ডিজিটাল বাংলাদেশে ই-গভর্ন্যান্সের মাধ্যমে দ্রুত ও হয়রানিমুক্ত নাগরিক সেবা দেওয়ার কথা থাকলেও মাঠপর্যায়ের চিত্র ভিন্ন। ইউনিয়ন ও উপজেলা পর্যায়ে ই-সেবা নিতে গিয়ে নাগরিকরা তথ্য ফাঁসের আতঙ্ক, ম্যানুয়াল পদ্ধতির বাধ্যবাধকতা ও নানামুখী হয়রানির মুখোমুখি হচ্ছেন।
বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডির) প্রকাশিত এক গবেষণায় এ চিত্র উঠে এসেছে। সোমবার রাজধানীর গুলশানের একটি হোটেলে 'এস্টাবলিশিং ইফেক্টিভ অ্যান্ড অ্যাকাউন্টাবল ই-গভর্নেন্স টু স্ট্রেন্থেন লোকাল গভর্নমেন্ট ইনস্টিটিউশনস বাই ফুলফিলিং দ্য নিডস অব ইউথ, জেন্ডার, অ্যান্ড মার্জিনালাইজড কমিউনিটিস' শীর্ষক অনুষ্ঠানে প্রতিবেদনটি প্রকাশ করা হয়। অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সিপিডির রিসার্চ ফেলো তামিম আহমেদ ও গবেষণা সহকারী সাবিনা শারমিন।
গবেষণায় দেখা যায়, অনলাইন আবেদনের সুবিধা থাকলেও সেবা পেতে সশরীরে কার্যালয়ে উপস্থিত হওয়া লাগছে। সেবাগ্রহীতা নারীদের মাত্র ৩১.৯ শতাংশ এবং যুবদের ১৭.৮ শতাংশ শেষ পর্যন্ত পুরোপুরি অনলাইনে সেবা পেয়েছেন। বিপরীতে আবেদন করার পরও ৫৪.৩ শতাংশ নারী ও ৪৭.৭ শতাংশ যুবকে সশরীরে গিয়ে কাগজ জমা দিতে হয়েছে।
অবকাঠামোর চিত্রে দেখা যায়, স্থানীয় সরকার অফিসগুলোর সার্বিক প্রস্তুতি ১০০-এর মধ্যে মাত্র ৩৮.৯, যার মধ্যে পরিকাঠামোগত প্রস্তুতি মাত্র ২৪.১। ইউনিয়ন কৃষি অফিসগুলোতে সচল কম্পিউটার রয়েছে গড়ে ০.১৫টি, যার ৪৪ শতাংশই অচল। ৬৭ শতাংশ ইউনিয়ন পরিষদ ও ৯৭ শতাংশ কৃষি অফিসে বিদ্যুৎ না থাকলে কোনো আইপিএস বা জেনারেটর ব্যাকআপ নেই। আঞ্চলিক হিসেবে ই-গভর্ন্যান্স প্রস্তুতিতে ময়মনসিংহের স্কোর ৫৭.৩ হলেও রংপুরে তা সর্বনিম্ন ৮.৮।
তথ্য নিরাপত্তার বিষয়ে বলা হয়, সেবা নেওয়ার পর ৫৮ শতাংশ নারী অনিরাপদ বোধ করেন এবং ৭৩.২ শতাংশ নারী তথ্য ফাঁসের আতঙ্কে ভোগেন। এমনকি তথ্য দেওয়ার পর ৬১.০ শতাংশ নারী অপব্যবহার ও অনাকাঙ্ক্ষিত যোগাযোগের শিকার হয়েছেন। সঠিক প্রতিকার ব্যবস্থা না থাকায় ৮৩.৩ শতাংশ নারী এবং ৭৮.৯ শতাংশ যুব কোনো অভিযোগ দাখিল করেননি।
অনুষ্ঠানে সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন বলেন, ‘ডিজিটাল মাধ্যমে নাগরিকরা তাদের সেবা পাওয়া, সিদ্ধান্ত গ্রহণে অংশগ্রহণ এবং প্রতিষ্ঠানগুলোকে জবাবদিহির আওতায় আনার যদি সুযোগ বাড়াতে পারে, তাহলে সেটাকে কার্যকর ডিজিটালাইজেশন কিংবা ই-গভর্ন্যান্স আমরা বলতে পারবো। কিন্তু মানুষকে সেবা পেতে বারবার সরকারি অফিসে-দপ্তরে যায়, বারবার যাতায়াত করে। এতে সময় নষ্ট হয়; অনেক সময় হয়রানি এবং দুর্নীতিও থাকে।’
