কলকাতার নিউমার্কেট এলাকায় একের পর এক হোটেল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বিপাকে পড়েছেন সেখানে অবস্থানরত হাজারো বাংলাদেশি পর্যটক। মির্জা গালিব স্ট্রিটের ‘শিখা ইন’ আবাসিক হোটেলে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে নয়জনের মৃত্যুর পর অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা খতিয়ে দেখতে অভিযান শুরু করে কলকাতা পুলিশ, পৌরসভা, দমকল ও বিদ্যুৎ বিভাগ।
এর মধ্যে মাত্র ৪৮ ঘণ্টায় নিউমার্কেটের আশপাশের এলাকায় ২২১টি হোটেল ও ৯টি রেস্তোরাঁ বন্ধের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ফলে অনেক বাংলাদেশি পর্যটককে হোটেল ছাড়তে হয়েছে, কেউ নতুন থাকার জায়গা খুঁজছেন, আবার কেউ নির্ধারিত সময়ের আগেই দেশে ফেরার প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
কলকাতার নিউমার্কেট, বিশেষ করে মারকুইজ স্ট্রিট, কলিন স্ট্রিট, সদর স্ট্রিট ও মির্জা গালিব স্ট্রিট এলাকা বাংলাদেশি পর্যটকদের কাছে দীর্ঘদিন ধরে জনপ্রিয়। চিকিৎসা, কেনাকাটা ও ভ্রমণের জন্য বাংলাদেশ থেকে যাওয়া অনেক মানুষ এসব এলাকার হোটেলে অবস্থান করেন।
বর্তমানে কলকাতায় প্রায় ১১ হাজার বাংলাদেশি পর্যটক অবস্থান করছেন বলে সংশ্লিষ্টদের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে। তাঁদের মধ্যে প্রায় ৭ হাজার নিউমার্কেট এলাকায় রয়েছেন।
হোটেল বন্ধের ফলে নতুন করে থাকার জায়গা পেতে সমস্যায় পড়েছেন পর্যটকেরা। কোথাও নতুন হোটেল পাওয়া গেলেও আগের তুলনায় বেশি ভাড়া চাওয়া হচ্ছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে ভাড়া দেড় থেকে দ্বিগুণ পর্যন্ত বেড়ে গেছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।
পর্যটকদের নিরাপত্তায় ‘জিরো টলারেন্স’ অবস্থান নেওয়ার কথা জানিয়েছে পশ্চিমবঙ্গ সরকার। অগ্নিকাণ্ডের পর নিউমার্কেট থানার পুলিশ ওই এলাকায় হোটেলগুলোর অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা যাচাইয়ে অভিযান শুরু করে। উপমুখ্যমন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পালও কয়েকটি অভিযানে অংশ নেন।
পরে কলকাতা পুলিশ, কলকাতা পৌরসভা, দমকল ও বিদ্যুৎ বিভাগের সমন্বয়ে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। কলকাতার সাড়ে তিন হাজারের বেশি হোটেলের নিরাপত্তাবিধি পর্যালোচনার কথা রয়েছে। তবে নিউমার্কেট এলাকায় এই তৎপরতা সবচেয়ে বেশি জোরদার হয়েছে। নিরাপত্তাবিধি না মানা কয়েকটি হোটেলের বিদ্যুৎ-সংযোগও বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে।
এদিকে হোটেল বন্ধের ঘটনায় স্থানীয় ব্যবসায়ীদের মধ্যেও উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। বাংলাদেশি পর্যটকদের ঘিরে নিউমার্কেট এলাকায় হোটেল, রেস্তোরাঁ, পরিবহন, কেনাকাটাসহ বিভিন্ন ধরনের ব্যবসা গড়ে উঠেছে। পর্যটকের সংখ্যা কমে গেলে এসব ব্যবসায়ও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন ব্যবসায়ীরা।
কলকাতার গ্রিন লাইন পরিবহনের শ্যামল ঘোষ বলেন, সীমান্ত থেকে যাত্রীপূর্ণ বাস কলকাতায় এলেও তাঁদের থাকার মতো পর্যাপ্ত হোটেল পাওয়া যাচ্ছে না। আশপাশের এলাকায় পর্যটকেরা হোটেল খুঁজছেন এবং অনেক জায়গায় ভাড়া বেড়ে গেছে। তিনি প্রশাসনের নিরাপত্তা উদ্যোগকে সমর্থন করলেও হোটেল মালিকদের কিছুটা সময় দেওয়ার পক্ষে মত দেন।
হোটেল মালিকদের একজন জানান, তাঁর হোটেলে প্রায় ৫০ জন বাংলাদেশি পর্যটক অবস্থান করছিলেন। সোমবার তাঁদের হোটেল ছাড়তে বলা হয়। একইভাবে নিউমার্কেটের এক কর্মচারী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, আগুনের ঘটনা একটি হোটেলে ঘটলেও তার প্রভাব আশপাশের হোটেল ও কর্মীদের ওপর পড়ছে।
ঢাকার বাসিন্দা নাসিব পাপ্পু চিকিৎসার জন্য কলকাতায় গিয়ে এমন পরিস্থিতিতে পড়েন। তিনি জানান, বাংলাদেশ থেকে কলকাতায় গিয়ে হোটেলে ওঠার পর বাইরে থেকে ফিরে জানতে পারেন, থানার নির্দেশে তাঁকে হোটেল ছাড়তে হবে। পরদিন সকাল ১০টার মধ্যে তাঁকে হোটেল ছাড়তে হয়।
তাঁর মতে, দীর্ঘদিন পর পর্যটন ভিসা চালু হওয়ার পর এমন পরিস্থিতি বাংলাদেশি পর্যটকদের কলকাতায় আসার বিষয়ে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করতে পারে।
গত ১৮ আগস্ট গভীর রাতে নিউমার্কেটের ১৫জি মির্জা গালিব স্ট্রিটের ‘শিখা ইন’ হোটেলে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে নয়জনের মৃত্যু হয়। তাঁদের মধ্যে সাতজন বাংলাদেশি নাগরিক এবং দুজন ভারতীয়।
নিহত বাংলাদেশিরা হলেন- আকরাম আলী, দেবাশীষ দত্ত, আফসানা শিরমিন, সর্নাশীষ দত্ত, বাবু আহমেদ, রেবতী সরকার ও এস এম আলিমুজ্জামান। ভারতীয় দুজন হলেন ঝাড়খণ্ডের সন্দীপ পাশওয়ান ও শিলিগুড়ির যোগ নারায়ণ আগারওয়াল।
প্রশাসনের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, পর্যটকদের নিরাপত্তার ক্ষেত্রে কোনো ধরনের আপস করা হবে না। অগ্নিনিরাপত্তা বিধি না মানা হোটেলের বিরুদ্ধে অভিযান অব্যাহত থাকবে। তবে পর্যটকদের দুর্ভোগ কমাতে দ্রুত বিকল্প ব্যবস্থা ও নিরাপদ আবাসনের সুযোগ নিশ্চিত করার দাবি উঠেছে।
দেশবার্তা/এসআইএস/একে