বাংলাদেশ রেলওয়ের নিরাপত্তা বাহিনী (আরএনবি) পূর্বাঞ্চলে বদলি-বাণিজ্য ও মাসিক চাঁদা আদায়ের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের তীর আরএনবির পূর্বাঞ্চলের চিফ কমান্ড্যান্ট মো. জহিরুল ইসলামের দিকে।
সংশ্লিষ্ট সদস্যদের অভিযোগ, রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের ১৫টি চৌকি থেকে নিয়মিত মাসিক চাঁদা আদায় করা হয়। প্রতিটি চৌকি থেকে মাসে ৩০ হাজার টাকা করে নেওয়া হলে মোট আদায়ের পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় সাড়ে ৪ লাখ টাকা। সে হিসাবে বছরে আদায়ের পরিমাণ প্রায় ৫৪ লাখ টাকা।
বিশেষ সূত্রে জানা গেছে, কোনো চৌকি থেকে নির্ধারিত চাঁদা দিতে দেরি হলে দায়িত্বে থাকা সদস্যদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক বদলির ব্যবস্থা নেওয়া হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। সংশ্লিষ্টদের দাবি, শাস্তিমূলক বদলি থেকে রক্ষা পেতে ৫০ হাজার টাকা থেকে শুরু করে কয়েক লাখ টাকা পর্যন্ত দেওয়ার বিনিময়ে বদলি ঠেকানোর সুযোগ মিলছে। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে আরএনবির সাধারণ সদস্যদের মধ্যে ক্ষোভ বিরাজ করছে।
আরএনবির কয়েকজন সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, চট্টগ্রাম রেলওয়ে অফিসার্স ক্লাবে প্রায় প্রতি রাতেই জুয়ার আসর বসে। তাদের দাবি, চিফ কমান্ড্যান্ট ওই ক্লাবের নিয়মিত সদস্য। তারা প্রশ্ন তোলেন, তার নিয়মিত সদস্যপদ ও ক্লাবের কার্যক্রমে অর্থের উৎস কী।
তারা আরও অভিযোগ করেন, সম্প্রতি নিয়মনীতি অনুসরণ না করেই একের পর এক পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে। বাহিনীর অভ্যন্তরে বিষয়টি ‘র্যাঙ্ক বাণিজ্য’ নামে পরিচিত হয়ে উঠেছে। তাদের দাবি, জ্যেষ্ঠতা বা প্রচলিত নিয়মনীতি অনুসরণ করা হচ্ছে না এবং কোনো পরীক্ষাও নেওয়া হচ্ছে না। ৫০ হাজার টাকা থেকে দুই লাখ টাকার বিনিময়ে হাবিলদার থেকে এএসআই এবং এএসআই থেকে এসআই পদে পদোন্নতি দেওয়া হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন তারা।
অভিযোগকারীদের ভাষ্য, তিন থেকে চার বছর আগে নায়েক পদে চূড়ান্ত করার কথা বলে সদস্যদের কাছ থেকে টাকা নেওয়া হয়েছিল। তবে সেই পদায়ন হয়নি এবং অর্থও ফেরত দেওয়া হয়নি। তাদের দাবি, গোপন তদন্ত হলে আরও অনেক তথ্য বেরিয়ে আসবে।
সংশ্লিষ্ট কয়েকজন সদস্য জানান, বাহিনীতে বদলি এখন আর শুধু প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়; অনেক ক্ষেত্রে এটি হয়ে উঠেছে ‘আর্থিক সমঝোতার’ বিষয়। কেউ পছন্দের স্টেশনে যেতে চাইলে বা বদলি বাতিল করতে চাইলে নির্দিষ্ট ব্যক্তিদের মাধ্যমে যোগাযোগ করতে হয়। অভিযোগের বিষয়ে মুখ খুললে বিভাগীয় শাস্তি বা হয়রানির আশঙ্কায় অনেকেই নীরব থাকেন।
অভিযোগ রয়েছে, ২০২৪ সালের ছাত্র আন্দোলনের পর জোর তদবিরের মাধ্যমে জহিরুল ইসলাম ২০২৫ সালের ৮ ডিসেম্বর পশ্চিমাঞ্চল থেকে পূর্বাঞ্চলে চিফ কমান্ড্যান্ট হিসেবে যোগ দেন। এরপর গত কয়েক মাসে আরএনবিতে বিপুলসংখ্যক বদলি ও পদায়ন হয়েছে। এর মধ্যে বেশ কয়েকটি বদলির ক্ষেত্রে অর্থ লেনদেন হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
২০২৬ সালে একাধিক দফায় আরএনবির সদস্য ও হাবিলদারদের বদলির তথ্য প্রকাশ্যে আসে। ৫ জানুয়ারি তিনজন, ১৮ জানুয়ারি তিনজন, ২১ জানুয়ারি চারজন এবং ২৬ জানুয়ারি চারজন সিপাহিকে বদলি করা হয়।
