ফেনীর বহুল আলোচিত মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাত জাহান রাফি হত্যা মামলায় আসামিদের ডেথ রেফারেন্স, আসামিদের আপিল ও জেল আপিলের রায় ঘোষণা হয়েছে। ২০১৯ সালের ২৪ অক্টোবর ফেনীর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মামুনুর রশিদ এ মামলায় ১৬ জনের মৃত্যুদণ্ড ঘোষণা করেন।
সোমবার (২৪ আগস্ট) সকাল ১০টা ৪০ মিনিট থেকে বিচারপতি ভীষ্মদেব চক্রবর্তী ও বিচারপতি কে এম রাশেদুজ্জামান রাজার হাইকোর্ট বেঞ্চে আলোচিত এ মামলার রায় পড়া শুরু হয়। রায়ে দুই আসামির মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখেন আদালত। একইসঙ্গে চার আসামিকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং ১০ আসামিকে খালাস দিয়েছেন আদালত।
মৃত্যুদণ্ড প্রাপ্ত আসামিরা হলেন- সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল (ডিগ্রি) মাদ্রাসার বহিষ্কৃত অধ্যক্ষ এসএম সিরাজ উদদৌলা ও শাহাদাত হোসেন শামী।
আদালতে আসামিদের পক্ষে অ্যাডভোকেট এস এম শাহজাহান, ব্যারিস্টার মাসুদ হোসেন দোলন, অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ শিশির মনির উপস্থিত ছিলেন। রাষ্ট্রপক্ষে শুনানি করেন অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার রুহুল কুদ্দুস কাজল, ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল সৈয়দ ইজাজ কবির। গত ২০ আগস্ট ফেনীর সোনাগাজীর আলোচিত মাদরাসাছাত্রী নুসরাত হত্যা মামলায় আসামিদের ডেথ রেফারেন্স (মৃত্যুদণ্ড অনুমোদন), আপিল ও জেল আপিলের ওপর শুনানি শেষ হয়।
এদিকে রায় ঘিরে সোনাগাজী পৌরসভার উত্তর চরচন্দিয়া এলাকায় নুসরাতদের বাড়িতে নিরাপত্তা জোরদার করেছে পুলিশ। রোববার সন্ধ্যায় সোনাগাজী মডেল থানার ওসি আবুল হাসিম এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
মামলার রায় প্রসঙ্গে নুসরাতের মা শিরিন আক্তার বলেন, একমাত্র মেয়েকে হারিয়ে আজও পাগলের মতো আছি। নিম্ন আদালতে আমরা ন্যায়বিচার পেয়েছি। তবে এখনো ৩ ছেলেকে নিয়ে নিরাপত্তা শঙ্কার মধ্যে রয়েছি। পুলিশ আমাদের সার্বিক নিরাপত্তা দিচ্ছে। সরকারের কাছে আমাদের প্রত্যাশা ন্যায়বিচার প্রাপ্তিতে সহযোগিতা এবং পরিবারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। আশা করছি উচ্চ আদালতেও আমরা ন্যায়বিচার পাব।
এর আগে ২০১৯ সালের ২৯ অক্টোবর আসামিদের মৃত্যুদণ্ডাদেশ অনুমোদনের জন্য (ডেথ রেফারেন্স) মামলার সব নথি হাইকোর্টে পৌঁছায়। এরপর অগ্রাধিকার ভিত্তিতে মামলার পেপারবুক (নথিপত্র) ছাপানোর কাজ শেষ করা হয়। প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া শেষে শুনানির জন্য মামলাটি প্রধান বিচারপতির কাছে উপস্থাপন করা হলে তিনি শুনানির জন্য সংশ্লিষ্ট হাইকোর্ট বেঞ্চ নির্ধারণ করে দেন।
ফৌজদারি কার্যবিধি অনুযায়ী, বিচারিক আদালত কোনো আসামিকে মৃত্যুদণ্ড দিলে সেই রায় অনুমোদনের জন্য মামলার সব নথি উচ্চ আদালতে পাঠাতে হয়। সে নিয়ম অনুযায়ী ডেথ রেফারেন্স হাইকোর্টে আসে। একই সঙ্গে আসামিরাও জেল আপিল ও ফৌজদারি আপিল করেন।
