ডারউইনে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে বাংলাদেশের ৯ উইকেটের জয় শুধু একটি জয় নয়। টেস্ট ক্রিকেটের ইতিহাসে জায়গা করে নেওয়ার মতো এক বিস্ময়কর ঘটনা।
২৩ বছর পর অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে টেস্ট খেলতে গিয়ে বাংলাদেশ যেভাবে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত আধিপত্য দেখিয়ে স্বাগতিকদের উড়িয়ে দিয়েছে, তাতে প্রশ্ন উঠতেই পারে- এটি কি টেস্ট ইতিহাসের সর্বকালের সেরা অঘটনগুলোর একটি?
ডারউইন, ২০২৬
২৩ বছর পর অস্ট্রেলিয়ায় প্রথম টেস্ট সফর। এর আগে জিম্বাবুয়ে ও ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়া একাদশের বিপক্ষে ইনিংস ব্যবধানে হার। সবকিছু মিলিয়ে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে বাংলাদেশের জয়ের প্রত্যাশা ছিল খুবই কম। কিন্তু মাঠে দেখা গেল সম্পূর্ণ ভিন্ন এক বাংলাদেশ।
হাসান মাহমুদের ছয় উইকেটের দুর্দান্ত বোলিংয়ে অস্ট্রেলিয়াকে মাত্র ১৯৮ রানে গুটিয়ে দেয় বাংলাদেশ। এরপর তানজিদ হাসানের প্রথম টেস্ট সেঞ্চুরিতে ব্যাট হাতে দারুণ দৃঢ়তা দেখায় তারা।
দ্বিতীয় ইনিংসে বল হাতে নায়ক হন মেহেদী হাসান মিরাজ। তার অফস্পিনে অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটিং লাইনআপ ভেঙে পড়ে। শেষ পর্যন্ত ৯ উইকেটের জয় বাংলাদেশের। শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ ছিল টাইগারদের হাতে।
বেঙ্গালুরু, ২০২৪
এই সিরিজের প্রায় যেকোনও ফলই অঘটনের তালিকায় জায়গা পেতে পারতো। তবে সিরিজের প্রথম টেস্টের জয়টিই ছিল সবচেয়ে বড় চমক।
ভারতের মাটিতে এর আগে মাত্র দুটি টেস্ট জিতেছিল নিউজিল্যান্ড। প্রথম দিন বৃষ্টিতে ভেসে যাওয়ার পর দ্বিতীয় সকালে মাত্র ৩১.২ ওভারে ৪৬ রানে অলআউট হয়ে যায় ভারত।
রাচিন রবীন্দ্রর সেঞ্চুরিতে বিশাল লিড নেয় নিউজিল্যান্ড। পরে ভারত দ্বিতীয় ইনিংসে ৪০৮ রানে ৩ উইকেট নিয়ে ম্যাচে ফেরার আভাস দেয়।
কিন্তু উইল ও'রুর্কের দুর্দান্ত বোলিংয়ে ভারতের মিডল অর্ডার ধসে পড়ে। ১০৭ রানের লক্ষ্য সহজেই পেরিয়ে যায় নিউজিল্যান্ড। তারা জেতে ৮ উইকেটে।
ব্রিসবেন, ২০২৪
চতুর্থ দিন সকালে ৮ উইকেট হাতে নিয়ে অস্ট্রেলিয়ার প্রয়োজন ছিল ১৫৬ রান। এরপর সেই সমীকরণ নেমে আসে মাত্র ১০৩ রানে।
ঠিক তখনই ক্যামেরন গ্রিনকে ফিরিয়ে ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দেন শামার জোসেফ।
ট্রাভিস হেড করেন ‘কিং পেয়ার’। এরপর অ্যালেক্স ক্যারির স্টাম্প উড়িয়ে দেন জোসেফ। স্টিভ স্মিথ এক প্রান্ত ধরে রাখার চেষ্টা করছিলেন।
শেষ পর্যন্ত জয়ের জন্য যখন অস্ট্রেলিয়ার প্রয়োজন মাত্র ৯ রান, তখন ভাঙা পা নিয়েই বোলিং করা জোসেফ জশ হ্যাজলউডের স্টাম্প ভেঙে দেন।
১৯৯৭ সালের পর অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে ওয়েস্ট ইন্ডিজের প্রথম টেস্ট জয় আসে সেদিন। ওয়েস্ট ইন্ডিজ ৮ রানে হারায় অস্ট্রেলিয়াকে।
মাউন্ট মঙ্গানুই, ২০২২
ডারউইনের আগে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় অঘটনের গল্প ছিল মাউন্ট মঙ্গানুই। এটি ছিল কোনও ‘সেনা’ দেশে বাংলাদেশের প্রথম টেস্ট জয়।
ডেভন কনওয়ের সেঞ্চুরিতে নিউজিল্যান্ড ৩২৮ রান করেছিল। কিন্তু বাংলাদেশের সম্মিলিত ব্যাটিং পারফরম্যান্সে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ চলে যায় সফরকারীদের হাতে। চারজন ব্যাটার হাফ সেঞ্চুরি করেছিলেন। সর্বোচ্চ ৮৮ রান করেন মুমিনুল হক। আট নম্বরে নেমে মেহেদী হাসান করেন গুরুত্বপূর্ণ ৪৭ রান।
এরপর বল হাতে ম্যাচের নায়ক এবাদত হোসেন। তার ৪৬ রানে ৬ উইকেট শিকার নিউজিল্যান্ডের ব্যাটিংয়ে ধস নামায়। ১৩৬ রানে ২ উইকেট থেকে মাত্র ১৬৯ রানে অলআউট হয়ে যায় স্বাগতিকরা। ওই ম্যাচ বাংলাদেশ জেতে ৮ উইকেটে!
