বাংলাদেশ রেলওয়ের পূর্বাঞ্চলের প্রধান প্রকৌশলী মো. তানভিরুল ইসলামের বিরুদ্ধে কমিশন-বাণিজ্য, দুর্নীতি ও অনিয়মের মাধ্যমে অর্থ আত্মসাৎ এবং জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগ উঠেছে। এ বিষয়ে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) কাছে অভিযোগ করেছেন সাইফুল ইসলাম নামে এক ব্যক্তি।
অভিযোগের বিবরণে বলা হয়, মো. তানভিরুল ইসলাম বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব রেলওয়ে সেতু নির্মাণ প্রকল্প ও আখাউড়া-লাকসাম প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক (পিডি) থাকাকালে বিভিন্ন দুর্নীতি ও অনিয়মের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ, টাকা পাচার এবং জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জন করেছেন।
অভিযোগে আরও বলা হয়, বিগত সরকারের আমলে রেলমন্ত্রীর মাধ্যমে বড় অঙ্কের ঘুষ দিয়ে তিনি প্রকল্প পরিচালকের দায়িত্ব নেন। পরবর্তীতে পছন্দের ঠিকাদারদের কাছ থেকে কমিশন নিয়ে কাজ করেছেন। কোটি কোটি টাকা দুর্নীতি করে এর একটি অংশ কানাডায় পাচার করেছেন বলেও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
অভিযোগকারী তানভিরুল ইসলামের বিরুদ্ধে প্রকল্প পরিচালক থাকাকালে দুই প্রকল্পের বিল যাচাই, বিভিন্ন দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগ তদন্ত এবং বর্তমানে প্রধান প্রকৌশলী পদে পদায়নের জন্য ১০ কোটি টাকা ঘুষ দেওয়ার অভিযোগ তদন্ত করে শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।
রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের প্রধান প্রকৌশলী হিসেবে যোগদানের পর থেকে তার বিরুদ্ধে কমিশন-বাণিজ্যের অভিযোগ আরও বেড়েছে বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়। রেলওয়ের অবকাঠামোগত উন্নয়নকাজের বরাদ্দ থেকে তিনি মোটা অঙ্কের কমিশন আদায় করেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক প্রভাবশালী ঠিকাদার বলেন, পুরনো ফাইলে ৩ শতাংশ এবং নতুন ফাইলে ৫ শতাংশ কমিশনের টাকা নগদ আদায় ছাড়া তিনি কোনো ফাইল ছাড়েন না।
অভিযোগে বলা হয়, কাজের বরাদ্দের সময় মোটা অঙ্কের চুক্তিতে উন্নয়নকাজের উপকরণের মূল্য বাজারদরের চেয়ে কয়েক গুণ বাড়িয়ে দেওয়া হয়। উন্নয়নকাজ পরিদর্শনের খরচও ঠিকাদারদের বহন করতে হয়। ফলে অনেক ক্ষেত্রে উন্নয়নকাজের ৩০ থেকে ৪০ শতাংশও সম্পন্ন করা সম্ভব হয় না।
এদিকে, ২০২৫ সালের ১৭ জুলাই সরঞ্জামসহ মোট ১ হাজার ৭৬১ কোটি টাকার প্রকল্পের মধ্যে ট্র্যাক মেরামতের জন্য ৮৮৩ কোটি ৭২ লাখ টাকা প্রাক্কলিত ব্যয় অনুমোদিত হয়। পুরো প্রকল্পটি আটটি প্যাকেজে ভাগ করা হয়। বর্তমানে ৮৮৩ কোটি ৭২ লাখ টাকার ট্র্যাক রক্ষণাবেক্ষণ ও পুনর্বাসন প্রকল্পে পরিচালক (পিডি) হিসেবে মো. তানভিরুল ইসলাম নতুন করে দায়িত্বে রয়েছেন। অভিযোগ উঠেছে, এ প্রকল্পে নিজের পছন্দের ঠিকাদারদের মধ্যে কাজ ভাগ করে বিপুল অর্থ লোপাটের ছক তৈরি করেছেন তিনি।
