বাগেরহাটের মোরেলগঞ্জে ৬৯ নম্বর এস.বি. কালিকাবাড়ী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক শিউলী পারভীনের বিরুদ্ধে সরকারি সম্পদ ব্যবস্থাপনা, বরাদ্দের অর্থ ব্যয় ও ম্যানেজিং কমিটি গঠনসহ বিভিন্ন বিষয়ে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। এসব অভিযোগের তদন্ত ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের দাবিতে বিক্ষোভ ও মানববন্ধন করেছেন স্থানীয় অভিভাবক, জমিদাতা ও এলাকাবাসী।
শনিবার (২৯ আগস্ট) দুপুর ২টার দিকে উপজেলার বলইবুনিয়া ইউনিয়নের শ্রেণীখালী এলাকায় বিদ্যালয়ের সামনে প্রায় ঘণ্টাব্যাপী এ কর্মসূচি পালিত হয়। এ সময় বক্তারা প্রধান শিক্ষক শিউলী পারভীনের অপসারণ এবং বিধি অনুযায়ী ম্যানেজিং কমিটি পুনর্গঠনের দাবি জানান।
মানববন্ধনে অভিযোগকারীরা বলেন, ২০২৪ সালের জানুয়ারি মাসে বিদ্যালয় চত্বরে থাকা তিনটি মূল্যবান গাছ যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমোদন ছাড়াই কেটে বিক্রি করা হয়েছে। তাদের দাবি, গাছগুলোর আনুমানিক বাজারমূল্য প্রায় এক লাখ টাকা। গাছ বিক্রির অর্থ বিদ্যালয়ের সরকারি হিসাব বা উন্নয়ন তহবিলে যথাযথভাবে জমা দেওয়া হয়নি বলেও অভিযোগ করেন তারা।
এ ঘটনায় গত ২ আগস্ট উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তার কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়ে তদন্তের দাবি জানানো হয়। অভিযোগকারীরা বলেন, সরকারি বিদ্যালয়ের সম্পদ বিক্রির ক্ষেত্রে নির্ধারিত নিয়ম অনুসরণ করা হয়েছে কি না এবং বিক্রির অর্থ কোথায় জমা হয়েছে, তা তদন্তের মাধ্যমে পরিষ্কার হওয়া প্রয়োজন।
বিদ্যালয়ের বার্ষিক স্লিপ বরাদ্দের অর্থ ব্যয় নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয়রা। তাদের অভিযোগ, বিদ্যালয়ের উন্নয়ন ও শিক্ষার মানোন্নয়নের জন্য বরাদ্দকৃত অর্থ ব্যয়ে স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। বিভিন্ন খরচের ভাউচার নিয়েও সন্দেহ রয়েছে বলে দাবি করেন তারা। বরাদ্দকৃত অর্থের আয়-ব্যয়ের হিসাব, সংশ্লিষ্ট ভাউচার ও নথিপত্র যাচাইয়ের দাবি জানান তারা।
বিদ্যালয়ের ম্যানেজিং কমিটি গঠন নিয়েও দীর্ঘদিন ধরে বিরোধের কথা জানান স্থানীয়রা। তাদের অভিযোগ, প্রকৃত জমিদাতা ও যোগ্য অভিভাবকদের যথাযথভাবে অবহিত না করে এবং সবার মতামত না নিয়েই পছন্দের ব্যক্তিদের নিয়ে কমিটি গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। গত ১৯ জুলাই উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তার কাছে দেওয়া আবেদনে কমিটি গঠনের প্রক্রিয়া তদন্ত করে বিধি ও নীতিমালা অনুসরণ করে নতুন কমিটি গঠনের দাবি জানানো হয়।
এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ক্লাস্টার সহকারী উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. রাসেল মোল্লা বলেন, “ম্যানেজিং কমিটি গঠন নিয়ে একটি অভিযোগ পেয়েছি। উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তার নির্দেশনা অনুযায়ী তদন্ত করে পূর্বের কমিটির কার্যক্রম স্থগিত রাখার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল। পরে স্যারের নির্দেশনায় তদন্ত স্থগিত রাখা হয়েছে।”
তিনি আরও বলেন, “গাছ কাটার বিষয়েও পৃথক একটি অভিযোগ এসেছে। বিষয়টি তদন্ত করে পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
মানববন্ধনে শিক্ষার্থীদের চারু-কারু পরীক্ষার উপকরণ বাবদ ২০ টাকা করে নেওয়ার অভিযোগও করেন স্থানীয়রা। তাদের দাবি, এ ধরনের অর্থ আদায়ের ক্ষেত্রে যথাযথ নিয়ম অনুসরণ করা হয়েছে কি না, তা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের যাচাই করা উচিত।
তবে তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক শিউলী পারভীন। তিনি বলেন, ছুটির দিনে বিদ্যালয়ের সামনে যারা মানববন্ধন করেছেন, তাঁদের কেউই বিদ্যালয়ের অভিভাবক নন এবং তাঁদের অভিযোগের কোনো ভিত্তি নেই।
চারু-কারু কার্যক্রমের বিষয়ে প্রধান শিক্ষক বলেন, শিক্ষার্থীদের প্রয়োজনীয় উপকরণ সংগ্রহের ছবি রয়েছে এবং নিয়মিত পরীক্ষার সময় এভাবেই উপকরণ সংগ্রহ করা হয়।
তিনি আরও দাবি করেন, মানববন্ধনে গুচ্ছগ্রাম থেকে কয়েকজন নারীকে এনে দাঁড় করানো হয়েছে।
শিউলী পারভীন বলেন, “আমি আমার স্কুলটিকে সুন্দর ও সুশৃঙ্খলভাবে পরিচালনার জন্য সারাদিন পরিশ্রম করি। কিছু কুচক্রী মহল পরিকল্পিতভাবে এই স্কুলের সুনাম নষ্ট করার চেষ্টা করছে।”
মানববন্ধনে অভিভাবক সুমন হাওলাদার, মিনারা বেগম, শিল্পী খানম, রবিউল ইসলাম, জাকির হোসেন, ৪ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি গফফার খান, বিদ্যালয়ের জমিদাতা নাসির খান ও বিএনপি নেতা আমজাদ হোসেনসহ স্থানীয়রা বক্তব্য দেন।
বক্তারা বলেন, অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাইয়ে নিরপেক্ষ তদন্ত জরুরি। সরকারি বিদ্যালয়ের সম্পদ বিক্রি, সরকারি বরাদ্দের অর্থ ব্যয় এবং ম্যানেজিং কমিটি গঠনের প্রক্রিয়ায় কোনো অনিয়ম হয়ে থাকলে দায়ীদের বিরুদ্ধে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।
একই সঙ্গে প্রধান শিক্ষক শিউলী পারভীনের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখার এবং ম্যানেজিং কমিটি গঠনে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার দাবি জানান তাঁরা।
তবে প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলোর কোনোটি এখনো তদন্তে চূড়ান্তভাবে প্রমাণিত হয়নি। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদন্ত প্রতিবেদন ও নথিপত্র যাচাইয়ের পরই অভিযোগগুলোর সত্যতা ও দায়-দায়িত্ব সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া সম্ভব হবে।
প্রতিনিধি/আরএইচ