ব্রিসবেন, ২০২১
একবিংশ শতাব্দীতে অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে ভারতের জয়কে হয়তো স্বাভাবিক মনে হতে পারে। কিন্তু এই ম্যাচের প্রেক্ষাপট ছিল অবিশ্বাস্য।
অ্যাডিলেডে মাত্র ৩৬ রানে অলআউট হয়েছিল ভারত। এরপর মেলবোর্নে দুর্দান্ত জয় এলেও সিরিজের শেষ ম্যাচের আগে চোটে ভারতের বোলিং আক্রমণ প্রায় শেষ হয়ে গিয়েছিল। ম্যাচ শুরুর সময় ভারতের পুরো বোলিং আক্রমণের মোট টেস্ট উইকেট ছিল মাত্র ১৩টি। অন্যদিকে অস্ট্রেলিয়ার বোলারদের সম্মিলিত উইকেট ছিল ১,০৪৬টি।
আরেকটি তথ্য আরও অবিশ্বাস্য- ১৯৮৮ সালের পর গ্যাবায় কোনও টেস্ট হারেনি অস্ট্রেলিয়া। তবু ৩২৮ রানের লক্ষ্য তাড়া করে ইতিহাস গড়ে ভারত। শুভমান গিলের ৯১ রানের পর চেতেশ্বর পূজারা ২১১ বল খেলে অস্ট্রেলিয়াকে ক্লান্ত করে দেন। শেষ পর্যন্ত অপরাজিত ৮৯ রানের অসাধারণ ইনিংসে জয় নিশ্চিত করেন ঋষভ পান্ত। ভারত জেতে ৩ উইকেটে।
অ্যান্টিগা, ২০০৩
২০০৩ সালে অস্ট্রেলিয়া ছিল ক্রিকেট পরাশক্তি, আর ওয়েস্ট ইন্ডিজ তখন পতনের পথে। সিরিজে অস্ট্রেলিয়া ৩-০ এগিয়ে ছিল। তার ওপর ৪১৮ রানের রেকর্ড লক্ষ্য! চতুর্থ দিনের শুরুতে ৭৪ রানে ৩ উইকেট হারিয়ে ফেলায় ওয়েস্ট ইন্ডিজের জয়ের আশা আরও ক্ষীণ হয়ে যায়।
কিন্তু এরপর ব্রায়ান লারার বিধ্বংসী ব্যাটিং, শিবনারায়ণ চন্দরপলের সেঞ্চুরি এবং রামনারেশ সারওয়ানের শতকে বদলে যায় ম্যাচের চিত্র।
২৮৮ রানে ৬ উইকেট পড়ে যাওয়ার পরও অস্ট্রেলিয়ার জয় নিশ্চিত মনে হচ্ছিল। কিন্তু ওমারি ব্যাংকসের ৮৪ রানের লড়াকু ইনিংস চন্দরপলের সঙ্গে ম্যাচ ঘুরিয়ে দেয়। শেষ পর্যন্ত অবিশ্বাস্য জয় পায় ওয়েস্ট ইন্ডিজ। তারা জয় নিশ্চিত করে ৩ উইকেটে!
