বিকেল হলেই জমে উঠত টাউন হল চত্বর। কেউ আসতেন নাটকের মহড়ায়, কেউ নাচ-গানের ক্লাসে, আবার কোথাও চলত আবৃত্তির অনুশীলন। শিশু-কিশোরদের কলকাকলি, শিল্পীদের মহড়া আর নানা সাংস্কৃতিক আয়োজনে প্রতিদিন বিকেল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত মুখর থাকত বরগুনা টাউন হল পৌর অডিটরিয়াম।
একসময় এই মঞ্চকে ঘিরেই গড়ে উঠেছিল বরগুনার সাংস্কৃতিক অঙ্গনের প্রাণবন্ত পরিবেশ। কিন্তু সেই চিত্র এখন অতীত। পুরোনো ভবনটি ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ার পর নতুন ৫০০ আসনের আধুনিক অডিটরিয়াম নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হলেও আট বছরেও শেষ হয়নি কাজ। বর্তমানে নির্মাণকাজ পুরোপুরি বন্ধ।
দুই বছরের মধ্যে কাজ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও নির্ধারিত সময় পেরিয়ে গেছে ছয় বছর আগে। অথচ এখনো অডিটরিয়ামটি চালু হওয়ার অপেক্ষায় সংস্কৃতিকর্মীরা। কবে নাগাদ নির্মাণ শেষ হবে, সেই প্রশ্নেরও স্পষ্ট উত্তর দিতে পারছে না বরগুনা পৌর কর্তৃপক্ষ।
বরগুনার প্রবীণ সংস্কৃতিকর্মী ও স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, টাউন হল পৌর অডিটরিয়াম একসময় শুধু অনুষ্ঠান আয়োজনের স্থান ছিল না; এটি ছিল জেলার সাংস্কৃতিক চর্চার অন্যতম প্রধান কেন্দ্র।
বিকেল নামলেই সেখানে শুরু হতো বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠনের কার্যক্রম। শিশু-কিশোরদের নাচ, গান ও আবৃত্তির ক্লাস থেকে শুরু করে নাটকের মহড়া—সব মিলিয়ে পুরো অডিটরিয়াম চত্বর পরিণত হতো সাংস্কৃতিক মিলনস্থলে। নিয়মিত নাটক, সংগীতানুষ্ঠান, আবৃত্তি ও বিভিন্ন সামাজিক-সাংস্কৃতিক আয়োজনের কারণে জায়গাটি ছিল শিল্পী ও সংস্কৃতিকর্মীদের সরব উপস্থিতিতে ভরা।
এই মঞ্চ থেকেই বরগুনার অনেক শিল্পী ও সংস্কৃতিকর্মী নিজেদের সাংস্কৃতিক পথচলা শুরু করেছেন। কেউ পরবর্তীতে জেলা ছাড়িয়ে জাতীয় পর্যায়েও কাজ করার সুযোগ পেয়েছেন।
নাট্য অভিনেতা রতন সাহা বলেন, “মুক্তিযুদ্ধের সময় সিরাজ উদ্দিন আহম্মেদ বরগুনা মহকুমার প্রথম শ্রেণীর ম্যাজিস্ট্রেট এবং পরে ১৯৭৩ থেকে ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত মহকুমার এসডিও হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর দায়িত্বকালে স্থানীয় ব্যবসায়ী, সাংস্কৃতিক কর্মীসহ বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার মানুষের সহযোগিতায় প্রতিষ্ঠিত হয় সিরাজ উদ্দিন মিলনায়তন, যা স্থানীয়ভাবে টাউন হল নামে পরিচিত।”
তিনি বলেন, “প্রতিষ্ঠার পর থেকেই টাউন হল বরগুনার মানুষের আবেগ, স্মৃতি ও সাংস্কৃতিক চর্চার অন্যতম প্রধান কেন্দ্র হয়ে ওঠে। এখানেই দীর্ঘদিন শিল্প, সাহিত্য, নাটক, বিনোদনসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক আয়োজন অনুষ্ঠিত হয়েছে। এই মঞ্চ থেকেই অনেক শিল্পী ও সাংস্কৃতিক কর্মীর পথচলা শুরু হয়েছে। জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারপ্রাপ্ত অভিনেতা মীর সাব্বিরসহ তিনিও এই মঞ্চে নাট্যচর্চা শুরু করেন।”
