মজুত থাকা সত্ত্বেও রোগীকে স্যালাইন না দেওয়া এবং বাইরে থেকে স্যালাইন কিনে আনায় রোগীকে টাকা ফেরত দিয়েছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন।
রোববার (২৩ আগস্ট) সকাল সাড়ে ১০টায় ২৫০ শয্যা নওগাঁ জেনারেল হাসপাতাল আকস্মিক পরিদর্শনে গিয়ে এমন ঘটনা ঘটে। পরিদর্শনের সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রী হাসপাতালের বিভিন্ন ওয়ার্ড, অপারেশন থিয়েটার, ফার্মেসি ও রান্নাঘর ঘুরে দেখেন এবং রোগীদের সঙ্গে কথা বলেন।
পরিদর্শনে রোগীদের কাছ থেকে সার্বিক সেবার মান নিয়ে সন্তোষজনক প্রতিক্রিয়া পাওয়া গেলেও বেশ কিছু অনিয়ম ও সীমাবদ্ধতা মন্ত্রীর নজরে আসে।
মন্ত্রী জানান, ২৫০ শয্যার হাসপাতাল হলেও খাবার বরাদ্দ পাওয়া যাচ্ছে ১০০ শয্যার। এই সংকট দূর করতে এবং খাবারের মান বাড়াতে বরাদ্দ প্রতি বেডে ১৭৫ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২৫০ টাকা করা হচ্ছে। এক চিকিৎসক ৪৫ মিনিট দেরিতে আসায় এবং একজন নার্স বিনামূল্যে স্যালাইন থাকা সত্ত্বেও রোগীকে বাইরে থেকে কিনতে বলায় তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেন তিনি।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, “বিগত ১৭ বছর এই খাতে কোনো জবাবদিহিতা ছিল না। আমরা মাত্র ৬ মাসে এই খাতে শৃঙ্খলা ও জবাবদিহিতা ফেরানোর কাজ শুরু করেছি।”
স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেন, উপজেলা ও জেলা পর্যায়ের হাসপাতালে স্বাস্থ্যসেবার পরিধি বাড়াতে বড় ধরনের পদক্ষেপ নিচ্ছে সরকার। ডায়ালাইসিস সুবিধা তৃণমূল পর্যায়ে পৌঁছানো, শয্যা সংখ্যা বৃদ্ধি এবং চিকিৎসকদের তীব্র সংকট দূর করতে আড়াই হাজার নার্স ও আড়াই হাজার ফার্মাসিস্টসহ প্রায় ৯ হাজার ৫০০ নতুন জনবল নিয়োগের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।
ডায়ালাইসিস সেবার মান উন্নত করার মাধ্যমে বিশেষ করে ঢাকার ওপর নির্ভরশীলতা কমানোর পরিকল্পনা হাতে নেওয়া হয়েছে। স্বাস্থ্যমন্ত্রী জানান, দেশের প্রতিটি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ৫০টি এবং জেলা সদর হাসপাতালগুলোতে ১০টি করে ডায়ালাইসিস বেড স্থাপন করা হবে। ইতিমধ্যে মেশিন কেনার টেন্ডার প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে এবং আগামী তিন মাসের মধ্যেই জেলা পর্যায়ে ডায়ালাইসিস সেবা চালুর লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। জেলা পর্যায়ে ৬০টি ডায়ালাইসিস মেশিন দৈনিক তিন শিফটে প্রায় ১৮০ জন রোগীকে সেবা দিতে পারবে। এ ছাড়া আগামী দুই বছরের মধ্যে উপজেলা পর্যায় পর্যন্ত ১০টি করে ডায়ালাইসিস বেড চালুর পরিকল্পনা রয়েছে।
হাসপাতালগুলোর অবকাঠামো ও আধুনিকায়নে উপজেলা পর্যায়ে শয্যা সংখ্যা ৫০ থেকে বৃদ্ধি করে ১৫১ শয্যা করার সংশোধিত ডিপিপি অনুমোদন ও টেন্ডারের প্রক্রিয়ায় রয়েছে। প্রতিটি ১৫১ শয্যার উপজেলা হাসপাতালে প্রসূতিদের চিকিৎসায় ২৫টি এবং শিশুদের জন্য আলাদা ২০টি বিশেষ শয্যা থাকবে। নারী ও পুরুষের জন্য আলাদা ফিজিওথেরাপি ওয়ার্ড এবং সমলিঙ্গের ফিজিওথেরাপিস্ট ও চিকিৎসকদের তত্ত্বাবধান থাকবে। আধুনিক আল্ট্রাসাউন্ড ও উন্নত প্যাথলজি ল্যাবসমৃদ্ধ নয়তলা বিশিষ্ট নতুন ভবনও থাকবে।
স্বাস্থ্য খাতের দীর্ঘদিনের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ‘জনবল সংকট’ নিরসনে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার কথা জানিয়ে মন্ত্রী বলেন, জনসেবা নিশ্চিত করতে খুব শিগগিরই ৫ হাজার নতুন চিকিৎসক নিয়োগের সব আনুষ্ঠানিকতা শেষ হয়েছে। পাশাপাশি পাবলিক সার্ভিস কমিশনের (পিএসসি) মাধ্যমে আরও চিকিৎসক নিয়োগের মৌখিক পরীক্ষা চলছে। নার্স ও ফার্মাসিস্টসহ আগামী এক বছরের মধ্যে দেশের স্বাস্থ্য খাত একটি বড় ও দক্ষ চিকিৎসাবহর পাবে বলে আশা প্রকাশ করা হয়।
প্রাইভেট ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলোর অনুমোদনহীন কার্যক্রম এবং অনিয়ম রোধে কঠোর জবাবদিহিতা নিশ্চিতের তাগিদ দিয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, নিবন্ধনের শর্ত না মানলে কঠোর আইনি ব্যবস্থা এবং ডিসি-সিভিল সার্জনদের সমন্বয়ে দেশব্যাপী মোবাইল কোর্ট অভিযান জোরদার করা হচ্ছে। স্বাস্থ্য খাতকে আরও সুসংগঠিত ও আধুনিক পর্যায়ে নিয়ে যেতে সংশ্লিষ্টদের দায়িত্বশীল ভূমিকা পালনের আহ্বান জানান তিনি।
এ সময় নওগাঁ-৫ (সদর) আসনের সংসদ সদস্য ও হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি জাহিদুল ইসলাম ধলু, জেলা প্রশাসক মো. সাইফুল ইসলাম, ২৫০ শয্যা নওগাঁ জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. আঃ মঃ আখতারুজ্জামান, সিভিল সার্জন ডা. মো. আমিনুল ইসলাম ও অতিরিক্ত পুলিশ সুপার জয়ব্রত পালসহ স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
প্রতিনিধি/আরএইচ