তিনি আরও বলেন, ‘আরেকটি বিষয় হচ্ছে ডিজিটাল সুশাসনে কারা কারা এর সুবিধাভোগী হতে পারে। একটি জনগোষ্ঠী হচ্ছে তরুণরা এবং ডিজিটাল সুশাসনে তরুণদের চাহিদাকে কিন্তু বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে। স্থানীয় সরকার অনলাইন প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে তরুণদের যে কর্মসংস্থান, সেই কর্মসংস্থানের চাহিদা মেটানো, দক্ষতা উন্নয়ন। অংশগ্রহণমূলক বাজেট প্রণয়ন এবং স্থানীয় পরিকল্পনায় তরুণদের মতামত নেওয়ার প্রয়োজন, কারণ তারা জনগোষ্ঠীর একটা অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ।’
নারীদের অন্তর্ভুক্তির বিষয়ে ফাহমিদা বলেন, ‘নারীদের অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করতে এখানে প্রযুক্তির প্রবেশের সুযোগের সঙ্গে সঙ্গে স্মার্টফোন, আর্থিক সেবা এবং ডিজিটাল দক্ষতায় নারীর সুবিধা ও সুযোগ সুবিধা এবং অনলাইন হয়রানি, তথ্যের নিরাপত্তার বিষয়গুলো বিবেচনায় নিতে হবে। ই-গভর্ন্যান্স ব্যবস্থা প্রণয়ন এবং এটার তদারকিতেও নারী জনপ্রতিনিধি ও নারী সংস্থাকে সম্পৃক্ত করতে হবে।
তারপরে হচ্ছে, যারা সমাজের মার্জিনালাইজড জনগোষ্ঠী প্রতিবন্ধী ব্যক্তি, জাতিগত সংখ্যালঘু, নিম্ন আয়ের পরিবার, দুর্গম অঞ্চলের বাসিন্দা ও সীমিত শিক্ষার মানুষ তারাও যেন বাদ না পড়ে এই ই-গভর্ন্যান্সের সেবার মধ্যে তারা যেন অন্তর্ভুক্ত হতে পারে। এই সেবাটা বাংলা এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় স্থানীয় ভাষাতেও দিতে হবে। তাছাড়া কণ্ঠনির্ভর সেবা, প্রতিবন্ধীবান্ধব ব্যবস্থা এবং ইউনিয়ন ডিজিটাল সেন্টারে সহায়তাপ্রাপ্ত সেবারও সুযোগ থাকতে হবে।’
সুশাসন নিশ্চিতের বিষয়ে তিনি মন্তব্য করেন, ‘জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হলে স্থানীয় বাজেট, প্রকল্প ব্যয়, সুবিধাভোগীদের তালিকা, সরকারি ক্রয় এবং সেবা দেওয়ার সময়সীমা উন্মুক্ত করতে হবে, সবাই যাতে অংশগ্রহণ করতে পারে। তাছাড়া নাগরিকদের অভিযোগ, অভিযোগ ট্র্যাকিং, তার অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ এবং সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিলের কার্যকর ডিজিটাল ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।
শুধুমাত্র প্রযুক্তি দিলেই যে সুশাসন অটোমেটিক্যালি হয়ে যাবে সেরকম না। নির্ভরযোগ্য ইন্টারনেট সংযোগ, প্রশিক্ষিত কর্মকর্তা, তথ্যভাণ্ডারের সমন্বয়, সাইবার নিরাপত্তা, ব্যক্তিগত তথ্যের সুরক্ষা এবং সুস্পষ্ট প্রাতিষ্ঠানিক দায়িত্ব নিশ্চিত করতে হবে। ই-গভর্ন্যান্সকে নাগরিক এবং স্থানীয় সরকারের মধ্যে একটা দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক হতে হবে।’
অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন এটুআই-এর সিনিয়র কনসালটেন্ট ফজলুল জাহেদ পাভেল, এমআইএস বিশেষজ্ঞ আমিনুল মহাইমেন ও আইসোশ্যাল-এর চেয়ারপারসন ড. অনন্যা রায়হান।
দেশবার্তা/একে