বিশেষ সূত্রে জানা যায়, প্রধান প্রকৌশলীর অধীন প্রকৌশলীদের দিয়ে ইচ্ছেমতো উন্নয়নকাজ হাতে নিয়ে এসব কাজ থেকে কমিশন আদায় করা হয়। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন ঠিকাদার বলেন, “আমার ৬ লাখ টাকার উন্নয়ন কাজ থেকে ৫% হারে কমিশন নিয়েছেন চিফ ইঞ্জিনিয়ার। এই কমিশন না দেওয়া পর্যন্ত তিনি ফাইলে স্বাক্ষর করেননি।”
অভিযোগে আরও বলা হয়, প্রধান প্রকৌশলীর অধীনস্থ অফিসগুলোর পিয়ন থেকে শুরু করে প্রধান প্রকৌশলীর কার্যালয় পর্যন্ত বিভিন্ন নামে প্রতিটি কাজ থেকে ২৮ থেকে ৩০ শতাংশ কমিশন দিয়ে কাজ করতে হয়। ঠিকাদারদের ভাষ্য, প্রধান প্রকৌশলী মো. তানভিরুল ইসলামের আদায় করা কমিশনের টাকা রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের জিএমসহ অনেক শীর্ষ কর্মকর্তার পকেটে যায়। ফলে তিনি বেপরোয়াভাবে কমিশন-বাণিজ্য চালিয়ে যাচ্ছেন।
অভিযোগকারীদের দাবি, কমিশন-বাণিজ্যের কারণে সরকারি অবকাঠামোর যথাযথ উন্নয়ন সম্ভব হচ্ছে না। এতে সরকারি অর্থের অপচয় এবং নিম্নমানের কাজের ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের প্রধান প্রকৌশলী মো. তানভিরুল ইসলামকে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি ধরেননি। পরে এসএমএসের মাধ্যমে তিনি জানান, “আজকে মাননীয় মন্ত্রী মহোদয়ের সাথে মিটিং আছি।”
এ বিষয়ে বাংলাদেশ রেলওয়ের মহাপরিচালক (ডিজি) আফজাল হোসেন বলেন, এ বিষয়ে অতিরিক্ত মহাপরিচালক (অবকাঠামো) আল ফাত্তাহ মো. মাসউদুর রহমানের সঙ্গে কথা বলতে। পরে অতিরিক্ত মহাপরিচালক (অবকাঠামো) আল ফাত্তাহ মো. মাসউদুর রহমানের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “দুদকে করা অভিযোগের বিষয়ে আমি জানি না। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব রেলওয়ে সেতু প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক (পিডি) থাকাকালে কোনো অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, একেকজন একেকভাবে অভিযোগ করতে পারে। আমি বিষয়টি খোঁজ নিয়ে দেখছি।”
এ বিষয়ে বাংলাদেশ মানবাধিকার পরিষদের সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট সেলিম চৌধুরী বলেন, “বিশ্বের সব দেশে রেলওয়ে লাভজনক প্রতিষ্ঠান হলেও একমাত্র বাংলাদেশ রেলওয়ে লাভের পরিবর্তে বছরের পর বছর লোকসান গুনে যাচ্ছে! এর অন্যতম প্রধান কারণ হচ্ছে চিহ্নিত দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা-কর্মচারী।”
তিনি আরও বলেন, “একটি বিষয় উদ্বেগজনক যেটি হলো এখানে সিন্ডিকেটের মাধ্যমে যে যত বেশি দুর্নীতি করতে পারে তাকে তত বেশি গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় দায়িত্ব/পোস্টিং দেওয়া। রাষ্ট্রের উচিত হবে বাংলাদেশ রেলওয়েকে লোকসানের হাত হতে বাঁচাতে হলে এসব লোকজন চিহ্নিত করে যথাযথ আইনগত পদক্ষেপ নেওয়া। দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে বাংলাদেশ রেলওয়েকে সেবা দানকারী প্রতিষ্ঠানে পরিণত করা যাবে না।”
প্রতিনিধি/আরএইচ