হারারে, ১৯৯৮
রাহুল দ্রাবিড়, শচীন টেন্ডুলকার, সৌরভ গাঙ্গুলি-ভারতের মিডল অর্ডারে তখন একের পর এক তারকা। বোলিংয়ে ছিলেন অনিল কুম্বলে।
তবু হারারেতে একমাত্র টেস্টে ভারতকে হারিয়ে দেয় জিম্বাবুয়ে। হেনরি ওলঙ্গার পাঁচ উইকেট এবং গ্যাভিন রেনি ও ক্রেগ উইশার্টের ১৩৮ রানের ওপেনিং জুটি জিম্বাবুয়েকে শক্ত অবস্থানে নিয়ে যায়।
ভারতের সামনে লক্ষ্য দাঁড়ায় ২৩৫ রান। কিন্তু ৩৭ রানে ৪ উইকেট হারিয়ে বিপদে পড়ে তারা। আর ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি ভারত।
জিম্বাবুয়ের পাঁচ বোলারই ভাগাভাগি করে নেন ভারতের উইকেট। আসে ৬১ রানের ঐতিহাসিক জয়।
হারারে, ১৯৯৫
এটি ছিল জিম্বাবুয়ের মাত্র ১১তম টেস্ট এবং ইতিহাসে তাদের প্রথম জয়। পাকিস্তানের বোলিং আক্রমণে ওয়াসিম আকরাম থাকলেও জিম্বাবুয়ের ব্যাটাররা দুই দিন ধরে তাদের ওপর পুরোপুরি আধিপত্য বিস্তার করেন। গ্রান্ট ফ্লাওয়ারের ডাবল সেঞ্চুরি, অ্যান্ডি ফ্লাওয়ারের ১৫৬ এবং গাই হুইটালের সেঞ্চুরিতে ৪ উইকেটে ৫৪৪ রান তুলে ইনিংস ঘোষণা করে জিম্বাবুয়ে। এরপর হিথ স্ট্রিকের ৯০ রানে ৬ উইকেট শিকার পাকিস্তানকে চাপে ফেলে দেয়।
ফলোঅন করতে নেমে মাত্র ৩৫ রানে ৫ উইকেট হারায় পাকিস্তান। চার দিনের আগেই শেষ হয়ে যায় ম্যাচ। জিম্বাবুয়ে জেতে ইনিংস ও ৬৪ রানে!
জ্যামাইকা, ১৯৯০
ওয়েস্ট ইন্ডিজ তখনও তাদের স্বর্ণযুগে। অন্যদিকে ১৯৭৪ সালের পর ইংল্যান্ড ওয়েস্ট ইন্ডিজকে হারাতেই পারেনি। তার ওপর ১৯৮৯ সালের অ্যাশেজে ইংল্যান্ডের পারফরম্যান্স ছিল হতাশাজনক।
গর্ডন গ্রিনিজ ও ডেসমন্ড হেইন্সের ৬২ রানের ওপেনিং জুটি দেখে কেউ ভাবেনি ম্যাচের গল্প এতটা বদলে যাবে। ডেভন ম্যালকমের থ্রোতে রানআউট হন গ্রিনিজ। এরপর অ্যাঙ্গাস ফ্রেজারের পাঁচ উইকেটে ওয়েস্ট ইন্ডিজের ব্যাটিংয়ে একের পর এক ধাক্কা আসে।
অ্যালান ল্যাম্বের সেঞ্চুরিতে ইংল্যান্ড ২০০ রানের লিড নেয়। দ্বিতীয় ইনিংসে হেইন্স ও ভিভ রিচার্ডসের লেগ স্টাম্প উড়িয়ে দেন ম্যালকম।
তার পর ম্যালকম ও গ্ল্যাডস্টোন স্মলের সম্মিলিত আট উইকেট শিকারে ৯ উইকেটের অবিশ্বাস্য জয় পায় ইংল্যান্ড।
দ্য ওভাল, ১৯৫৪
টেস্ট মর্যাদা পাওয়ার দুই বছরও হয়নি পাকিস্তানের। এর আগে মাত্র একটি টেস্ট জিতেছিল তারা। সেটা ছিল ১৯৫২ সালে নিজেদের দ্বিতীয় টেস্টে ভারতের বিপক্ষে ইনিংস ব্যবধানে।
এরপর ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ট্রেন্ট ব্রিজে ইনিংস ব্যবধানে হার। মাঝখানে বৃষ্টিবিঘ্নিত দুই টেস্টে ড্র। দ্য ওভালে দুই দলের ব্যাটারদের জন্যই রান করা ছিল কঠিন। সেই ম্যাচে ইতিহাস গড়েন পাকিস্তানের ফজল মাহমুদ। ৬০ ওভারে ৯৯ রানে ১২ উইকেট নেন তিনি।
ইংল্যান্ডের সামনে লক্ষ্য ছিল ১৬৮ রান। তারা ১০৯ রানে মাত্র ২ উইকেট হারিয়েছিল। এরপর পিটার মে-কে ফিরিয়ে ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দেন মাহমুদ। তারপর ইংল্যান্ডের অবিশ্বাস্য ধস। মাত্র ৩৪ রানে পড়ে যায় শেষ ৮ উইকেট।
পাকিস্তান জেতে ২৪ রানে, আর ফজল মাহমুদের নাম উঠে যায় টেস্ট ক্রিকেটের ইতিহাসের পাতায়।
দেশবার্তা/এমআর