পুরোনো ভবনটি ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ায় বরগুনা পৌরসভা নতুন করে আধুনিক অডিটরিয়াম নির্মাণের উদ্যোগ নেয়। সরকারের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) অর্থায়নে ৫০০ আসনের নতুন ভবন নির্মাণের কাজ শুরু হয় ২০১৮ সালে।
নির্মাণকাজের দায়িত্ব পায় যৌথ ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এএসি অ্যান্ড এনটি জেভি। চুক্তি অনুযায়ী ৭ কোটি ২ লাখ ৫০ হাজার টাকা ব্যয়ে প্রকল্পটির কাজ ২০২০ সালের ২৭ মার্চের মধ্যে শেষ করার কথা ছিল।
কিন্তু নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ হয়নি। এরপর আরও ছয় বছর পেরিয়ে গেলেও ভবনটি পূর্ণাঙ্গভাবে নির্মিত হয়নি। এরই মধ্যে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে ৪ কোটি ৭৯ লাখ ৯৯ হাজার টাকার বিল পরিশোধ করা হয়েছে।
বর্তমানে কাজ বন্ধ থাকায় প্রকল্পটির ভবিষ্যৎ নিয়েই দেখা দিয়েছে অনিশ্চয়তা।
বরগুনা খেলাঘরের সাধারণ সম্পাদক মুশফিক আরিফ বলেন, “টাউন হলের সঙ্গে বরগুনার মানুষের সাংস্কৃতিক স্মৃতি অনেক গভীর। একটা সময় এই জায়গাটিকে ঘিরে প্রতিদিনই কোনো না কোনো সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড চলত। বিশেষ করে বিকাল হলেই পুরো টাউন হল অডিটরিয়াম যেন একটি সাংস্কৃতিক উৎসবে পরিণত হতো।”
বরগুনা থিয়েটারের সভাপতি মনিরুজ্জামান মুনির বলেন, “বরগুনার নাট্যচর্চার ইতিহাসের সঙ্গে টাউন হলের মঞ্চ গভীরভাবে জড়িত। এখানে নিয়মিত নাটকের মহড়া ও মঞ্চায়ন হতো। অনেক শিল্পী এই মঞ্চে দাঁড়িয়েই নিজেদের তৈরি করেছেন। নতুন অডিটরিয়াম নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়ার পর আমরা ভেবেছিলাম, নাট্যচর্চার জন্য আরও আধুনিক ও বড় পরিসর তৈরি হবে।”
তিনি বলেন, “কিন্তু এত বছরেও নির্মাণকাজ শেষ না হওয়ায় আমরা হতাশ। একটি শহরের সাংস্কৃতিক বিকাশের জন্য যেমন রাস্তা, ভবন ও অন্যান্য অবকাঠামো প্রয়োজন, তেমনি একটি স্থায়ী সাংস্কৃতিক মঞ্চও প্রয়োজন। অডিটরিয়ামটি দ্রুত চালু হলে নাটক, সংগীত, আবৃত্তিসহ বিভিন্ন সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড আবার নিয়মিত করা সম্ভব হবে।”
নজরুল পরিষদের সাধারণ সম্পাদক ইফতেখার শাহিন বলেন, “একসময় এই টাউন হলেই আমরা জাতীয় পর্যায়ের বিভিন্ন অনুষ্ঠান করেছি। আমাদের সংগঠন থেকে এখানে গানের ক্লাস ও বিভিন্ন প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হতো। টাউন হলকে ঘিরে নাটকও হয়েছে। তখন এটি ছিল বরগুনার সাংস্কৃতিক চর্চার অন্যতম প্রধান স্থান। অথচ এখন সেই জায়গাটি অনেকটা গুদামঘরে পরিণত হয়েছে। সন্ধ্যার পর এখানে মাদকসেবীদের আড্ডা বসে বলে আমরা অভিযোগ পাই। সপ্তাহে দুই দিন গরু-ছাগলের হাটও বসে। যে জায়গায় একসময় সংস্কৃতিকর্মীদের মিলনমেলা হতো, সেখানে এখন গরু-ছাগল চরতে দেখা যায়, এটা আমাদের জন্য অত্যন্ত কষ্টের।”