সংশ্লিষ্টদের দাবি, সিপাহি সুমন দাশ গুপ্ত মাত্র ছয় মাস আগে আরএনবির আইবিতে যোগ দেওয়ার পর এক বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই পটিয়া রেলওয়ে স্টেশনে বদলি হয়েছেন। একইভাবে মীর হোসাইনকে ২০২৫ সালের ২৬ এপ্রিল লাকসাম থেকে চট্টগ্রাম রেলওয়ে স্টেশনে বদলি করা হয়। এক বছরের কিছু বেশি সময় পর ২০২৬ সালের ১৪ জুন তাকে আবার লাকসামে বদলি করা হয়। এসব বদলির ক্ষেত্রেও আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ করেছেন সংশ্লিষ্টরা।
এ ছাড়া ২০২৫ সালের ৭ আগস্ট পাহাড়তলী রেলওয়ে স্টেশনে যোগ দেওয়া আনন্দ বড়ুয়াকে এক বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই চলতি বছরের ৯ জুন পটিয়া রেলওয়ে স্টেশনে বদলি করা হয়। নির্ধারিত কর্মস্থলে ন্যূনতম দায়িত্বকাল শেষ হওয়ার আগেই কেন বারবার এসব বদলি হচ্ছে, তা নিয়ে আরএনবির সদস্যদের মধ্যে প্রশ্ন রয়েছে।
জহিরুল ইসলামের বিরুদ্ধে বদলি-বাণিজ্যের অভিযোগ নতুন নয়। ২০২৪ সালের আগস্টে তাকে পূর্বাঞ্চল থেকে পশ্চিমাঞ্চলে বদলি করা হলে আরএনবির সদস্যদের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছিল।
জহিরুল ইসলামের বিরুদ্ধে অভিযোগের তালিকায় আরএনবিতে ১৮৫ জন সিপাহি নিয়োগে অনিয়মের মামলাও রয়েছে। ২০১৭ সালের নিয়োগে অনিয়মের অভিযোগের অনুসন্ধান শেষে ২০২২ সালের ২৮ আগস্ট দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) জহিরুল ইসলামসহ পাঁচজনের বিরুদ্ধে মামলা করে।
মামলায় তাকে নিয়োগ কমিটির সদস্য হিসেবে আসামি করা হয়। নিয়োগ কমিটির সদস্যদের বিরুদ্ধে যোগ্য প্রার্থীকে বাদ দিয়ে অযোগ্য প্রার্থীকে উত্তীর্ণ দেখানোর অভিযোগ আনা হয়েছিল।
নিয়োগ-সংক্রান্ত মামলার পাশাপাশি জহিরুল ইসলাম ও তার স্ত্রী কাজী জিন্নাতুন নাহারের সম্পদের বিষয়েও অনুসন্ধান করে দুদক। অনুসন্ধানে তাদের নামে প্রায় সোয়া চার কোটি টাকার সম্পদের তথ্য পাওয়া গেছে।
ওই অনুসন্ধানে মিরপুরের সেনপাড়া মৌজায় একটি বাড়িতে অংশীদারত্ব, ঢাকার শহীদবাগ ও উত্তরা এলাকায় ফ্ল্যাট এবং একটি গাড়ির তথ্য উল্লেখ করা হয়। তার স্ত্রীর নামেও কুমিল্লা ও ঢাকায় একাধিক সম্পদের তথ্য উঠে আসে।
জহিরুল ইসলাম ১৯৯০ সালে বাংলাদেশ পাবলিক সার্ভিস কমিশনের মাধ্যমে সাঁটমুদ্রাক্ষরিক কাম টাইপিস্ট পদে চাকরিতে যোগ দেন। ২০০০ সালে দ্বিতীয় শ্রেণির পদে পদোন্নতি পান। ২০০২ সালের ১০ সেপ্টেম্বর ২১তম বিসিএস নন-ক্যাডারের মাধ্যমে সহকারী কমান্ড্যান্ট পদে যোগ দেন। ২০০৬ সালে কমান্ড্যান্ট এবং ২০২০ সালে চিফ কমান্ড্যান্ট পদে দায়িত্ব পান।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে আরএনবির (পূর্ব) চিফ কমান্ড্যান্ট মো. জহিরুল ইসলাম মাসিক চাঁদা আদায় ও বদলি-বাণিজ্যের অভিযোগকে ‘উদ্দেশ্যপ্রণোদিত’ ও ‘সঠিক নয়’ বলে দাবি করেন। তবে রেলওয়ে অফিসার্স ক্লাবের নিয়মিত জুয়ার আসরের সদস্য কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি কোনো সন্তোষজনক উত্তর দেননি।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ রেলওয়ের মহাপরিচালক (ডিজি) আফজাল হোসেন বলেন, প্রথমে পূর্বাঞ্চলের মহাব্যবস্থাপকের (জিএম) সঙ্গে কথা বলতে হবে। তিনি আরও বলেন, “আমি এই মুহূর্তে বিষয়টি যাচাই করার অবস্থানে নেই। আপনার কাছে যদি এ বিষয়ে কোনো প্রামাণ্য নথি বা দলিলভিত্তিক প্রমাণ থাকে, তাহলে আপনি এগিয়ে যেতে পারেন।”
এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে বাংলাদেশ রেলওয়ের পূর্বাঞ্চলের মহাব্যবস্থাপককে (জিএম) মোবাইল ফোনে একাধিকবার কল ও এসএমএস করা হলেও তিনি সাড়া দেননি। ফলে তার বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।
প্রতিনিধি/আরএইচ