের ছুটি বাতিল করা হয়েছে বলেও জানান তিনি।
তবে স্থানীয় নাগরিক সমাজের অভিযোগ, উত্তেজনা সৃষ্টির প্রাথমিক পর্যায়ে নিরাপত্তাবাহিনী সময়মতো কার্যকর পদক্ষেপ নিতে ব্যর্থ হওয়ায় পরিস্থিতি এতটা ভয়াবহ রূপ নিয়েছে।
জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে প্রধানমন্ত্রী বালেন শাহ বলেন, ‘আমি সরকারের পক্ষ থেকে সব সাধারণ নাগরিক, সুশীল সমাজ, ধর্মীয় সম্প্রদায়, শ্রদ্ধেয় নেতৃবৃন্দ, রাজনৈতিক দল এবং দায়িত্বশীল গণমাধ্যমের কাছে ধৈর্য ও সংযম প্রকাশ করার এবং দেশের শান্তি, সম্প্রীতি, ভ্রাতৃত্ববোধ ও জাতীয় ঐক্য বজায় রাখার বিনীত অনুরোধ জানাচ্ছি।’
একই সঙ্গে তিনি এ ঘটনার অত্যন্ত নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ তদন্ত পরিচালনা করার প্রতিশ্রুতি দেন এবং অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনার দৃঢ় আশ্বাস ব্যক্ত করেন।
উল্লেখ্য, হিমালয়কন্যা নেপালের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৮০ শতাংশই হিন্দু ধর্মাবলম্বী হলেও দক্ষিণ অঞ্চলের জেলাগুলোতে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক মুসলিম জনগোষ্ঠীর বসবাস রয়েছে। সেখানে স্বাভাবিক পরিস্থিতি ফিরিয়ে আনতে কাজ করছে পুলিশ ও স্থানীয় প্রশাসন। তথ্যসূত্র: আল জাজিরা, কাঠমান্ডু পোস্ট ও এএফপি
দেশবার্তা/একে