আর্জেন্টিনা জাতীয় দলের জার্সিতে আর দেখা যাবে না লিওনেল মেসিকে। দীর্ঘ ২০ বছরের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের ইতি টেনে জাতীয় দল থেকে অবসরের ঘোষণা দিয়েছেন এই আর্জেন্টাইন মহাতারকা।
সোমবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত এক আবেগঘন চিঠিতে নিজের সিদ্ধান্তের কথা জানান ৩৯ বছর বয়সী এই ফরোয়ার্ড। নিউইয়র্কের নিউ জার্সি স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত ২০২৬ বিশ্বকাপের ফাইনালে অতিরিক্ত সময়ে ফেরান তোরেসের গোলে স্পেনের কাছে ১-০ ব্যবধানে হারের পর থেকেই মেসির ভবিষ্যৎ নিয়ে জল্পনা চলছিল।
ফাইনালে হারের পরপরই অবশ্য অবসরের সিদ্ধান্ত জানাননি মেসি। গত ২১ জুলাই দেওয়া এক বার্তায় তিনি উল্লেখ করেছিলেন, ফাইনালের পরের যন্ত্রণা কাটতে সময় লাগবে এবং বিশ্বকাপে দলের অর্জন ও সমর্থকদের ভালোবাসাকে তিনি স্মরণীয় করে রাখতে চান।
তবে গত ৮ আগস্ট তার বাবা ও দীর্ঘদিনের এজেন্ট হোর্হে মেসি ৬৮ বছর বয়সে মারা যাওয়ার পর জাতীয় দলে নিজের ফুটবল ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর অনিশ্চয়তার কথা জানান তিনি। বাবার প্রয়াণই শেষ পর্যন্ত তার বিদায়ের সিদ্ধান্তকে আরও দৃঢ় করে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত চিঠিতে মেসি লিখেছেন, দীর্ঘ সময় ধরে ভাবার পর তিনি জাতীয় দল থেকে অবসরের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। সিদ্ধান্তটি তার জন্য অত্যন্ত কষ্টের হলেও এটিই সঠিক সময় বলে মনে করছেন তিনি।
জাতীয় দলের হয়ে সবসময় নিজের সর্বোচ্চটা দেওয়ার কথা স্মরণ করে মেসি জানান, সাম্প্রতিক শিরোপা জয়ের সময় তো বটেই, তার আগেও প্রতিটি ম্যাচে আর্জেন্টিনার জার্সির জন্য নিজের সবটুকু উজাড় করে দিয়েছেন।
মেসির ভাষায়, জাতীয় দলের হয়ে খেলা তার কাছে সবসময়ই ছিল ভালোবাসার বিষয়। তবে এখন মনে হচ্ছে, তার দেওয়ার মতো আর কিছু বাকি নেই। একই সঙ্গে আর্জেন্টিনার নতুন প্রজন্মের ফুটবলারদের জন্য জায়গা করে দেওয়ার কথাও উল্লেখ করেছেন তিনি।
সমর্থকদের উদ্দেশে তিনি জানান, দুই দশক ধরে জাতীয় দলের হয়ে খেলার সময় তাদের যে ভালোবাসা পেয়েছেন, তা কখনো ভুলবেন না। এখন থেকে মাঠের ভেতর নয়, সাধারণ সমর্থক হিসেবে গ্যালারির বাইরে থেকে আর্জেন্টিনাকে সমর্থন করবেন তিনি।
চিঠিতে পরিবার, জাতীয় দলের সতীর্থ, কোচ ও কর্মকর্তাদের ধন্যবাদ জানিয়ে তাদের সঙ্গে কাটানো সময়কে জীবনের অন্যতম স্মরণীয় অধ্যায় হিসেবে উল্লেখ করেছেন মেসি।
লিখেছেন, আর্জেন্টিনার হয়ে পাওয়া সব অর্জন ও স্মৃতি নিয়ে তিনি গর্বিত এবং সতীর্থদের সঙ্গে দেশকে কিছু ‘স্বপ্নের মুহূর্ত’ উপহার দিতে পারাই তার সবচেয়ে বড় তৃপ্তি। শেষে ঈশ্বর তাকে আর্জেন্টাইন হিসেবে জন্ম দেওয়ায় কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে ‘গো আর্জেন্টিনা!’ বার্তা দিয়ে চিঠি শেষ করেন তিনি।
মেসির প্রকাশিত চিঠির সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো এর সময়কাল। চিঠিটি মূলত লেখা হয়েছিল ২১ জুলাই—বিশ্বকাপ ফাইনালের দুই দিন পর। অর্থাৎ, স্পেনের কাছে হারের পরই জাতীয় দল ছাড়ার সিদ্ধান্ত প্রায় নিয়ে ফেলেছিলেন তিনি, যা বাবার মৃত্যুর পর চূড়ান্ত রূপ নেয়।
আর্জেন্টিনার জার্সিতে ২০০৫ সালে পথচলা শুরু করা মেসির দীর্ঘ দুই দশকের ক্যারিয়ারে রয়েছে বিশ্বকাপ, কোপা আমেরিকা ও ফাইনালিসিমা জয়ের পাশাপাশি অসংখ্য রেকর্ড। ২০২৬ বিশ্বকাপে ৩৯ বছর বয়সেও আসরে আটটি গোল ও চারটি অ্যাসিস্ট নিয়ে দলকে ফাইনালে তোলেন তিনি, যা আর্জেন্টিনা ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনও (এএফএ) নিশ্চিত করেছে। ২০২২ কাতার বিশ্বকাপে শিরোপা জিতে ক্যারিয়ারের বড় অপূর্ণতা দূর করলেও ২০২৬-এ শিরোপা ধরে রাখার সুযোগটি হাতছাড়া হয়।
বিশ্বকাপের শেষ হারের কয়েক সপ্তাহ পরই জাতীয় দলকে আনুষ্ঠানিক বিদায় জানালেন সর্বকালের অন্যতম সেরা এই ফুটবলার। ফলে স্পেনের বিপক্ষে বিশ্বকাপ ফাইনালটিই আর্জেন্টিনার জার্সিতে মেসির শেষ ম্যাচ হিসেবে ইতিহাসে নিবন্ধিত হলো। আলবিসেলেস্তেদের হয়ে তিনি আর মাঠে নামবেন না, তবে তার রেখে যাওয়া স্মৃতি ও অর্জন আর্জেন্টাইন ফুটবলের ইতিহাসে চির ভাস্বর হয়ে থাকবে।
দেশবার্তা/একে