তিনি আরও বলেন, “বরগুনায় সংস্কৃতিকর্মীদের নিয়মিত চর্চার জন্য শিল্পকলা একাডেমি ছাড়া তেমন উপযুক্ত জায়গা নেই। তাই আমাদের দাবি, নির্মাণকাজের জটিলতা দ্রুত নিরসন করে টাউন হল অডিটরিয়ামটি ব্যবহার উপযোগী করা হোক।”
বরগুনা পৌরসভার নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ মাসুম বিল্লাহ বলেন, “ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে একাধিকবার কাজ শেষ করার জন্য তাগাদা দেওয়া হয়েছে। কিন্তু তারা কাজ এগিয়ে নিতে আগ্রহ দেখাচ্ছে না। ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের কারণে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের লোকজন অনেকটা গা-ঢাকা দিয়েছেন বলেও জানান তিনি।”
তিনি বলেন, “বিষয়টি নিয়ে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা চাওয়া হবে।”
তবে পৌর কর্তৃপক্ষের এই বক্তব্য অস্বীকার করেছেন ঠিকাদার মো. আবুল হোসেন খান। তাঁর দাবি, অডিটরিয়াম নির্মাণের জন্য বরাদ্দ করা অর্থ পৌর কর্তৃপক্ষ অন্য প্রকল্পে ব্যয় করেছে। ফলে কাজ শেষ করলেও বিল পাওয়া নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে।
ঠিকাদারের ভাষ্য, বরাদ্দের অর্থ ও কাজের বিপরীতে বিল পরিশোধের নিশ্চয়তা দেওয়া হলে তিনি আবার নির্মাণকাজ শুরু করতে প্রস্তুত।
বরগুনা পৌরসভার প্রশাসক সজল চন্দ্র শীল বলেন, “নির্মাণকাজ শেষ করার জন্য ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে কয়েকবার চিঠি দেওয়া হয়েছে। কিন্তু কোনো জবাব পাওয়া যায়নি। বিষয়টি নিয়ে পরবর্তী ব্যবস্থা নিতে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে চিঠি দেওয়া হয়েছে। মন্ত্রণালয় থেকে যে নির্দেশনা দেওয়া হবে, সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
দুই বছরের মধ্যে শেষ হওয়ার কথা থাকা একটি অডিটরিয়ামের জন্য আট বছর ধরে অপেক্ষা করছেন বরগুনার সংস্কৃতিকর্মীরা। তাঁদের কাছে এটি কেবল একটি নির্মাণাধীন ভবন নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে জেলার সাংস্কৃতিক চর্চার অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ। সংস্কৃতিকর্মীদের প্রত্যাশা, পৌর কর্তৃপক্ষ, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সমন্বয়ে দ্রুত জটিলতার অবসান হবে। আবারও বিকেল নামলে টাউন হল চত্বরে শোনা যাবে শিশু-কিশোরদের নাচ-গানের সুর, ভেসে আসবে আবৃত্তির শব্দ, মঞ্চে চলবে নাটকের মহড়া।
প্রতিনিধি/আরএইচ