হিমবাহ ধসে সৃষ্ট ভয়াবহ আকস্মিক বন্যায় নেপালে চতুর্থ দিনের মতো উদ্ধার অভিযান অব্যাহত রয়েছে। এর মধ্যে উত্তর নেপালজুড়ে আবারও ভারী বৃষ্টিপাত শুরু হওয়ায় নতুন করে বন্যার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এখন পর্যন্ত এ দুর্যোগে নেপালে মৃত্যুর সংখ্যা ৬৩৩ জনে দাঁড়িয়েছে। তবে এ সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
বিবিসির তথ্য অনুযায়ী, নেপাল ও তিব্বত মিলিয়ে প্রায় তিন হাজার মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন। তাঁদের মধ্যে সাত শতাধিক বিদেশি পর্যটক রয়েছেন। ভারী বৃষ্টিপাতের কারণে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোতে পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়েছে। প্রধান সড়ক ও সেতু ভেঙে যাওয়ায় উদ্ধারকর্মীদের দুর্গত এলাকায় পৌঁছাতে বেগ পেতে হচ্ছে। বেঁচে যাওয়া মানুষদের নিরাপদে সরিয়ে নিতে হেলিকপ্টার দিয়ে উদ্ধার অভিযান চলছে।
ত্রিশূলিতে সেনাবাহিনী আরও বন্যার সম্ভাবনা সম্পর্কে সতর্কবার্তা জারি করেছে। এদিকে বিপর্যয়ের পর তিব্বত অংশের ধ্বংসযজ্ঞের বেশ কিছু ছবি প্রকাশ করেছে চীনের কর্তৃপক্ষ।
চীনের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, তিব্বত অংশে এখন পর্যন্ত সাতজনের মৃত্যু হয়েছে এবং ৫৫৪ জন নিখোঁজ রয়েছেন। নেপালের উদ্ধারকর্মীরা দুর্গত এলাকা থেকে প্রায় সাড়ে চার হাজার মানুষকে উদ্ধার করেছেন।
প্রতিবেশী ভারতের কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, নেপাল থেকে বয়ে আসা নদী থেকে সাতটি মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে, যেগুলো বন্যার শিকার ব্যক্তিদের বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বুধবারের আকস্মিক বন্যায় সৃষ্ট একটি হ্রদ থেকে আবারও বন্যা হতে পারে- এমন আশঙ্কায় চীন উদ্ধারকাজ স্থগিত করেছে। দেশটির সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, সামনের কয়েক দিন ভারী বৃষ্টিপাতের পূর্বাভাস রয়েছে। এতে উদ্ধারকাজ ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি ভূমিধসের আশঙ্কাও রয়েছে।
নেপালে হতাহত ও নিখোঁজ মানুষের সংখ্যা নিয়ে বিভিন্ন সংস্থার তথ্যে অমিল রয়েছে। নেপাল পুলিশ ও দেশটির জাতীয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ পৃথক পরিসংখ্যান দিয়েছে। জীবিতদের উদ্ধার, নিখোঁজদের সন্ধান এবং মরদেহ উদ্ধারের কাজ চলমান থাকায় সংখ্যাগুলোও পরিবর্তিত হচ্ছে।
বিবিসির সংবাদদাতারা জানিয়েছেন, বড় ধরনের দুর্যোগের পর সরকারি পরিসংখ্যানে এমন অমিল দেখা যেতে পারে। তিব্বতের পরিস্থিতি সম্পর্কেও নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়া কঠিন। সংবাদমাধ্যমের জন্য অঞ্চলটিতে প্রবেশ কঠিন হওয়ায় তথ্যের ক্ষেত্রে চীনের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে।
নেপালের একটি জলবিদ্যুৎকেন্দ্রের কাছে একটি সুড়ঙ্গে অনেক মানুষ আটকে রয়েছেন। তাঁদের উদ্ধারে কাজ করছেন উদ্ধারকর্মীরা। নেপালের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ নিখোঁজের তালিকায় জ্বালানি ও বিদ্যুৎ অবকাঠামো প্রকল্প-সংশ্লিষ্ট এলাকার ৯৩৩ জন জলবিদ্যুৎকর্মীর নাম নতুন করে যুক্ত করেছে। রসুয়ায় ত্রিশূলি-৩ ‘এ’ জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের সুড়ঙ্গে আটকে পড়া ব্যক্তিদের উদ্ধারে শনিবার সকাল থেকে সুড়ঙ্গের মুখ খোলার কাজ জোরদার করা হয়েছে বলে জানিয়েছে প্রধানমন্ত্রীর সচিবালয়।
গত দুই দিন ধরে এ উদ্ধার অভিযান চলছে। সেনাবাহিনী, সশস্ত্র পুলিশ দল ও নেপাল পুলিশের একটি যৌথ দল ধ্বংসাবশেষ সরিয়ে সুড়ঙ্গের প্রবেশপথ খোলার কাজ করছে। এদিকে ত্রাণ সহায়তায় আসা একটি ভারতীয় দলও সম্প্রতি ত্রিশূলিতে পৌঁছেছে। তবে সুড়ঙ্গে ঠিক কতজন আটকে রয়েছেন, তা জানা যায়নি। আকস্মিক বন্যার পর থেকেই তাঁদের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন রয়েছে।
স্যাটেলাইট ছবিতে ধ্বংসের চিত্র
