মধ্যপ্রাচ্য সংকট দীর্ঘ হলে বাংলাদেশে ঝুঁকিতে ৬ লাখ চাকরি

দেশবার্তা প্রতিবেদক

অর্থ-বাণিজ্য

মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতের অর্থনৈতিক প্রভাব বাংলাদেশেও ক্রমেই স্পষ্ট হচ্ছে। জ্বালানির দাম বৃদ্ধি, গ্যাসসংকট, শিল্পকারখানা ও সার উৎপাদনে বিঘ্ন

2026-08-29T13:40:22+06:00
2026-08-29T14:18:58+06:00
শনিবার ● ২৯ আগস্ট ২০২৬,
১৪ ভাদ্র ১৪৩৩
 ইপেপার   ভিডিও 

শনিবার ● ২৯ আগস্ট ২০২৬
চলমান বার্তা:
অর্থ-বাণিজ্য
দারিদ্র্য কমানোর অগ্রগতিতেও বড় ধাক্কার আশঙ্কা
মধ্যপ্রাচ্য সংকট দীর্ঘ হলে বাংলাদেশে ঝুঁকিতে ৬ লাখ চাকরি
জ্বালানি ও সারের মূল্যবৃদ্ধিতে বাড়তে পারে মূল্যস্ফীতি
দেশবার্তা প্রতিবেদক
প্রকাশ: শনিবার, ২৯ আগস্ট, ২০২৬, ১:৪০ পিএম  আপডেট: ২৯.০৮.২০২৬ ২:১৮ পিএম
ফাইল ছবি
মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতের অর্থনৈতিক প্রভাব বাংলাদেশেও ক্রমেই স্পষ্ট হচ্ছে। জ্বালানির দাম বৃদ্ধি, গ্যাসসংকট, শিল্পকারখানা ও সার উৎপাদনে বিঘ্ন এবং পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধির প্রভাব পড়ছে কৃষি, নিত্যপণ্যের বাজার ও মানুষের আয়-রোজগারে। এই সংকট দীর্ঘায়িত হলে দেশে প্রায় ৬ লাখ চাকরি ঝুঁকিতে পড়তে পারে। একই সঙ্গে দারিদ্র্য কমানোর প্রত্যাশিত অগ্রগতিও বড় ধরনের ধাক্কার মুখে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছে বিশ্বব্যাংক।

বিশ্বব্যাংকের এপ্রিল মাসের বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট আপডেট এবং পরে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের প্রভাব মোকাবিলায় জরুরি সহায়তা প্রকল্পের প্রস্তুতি-সংক্রান্ত মূল্যায়নে এসব ঝুঁকির কথা উল্লেখ করা হয়েছে। 

গত ২৬ জুন খাদ্যনিরাপত্তা, জীবিকা ও জরুরি জ্বালানি সরবরাহে সহায়তার জন্য বাংলাদেশকে ১১০ কোটি ডলারের দুটি প্রকল্প অনুমোদন দেয় সংস্থাটি। এমন সময়ে এই সংকট দেখা দিয়েছে, যখন দেশের অর্থনীতি উচ্চ মূল্যস্ফীতি, দুর্বল ব্যাংক খাত, কম বিনিয়োগ ও সীমিত রাজস্ব সক্ষমতার চাপে রয়েছে।

বিশ্বব্যাংকের হিসাবে, শুধু ২০২৫ সালেই দেশে দরিদ্র মানুষের সংখ্যা প্রায় ১৪ লাখ বেড়েছে। সংঘাত শুরুর আগে ধারণা করা হয়েছিল, ২০২৬ সালে প্রায় ১৭ লাখ মানুষ দারিদ্র্যসীমার ওপরে উঠতে পারবেন। তবে সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, সেই সংখ্যা নেমে আসতে পারে প্রায় ৫ লাখে। অর্থাৎ আরও প্রায় ১২ লাখ মানুষ দারিদ্র্য থেকে বেরিয়ে আসার সুযোগ হারাতে পারেন।

বিশ্বব্যাংকের মূল্যায়নে বলা হয়েছে, জ্বালানির বাড়তি দাম আংশিকভাবে ভোক্তাদের ওপর চাপানো হলে মূল্যস্ফীতি শূন্য দশমিক ৫ শতাংশের বেশি বাড়তে পারে। এর ফলে পরিবহন, খাদ্য ও অন্যান্য পণ্যের দামে দ্বিতীয় দফার প্রভাব পড়বে, যার সবচেয়ে বেশি চাপ পড়বে নিম্ন আয়ের মানুষের ওপর।

অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী সম্প্রতি বলেছেন, জুলাইয়ে মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশের নিচে নেমেছে এবং মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ না হলে এটি আরও কমত। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুযায়ী, জুলাইয়ে মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ৩২ শতাংশ।

জ্বালানি আমদানির ক্ষেত্রেও বাংলাদেশের বড় নির্ভরতা রয়েছে মধ্যপ্রাচ্যের ওপর। বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, দেশে আমদানি করা অপরিশোধিত তেলের ৬০ থেকে ৬৫ শতাংশ এবং এলএনজির ৫৫ থেকে ৬০ শতাংশ আসে এই অঞ্চল থেকে। দেশের গ্যাসের মোট চাহিদার এক-তৃতীয়াংশের বেশি পূরণ হয় আমদানি করা এলএনজির মাধ্যমে।

সংঘাতের প্রভাবে এলএনজি সরবরাহেও বিঘ্ন সৃষ্টি হয়েছে। বিশ্বব্যাংকের মূল্যায়ন অনুযায়ী, পেট্রোবাংলার ছয়টি এলএনজি সরবরাহ চুক্তির মধ্যে পাঁচটির সরবরাহকারী পক্ষ ‘ফোর্স মেজর’ ঘোষণা করেছে। জুনের মূল্যায়নের সময় স্পট মার্কেটে এলএনজির দাম প্রতি এমএমবিটিইউ ২৪ থেকে ২৮ ডলারে ওঠে। গত ২৪ আগস্ট সরকার সেপ্টেম্বরে সরবরাহের জন্য দুই কার্গো এলএনজি কেনার অনুমোদন দেয়। এর একটির দাম প্রতি এমএমবিটিইউ ২৪ দশমিক ৬২৫ ডলার এবং অন্যটির ২৪ দশমিক ২৫ ডলার। অথচ যুদ্ধের আগে বাংলাদেশ সাধারণত ১০ থেকে ১২ ডলারের মধ্যে এলএনজি কিনত।

বিশ্বব্যাংক বলছে, দীর্ঘ সময় সরবরাহ বিঘ্নিত থাকলে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে জ্বালানি ভর্তুকির চাপ জিডিপির ২ দশমিক ৮ শতাংশে পৌঁছাতে পারে। এতে মোট ভর্তুকির পরিমাণ ২৫০ কোটি থেকে ৪৮০ কোটি ডলারে উন্নীত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এর ফলে সামাজিক নিরাপত্তাসহ অন্যান্য জরুরি খাতে সরকারি ব্যয়ের সক্ষমতা কমে যেতে পারে।

সংকটের প্রভাব পড়ছে কৃষি খাতেও। দেশে প্রতি হেক্টর আবাদি জমিতে প্রায় ৩৯২ কেজি সার ব্যবহার হয়, যা বৈশ্বিক গড়ের দ্বিগুণেরও বেশি। গ্যাসসংকটের কারণে মার্চের শুরুতে দেশের ছয়টি বড় ইউরিয়া কারখানার মধ্যে পাঁচটির উৎপাদন বন্ধ করা হয়েছিল। পরে পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হলে কয়েকটি কারখানা পুনরায় উৎপাদনে ফেরে। এদিকে আন্তর্জাতিক বাজারে ইউরিয়ার দামও প্রায় ৩০ শতাংশ বেড়েছে। বিশ্বব্যাংকের মতে, সরবরাহ বিঘ্ন দীর্ঘস্থায়ী হলে সারের দাম আরও বাড়তে পারে।

স্বাস্থ্য খাতও এই চাপের বাইরে নয়। বিশ্বব্যাংকের মূল্যায়ন অনুযায়ী, বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থার বিঘ্ন এবং দেশে বিদ্যুৎ ও জ্বালানির উচ্চ ব্যয় প্রায় ১৯ হাজার সরকারি স্বাস্থ্যকেন্দ্র এবং ৬ হাজার ২০০ বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকের পরিচালন ব্যয় বাড়াচ্ছে। দেশের ৬৪টি বড় সরকারি হাসপাতালের মাসিক বিদ্যুৎ বিল মিলিয়ে প্রায় ৬ লাখ থেকে ১১ লাখ ডলার। বিদ্যুৎ বিভ্রাটে বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকগুলোকে জেনারেটর চালাতে হওয়ায় তাদের জ্বালানি ব্যয়ও বেড়েছে।

