নেপাল-তিব্বত সীমান্ত এলাকায় ভয়াবহ আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসে চারপাশের বাড়িঘর, স্থাপনা ও গাছপালা যখন কাদামাটি ও পানির প্রবল স্রোতে ভেসে যাচ্ছিল, তখনও অক্ষত অবস্থায় দাঁড়িয়ে ছিল একটি হালকা সবুজ রঙের দোতলা বাড়ি। বাড়িটির বারান্দায় আতঙ্কিত অবস্থায় কয়েকজন মানুষকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়। সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া সেই দৃশ্য ঘিরে বিশ্বজুড়ে তৈরি হয়েছে ব্যাপক কৌতূহল।
গত ২৬ আগস্ট ধারণ করা একটি ভিডিওতে দেখা যায়, প্রচণ্ড গতিতে কাদা, পানি, পাথর ও ধ্বংসাবশেষ বয়ে যাচ্ছে। আশপাশের স্থাপনা স্রোতের তোড়ে ভেসে গেলেও ওই সবুজ বাড়িটি তুলনামূলক অক্ষত অবস্থায় দাঁড়িয়ে থাকে।
ভিডিওতে বাড়িটির ওপরের তলার বারান্দায় অন্তত তিনজনকে দেখা যায়, একজন পুরুষ, একজন নারী ও একটি শিশু। চারপাশে তীব্র স্রোত থাকায় তাঁরা বাড়ি থেকে বের হতে পারছিলেন না। পরে ছাদে থাকা একজনকে লাল কাপড় নাড়তে দেখা যায়, যা সাহায্যের সংকেত হিসেবে ধারণা করা হচ্ছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে স্থাপত্য ও নির্মাণ নিয়ে আলোচনা করা অ্যাকাউন্ট ‘আর্কিটেকচার প্রেজেন্টেশন’ ভবনটির টিকে থাকার একটি বস্তুনিষ্ঠ ব্যাখ্যা দিয়েছে। তাদের বিশ্লেষণে বাড়িটির নির্মাণশৈলী, ভৌগোলিক অবস্থান এবং সুসংহত জ্যামিতিক গঠনকে মূল কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
তাদের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, বাড়িটির টিকে থাকার অন্যতম প্রধান কারণ এর রিইনফোর্সড কংক্রিট ফ্রেম। এই ধরণের কাঠামোয় কংক্রিটের কলাম ও বিমের সঙ্গে স্টিলের রড ব্যবহার করা হয়। কলাম, বিম ও ভিত্তিকে স্টিলের রডের মাধ্যমে পরস্পরের সঙ্গে সুদৃঢ়ভাবে যুক্ত রাখায় পুরো ভবনটি একটি সমন্বিত কাঠামো হিসেবে কাজ করতে পেরেছে।
শুধু নির্মাণশৈলী নয়, বাড়িটির ভৌগোলিক অবস্থানও এটিকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষায় বড় ভূমিকা রেখেছে। বিশ্লেষণে বলা হয়, বাড়িটি বন্যার স্রোতের সবচেয়ে গভীর ও শক্তিশালী মূল প্রবাহপথের ঠিক মাঝখানে ছিল না। তুলনামূলকভাবে কিছুটা উঁচু ও মূল প্রবাহ থেকে সামান্য দূরে হওয়ায় এটি সরাসরি ভারী ধ্বংসাবশেষের সরাসরি আঘাত থেকে রক্ষা পায়।
এ ছাড়া বাড়িটির কমপ্যাক্ট বা সুসংহত আকৃতিও স্রোতের প্রভাব কমাতে সাহায্য করেছে। কাদা-পানি ও ধ্বংসাবশেষ বাড়িটিতে আঘাত করার পর তা দুই পাশ দিয়ে ভাগ হয়ে প্রবাহিত হয়। পরবর্তীতে বাড়ির চারপাশে জমে থাকা কাদা একটি প্রাকৃতিক ঢালের মতো তৈরি হয়ে অবশিষ্ট স্রোতের গতিপথ ঘুরিয়ে দেয়। মূলত সুদৃঢ় কাঠামো, উপযুক্ত অবস্থান এবং স্রোতকে দুই দিকে প্রবাহিত করার মতো গঠনের সম্মিলিত ভূমিকার কারণেই ভবনটি অক্ষত রয়েছে।
ভিডিওটি শেয়ার করে আন্তর্জাতিক বিষয়ক বিশ্লেষক এরিক চেন লিখেছেন, ‘সাম্প্রতিক সময়ে দেখা সবচেয়ে হৃদয়বিদারক দৃশ্যের একটি এটি। চারপাশের সবকিছু নিশ্চিহ্ন করে দেওয়া প্রবল স্রোতের মধ্যেও একটি বাড়ি এখনো দাঁড়িয়ে আছে।’
বিবিসির তথ্যানুযায়ী, গত বুধবার নেপাল ও চীনের তিব্বত সীমান্তে আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসে নিহতের সংখ্যা বেড়ে রোববার সন্ধ্যা পর্যন্ত ৯০৩ জনে দাঁড়িয়েছে। এ ঘটনায় এখনও নিখোঁজ রয়েছেন ২ হাজার ৫০০ জনেরও বেশি মানুষ।
দেশবার্তা/একে