শত শত মানুষের মৃত্যু এবং হাজার হাজার মানুষ নিখোঁজ হওয়ার পর নেপাল-তিব্বত সীমান্তের শহর ও গ্রামগুলোর বন্যা ও কাদাধসের আগের ও পরের স্যাটেলাইট ছবি বিপর্যয়ের ভয়াবহতা তুলে ধরেছে। গত মাসে তোলা ছবিতে নেপালের তিমুরে এলাকার নদীর তীরে রঙিন ভবন দেখা গেলেও বর্তমানে সেখানে মাত্র কয়েকটি ভবন টিকে আছে। পুরো এলাকা কাদা, পানি ও পাথরের স্তূপে তলিয়ে গেছে।
ত্রিশূলি নদীর তীরে অবস্থিত রসুয়াগড়ী জলবিদ্যুৎকেন্দ্রটিও কয়েক দিন আগেও একটি সমৃদ্ধ শিল্পাঞ্চল ছিল। তবে আকাশ থেকে তোলা ছবিতে এখন সেটির প্রায় কোনো চিহ্নই দেখা যাচ্ছে না।
চিতওয়ানে ২৩৩ মরদেহ, শনাক্ত ৪
চিতওয়ানের স্থানীয় প্রশাসন জানিয়েছে, গত বুধবারের বন্যায় নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে চিতওয়ান থেকে এখন পর্যন্ত ২৩৩টি মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। এর মধ্যে মাত্র চারটির পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে।
শনিবার সকালে চিতওয়ান জেলা প্রশাসন কার্যালয় থেকে দেওয়া বিবৃতিতে জানানো হয়, বাকি ২২৯টি মরদেহ বিভিন্ন হোল্ডিং সেন্টার ও স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানে রাখা হয়েছে।
বিবৃতিতে বলা হয়, ‘স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠান ও নদীতীর থেকে সংগৃহীত মরদেহ ও অবশিষ্টাংশ পচে গলে গেছে এবং সেগুলো আর চেনার উপায় নেই। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতামত ও বিশ্লেষণ অনুযায়ী, দ্রুত ব্যবস্থাপনার আওতায় না আনা এই গলিত মরদেহগুলো দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে, যা থেকে সংক্রমণ বা মহামারী ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি দেখা দিয়েছে।’
‘মরদেহগুলোর আরও পচন রোধ করতে, সেগুলোকে শ্রদ্ধাপূর্ণ, নিরাপদ ও আইনি উপায়ে দাফন বা সৎকার করতে এবং সম্ভাব্য সংক্রমণের ঝুঁকি থেকে রক্ষা করতে এক বাধ্যকতামূলক বিকল্প ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।
চিতওয়ান জেলা নিরাপত্তা কমিটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ‘অশনাক্ত ও দাবিহীন সব মরদেহ ভূগর্ভস্থ বা মাটির নিচে দাফন/ব্যবস্থাপনা করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।’
প্রশাসন জানিয়েছে, সিদ্ধান্ত অনুযায়ী প্রতিটি মরদেহের কোড নম্বর অনুযায়ী ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করে রেকর্ড রাখা হবে। এরপর শনিবার থেকে ভারতপুর মহানগরীর ১ নম্বর ওয়ার্ডের দেবঘাটের একটি উন্মুক্ত স্থানে এসব মরদেহের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া বা ভূগর্ভস্থ দাফনের ব্যবস্থা করা হবে।
কেন ওই এলাকায় এত পর্যটক?
নেপাল ও তিব্বতে নিখোঁজ অনেক পর্যটক তীর্থযাত্রার উদ্দেশ্যে ওই অঞ্চলে গিয়েছিলেন। হিন্দু ও বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের কাছে অঞ্চলটি পবিত্র ও জনপ্রিয়। প্রতিবছর হাজার হাজার মানুষ এসব পবিত্র স্থান পরিদর্শনে যান।
আকস্মিক বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত বিদেশি দর্শনার্থীদের মধ্যে সবচেয়ে বড় দল ভারতীয় নাগরিকদের। তাঁদের অনেকেই তীর্থযাত্রায় ছিলেন। অনেক ভারতীয় পর্যটক নেপাল হয়ে তিব্বতের কৈলাশ পর্বতে যান। ৬ হাজার ৪০০ মিটার (২১ হাজার ফুট) উঁচু এই শৃঙ্গটি হিন্দু, বৌদ্ধ ও জৈন ধর্মাবলম্বীদের কাছে অত্যন্ত পবিত্র।
যুক্তরাষ্ট্র থেকে কৈলাশ পর্বতে আসা দীপক ও মধু আহুজাও নিখোঁজ তীর্থযাত্রীদের মধ্যে রয়েছেন। তাঁদের মেয়েরা বিবিসিকে বলেছেন, ‘আমরা তাদের খুব ভালোবাসি এবং কেবল চাই তারা বাড়ি ফিরে আসুক।’
নেপাল শুধু তীর্থযাত্রীদের জন্যই জনপ্রিয় নয়, বিশ্বজুড়ে ট্রেকার ও পর্বতারোহীদের কাছেও দেশটি আকর্ষণীয় গন্তব্য। বন্যায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত উত্তর-মধ্যাঞ্চলীয় এলাকা রাসুয়া হাইকিংয়ের জন্য জনপ্রিয়। আগস্ট পর্যটনের মূল মৌসুম না হলেও বন্যার সময় সেখানে কিছু পর্বতারোহী উপস্থিত ছিলেন বলে কর্তৃপক্ষের ধারণা। সূত্র: বিবিসি বাংলা, এপি
দেশবার্তা/একে