ওষুধশিল্পও আমদানিনির্ভর হওয়ায় চাপের মুখে রয়েছে। বিশ্বব্যাংকের হিসাবে, দেশের প্রায় ২৫০টি ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান কাঁচামালসহ বিভিন্ন উপকরণের জন্য আমদানির ওপর নির্ভরশীল। হাসপাতালের ৯০ শতাংশের বেশি চিকিৎসাসামগ্রীও আমদানি করা হয়। ফলে জ্বালানি ও পরিবহন ব্যয় বেড়ে স্বাস্থ্যসেবার ব্যয়ও বৃদ্ধি পাচ্ছে।

এদিকে দেশে বড় ধরনের হামের প্রাদুর্ভাবের মধ্যেই স্বাস্থ্য খাতের এ চাপ তৈরি হয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২৮ আগস্ট পর্যন্ত হাম-সংক্রান্ত ৯৯টি মৃত্যু পরীক্ষায় নিশ্চিত হয়েছে এবং আরও ৮৬১টি মৃত্যু সন্দেহভাজন হাম-সংক্রান্ত হিসেবে নথিভুক্ত হয়েছে। তাই সব মিলিয়ে ৯৬০ মৃত্যুকে সরাসরি ‘হামে মৃত্যু’ বলা ঠিক হবে না।

বিশ্বব্যাংকের এই মূল্যায়নের প্রতিফলন ইতোমধ্যে দেশের অর্থনীতিতে দেখা যাচ্ছে বলে মনে করেন সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) বিশিষ্ট ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান।

তিনি বলেন, “শিল্পকারখানায় নতুন গ্যাস-সংযোগ না পাওয়া, কোথাও কাজের সময় কমে যাওয়া এবং জ্বালানি সংকটে কিছু কারখানা বন্ধ হওয়ার মতো ঘটনা ইতোমধ্যে ঘটছে।”

সাম্প্রতিক কারখানা বন্ধ ও শ্রমিকদের চাকরি হারানোর ঘটনাকে পরিস্থিতির গুরুত্বের প্রতিফলন উল্লেখ করে তিনি বলেন, “এটিই এখন বাস্তবতা; বিশ্বব্যাংকের মূল্যায়ন সেই বাস্তবতাকে আরও স্পষ্ট করেছে।”

দেশবার্তা/একে


সর্বশেষ সংবাদ 

‘গুলশানের চামেলী’ সিনেমায় যুক্ত হলেন বাপ্পারাজ
দেশে ফিরলেন অপু বিশ্বাস, জানালেন নেপালের দুর্যোগের অভিজ্ঞতা
পাত্রী দেখে ফেরার কয়েক ঘণ্টা পর সড়ক দুর্ঘটনায় যুবকের মৃত্যু
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের যানজটে অ্যাম্বুলেন্সে রোগীর মৃত্যু
গুম-খুন ও শহীদ পরিবারের ৭৪ জনকে চাকরির নিয়োগপত্র দিলেন প্রধানমন্ত্রী

সর্বাধিক পঠিত 

ডি-ফ্যাব ১৫১ সদস্য কেন্দ্রীয় কমিটি ঘোষণা
রাণীনগরে ছয় বছরের শিশুকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণের অভিযোগ
চাঁপাইনবাবগঞ্জে মরা পাগলা নদীতে ডুবে ৫ শিশুর মৃত্যু
আজ সর্বোচ্চ লোডশেডিংয়ের পূর্বাভাস
খালেদা জিয়ার জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে জিয়ানগরে বৃক্ষরোপণ ও চারা বিতরণ
অর্থ-বাণিজ্য- এর আরো খবর 
সম্পাদক ও প্রকাশক: কাজী তোফায়েল আহমদ।
সম্পাদকীয়, বার্তা ও বাণিজ্যিক অফিস: গ্রীন ট্রেড পয়েন্ট, ৭ বীর উত্তম একে খন্দকার সড়ক, মহাখলী বাণিজ্যিক এলাকা, ঢাকা-১২১২।
www.thedailydeshbarta.com
Mobile: 01816-185722, Email: [email protected]