২০১৯ সালের ২৪ অক্টোবর ফেনীর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইবুনালের বিচারক মামুনুর রশিদ এ মামলার রায় ঘোষণা করেছিলেন। রায়ে অভিযুক্ত ১৬ আসামির প্রত্যেককে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করা হয়। পাশাপাশি প্রত্যেককে এক লাখ টাকা করে অর্থদণ্ড দেওয়া হয়।
মামলার বিবরণীতে জানা যায়, ২০১৯ সালের ২৭ মার্চ সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল মাদ্রাসার অধ্যক্ষ সিরাজ-উদ-দৌলার বিরুদ্ধে যৌন নির্যাতনের অভিযোগে মামলা করেন নুসরাতের মা শিরীন আখতার। এ মামলার পর পুলিশ অধ্যক্ষকে গ্রেপ্তার করে। এরপর তার অনুগত কয়েকজন ক্যাডার জনমত গঠন করে তাকে কারাগার থেকে বের করে আনার চেষ্টা করে।
৩ এপ্রিল কারাগারে সিরাজের সঙ্গে পরামর্শ করার পর ৪ এপ্রিল মাদ্রাসার ছাত্রাবাসে নুসরাতকে হত্যার পরিকল্পনা করা হয়। এরই ধারাবাহিকতায় ৬ এপ্রিল নুসরাত আলিম পরীক্ষা দিতে মাদ্রাসায় গেলে তাকে পরিকল্পিতভাবে সাইক্লোন শেল্টারের ছাদে ডেকে নিয়ে গায়ে আগুন দিয়ে হত্যার চেষ্টা চালানো হয়।
ঘটনাস্থল থেকে আশঙ্কাজনক অবস্থায় নুসরাতকে উদ্ধার করে প্রথমে সোনাগাজী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স এবং পরে ফেনী জেনারেল হাসপাতালে নেওয়া হয়। পরবর্তীতে অবস্থার অবনতি হলে তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে স্থানান্তর করা হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ১০ এপ্রিল মারা যান নুসরাত।
এ ঘটনায় নুসরাতের ভাই মাহমুদুল হাসান নোমান বাদী হয়ে ৮ এপ্রিল মামলা করেন। মামলায় ২৮ মে অভিযোগপত্র দাখিলের পর ২০ জুন অভিযোগ গঠন করেন জেলা নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল। সাক্ষ্যগ্রহণ ও যুক্তিতর্ক শেষে ৩০ সেপ্টেম্বর আদালত রায়ের জন্য ২৪ অক্টোবর দিন ধার্য করেন। মামলাটিতে মাত্র ৬১ কার্যদিবসে ৮৭ জনের সাক্ষ্যগ্রহণ ও যুক্তিতর্ক সম্পন্ন হয়।
মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ১৬ আসামি হলেন- সোনাগাজী ইসলামিয়া সিনিয়র ফাজিল মাদ্রাসার সাবেক অধ্যক্ষ এস এম সিরাজ-উদ-দৌলা (৫৭), নূর উদ্দিন (২০), শাহাদাত হোসেন শামীম (২০), কাউন্সিলার ও সোনাগাজী পৌর আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক মাকসুদ আলম ওরফে মোকসুদ, কাউন্সিলার (৫০), সাইফুর রহমান মোহাম্মদ জোবায়ের (২১), জাবেদ হোসেন ওরফে সাখাওয়াত হোসেন (১৯), হাফেজ আব্দুল কাদের (২৫), আবছার উদ্দিন (৩৩), কামরুন নাহার মনি (১৯), উম্মে সুলতানা ওরফে পপি (১৯), আব্দুর রহিম শরীফ (২০), ইফতেখার উদ্দিন রানা (২২), ইমরান হোসেন ওরফে মামুন (২২), সোনাগাজী উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও মাদ্রাসার সাবেক সহ সভাপতি রুহুল আমিন (৫৫), মহিউদ্দিন শাকিল (২০) ও মোহাম্মদ শামীম (২০)।
দেশবার্তা/জেএ