সুনাই নদীর বুকে এবারও ভাসবে রঙিন পালতোলা নৌকা, উঠবে বৈঠার ছন্দ; তবে এ আয়োজনই হতে যাচ্ছে শেষবারের মতো। সিলেটের বিয়ানীবাজার উপজেলার লাউতা ইউনিয়নের সুনাই নদীতে আগামী ২৮ আগস্ট পূর্বনির্ধারিত সময়েই অনুষ্ঠিত হবে ঐতিহ্যবাহী নৌকাবাইচ। তবে স্থানীয়ভাবে হওয়া সমঝোতার শর্ত অনুযায়ী, আগামী বছর থেকে সুনাই নদীতে আর নৌকাবাইচ আয়োজন করা হবে না।
নৌকাবাইচকে কেন্দ্র করে সাম্প্রতিক সময়ে তৈরি হওয়া জটিলতার অবসান ঘটেছে স্থানীয়দের উদ্যোগে অনুষ্ঠিত এক সমঝোতা বৈঠকের মধ্য দিয়ে। শনিবার (২২ আগস্ট) এশার নামাজের পর বারইগ্রাম বাজারে পূবালী ব্যাংক পিএলসি’র নিচতলায় অনুষ্ঠিত বৈঠকে দীর্ঘ আলোচনার পর এ সিদ্ধান্তে পৌঁছানো হয়।
বৈঠকে লাউতা ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রামের যুবক, মুরব্বি, জনপ্রতিনিধি ও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন। লাউতা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান দেলওয়ার হোসেনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় স্থানীয় নেতৃবৃন্দ নৌকাবাইচকে ঘিরে সৃষ্ট পরিস্থিতি, স্থানীয়দের মতামত এবং ভবিষ্যতে এমন বিরোধ এড়ানোর উপায় নিয়ে আলোচনা করেন।
আলোচনায় বক্তারা বলেন, নৌকাবাইচ এ অঞ্চলের বহুদিনের ঐতিহ্য। নদীর ঢেউয়ের সঙ্গে বৈঠার ছন্দ আর মানুষের উচ্ছ্বাস; এই আয়োজন শুধু একটি প্রতিযোগিতা নয়, বরং গ্রামীণ সংস্কৃতি ও সম্প্রীতিরও অংশ। তাই কোনো মতপার্থক্য যেন স্থানীয় শান্তি, সৌহার্দ্য ও সম্প্রীতিতে ফাটল ধরাতে না পারে, সে বিষয়ে সবাইকে দায়িত্বশীল হতে হবে।
তবে সমঝোতা বৈঠকে নৌকাবাইচ বন্ধের দাবিতে প্রতিবাদকারী মাওলানা নুরুর রহমান মাসুক, জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশের বিয়ানীবাজার উপজেলা শাখার সেক্রেটারি মাওলানা আব্দুল হক কাসেমি এবং ৩ নম্বর ওয়ার্ড জামায়াতে ইসলামীর সভাপতি হোসেন আহমদ উপস্থিত ছিলেন না।
লাউতা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান দেলওয়ার হোসেন জানিয়েছেন, স্থানীয় পরিস্থিতি বিবেচনায় শান্তিপূর্ণ সমাধানের স্বার্থে তারা সমঝোতায় মত দিয়েছেন। একই সঙ্গে ‘তৌহিদী জনতা’র ব্যানারে প্রতিবাদের বিষয়টিও তারা অস্বীকার করেছেন বলে জানান তিনি।
চেয়ারম্যান দেলওয়ার হোসেন বলেন, ‘এ বছর যথাসময়ে নৌকাবাইচ প্রতিযোগিতা আয়োজনের সুযোগ চেয়েছে আয়োজক সংগঠন বাহাদুর গাংপার যুব সমাজ। তবে তারা আগামী বছর থেকে সুনাই নদীতে আর নৌকাবাইচ আয়োজন করবে না। উভয়পক্ষই এ সিদ্ধান্তে মত দেওয়ায় শান্তিপূর্ণভাবে সমস্যার সমাধান হয়েছে।’
এদিকে নৌকাবাইচের আয়োজক কমিটির সাধারণ সম্পাদক আমিনুল ইসলাম জানিয়েছেন, আগামী ২৮ আগস্ট পূর্বনির্ধারিত সময়েই প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হবে। তিনি বলেন, ‘নৌকাবাইচ যথাসময়েই অনুষ্ঠিত হবে। এ নিয়ে কেউ বিভ্রান্ত হবেন না।’
তার ভাষ্য, স্থানীয়দের সহযোগিতা ও পারস্পরিক আলোচনার মাধ্যমে জটিলতার সমাধান হয়েছে। এখন নির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী প্রতিযোগিতা আয়োজনের প্রস্তুতি চলছে।
তবে বিষয়টি নিয়ে ভিন্ন অবস্থানের কথা জানিয়েছেন বিয়ানীবাজার থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) আবু জাফর মোহাম্মদ মাহফুজুল করিম। তিনি বলেন, বিষয়টির শান্তিপূর্ণ সমাধান হয়েছে বলে তিনি জেনেছেন। তবে আগামী বছর থেকে নৌকাবাইচ আয়োজন করা হবে না; এমন শর্তে সমঝোতার বিষয়টি তার জানা নেই।
নৌকাবাইচ বন্ধের দাবি জানানো মাওলানা নুরুর রহমান মাসুক, মাওলানা আব্দুল হক কাসেমি ও হোসেন আহমদের বক্তব্য নেওয়ার চেষ্টা করা হলেও তাদের পাওয়া যায়নি।
তাই আগামী ২৮ আগস্ট সুনাই নদীর বুকে যখন শেষবারের মতো বৈঠার ছলাৎছল শব্দ উঠবে, তখন হয়তো তা শুধু একটি প্রতিযোগিতার দৃশ্য হবে না; হয়ে থাকবে একটি দীর্ঘদিনের ঐতিহ্যের শেষ অধ্যায়ের স্মৃতি। এ বছর নৌকা নামবে, বৈঠা চলবে, নদীর পাড়ে জমবে মানুষের ভিড়; কিন্তু আগামী বছর সেই চেনা দৃশ্য আর ফিরবে না।
প্রতিনিধি/আরএইচ